মরমী কবি হাছন রাজা -দার্শনিক কবি হাসন রাজা

0
818
মরমী কবি হাছন রাজা -দার্শনিক কবি হাসন রাজা

প্রকাশিত:সোমবার, ২১ ডিসেম্বর ২০২০ইং ।। ৬ইপৌষ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ (শীতকাল)।। ৫ই জমাদিউল-আউয়াল,১৪৪২ হিজরী।

বিক্রমপুর খবর : অনলাইন ডেস্ক : হাসন রাজা ।একজন মরমী কবি ও দার্শনিক ।চির বৈরাগ্যের এই মানুষটির গান ও দর্শনে মিশে আছে বাংলার মাটি ও মানুষের ঘ্রাণ । মরমি সাধনা আর আঞ্চলিকতার দর্শন চেতনার সঙ্গে সংগীতের এক অসামান্য সংযোগ ঘটিয়েছেন তিনি । দর্শন চেতনার নিরিখে লালনের পর যে উল্লেখযোগ্য নামটি আসে, তা হাসন রাজার ।তিনি সর্ব-মানবিক ধর্মীয় চেতনার এক লোকায়ত ঐক্যসূত্র রচনা করেছেন। তাঁর রচিত গানগুলো শুনলে মনের মাঝে আধ্যাত্মবোধের জন্ম হয়।

হাসন রাজা কোন পন্থার সাধক ছিলেন, তা স্পষ্ট জানা যায়নি । কারও মতে তিনি ছিলেন সুফি বাদী । আবার কেউ বলেন, চিশতিয়া তরিকার সাধক ছিলেন। তিনি নিজেকে বাউলা বা বাউল বলে দাবি করতেন। তার গান বুঝতে গেলে আগে তার চলনটা বুঝতে হয় । কোথায় তার বাস,তার এলাকাটা তার সম্পর্কে কি বলে, তার নদীটা তার সম্পর্কে কি বলে, সেখানকার গাছ-পাতা-পক্ষী কি বলে তা বুঝতে হবে। ’ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বঞ্ছিত একজন মরমী কবি তার সৃষ্টির মহিমায় দার্শনিক বনে গিয়েছেন । তাই হাসন রাজার নামের পূর্বে মরমী শব্দটির সাথে দার্শনিক শব্দটিও যুক্ত করতেও কোন বাধা নেই।

হাসন রাজার দার্শনিকতার পরিচয় মেলে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের মাধ্যমে । প্রভাত কুমার শর্মার হাত ঘুরে তিনি হাসন রাজার কিছু গানের সাথে পরিচিত হয়েছিলেন । সেই গানগুলোর মাধ্যমেই কবিগুরু হাসন রাজাকে মূল্যয়ন করতে গিয়ে উল্লেখ করেন, ‘পুর্ব বঙ্গের একটি গ্রাম্য কবির গানে দর্শনের একটি বড় তত্ত্ব পাই। সেটি এই যে, ব্যক্তি স্বরুপের সহিত সম্মন্ধ সূত্রেই বিশ্বসত্য। ’ ১৯২৫ সালে দর্শন কংগ্রেসের সভায় ও পরবর্তীকালে লন্ডন হিবার্ট বক্তৃতায় কবিগুরু হাসন রাজা সম্পর্কে এই বক্তব্য প্রদান করেন।

বৃহত্তর সিলেট তথা বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চলের মরমি সাধক কবি এবং বাউল শিল্পী ছিলেন হাসন রাজা । তাঁর প্রকৃত নাম দেওয়ান হাসন রাজা । অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের মতে, এর প্রধান পথিকৃৎ লালন শাহ ।

১৮৫৪ সালের ২১ ডিসেম্বর তৎকালীন সুনামগঞ্জের তেঘরিয়া পরগণার লক্ষণশ্রী গ্রামে জন্ম হয় হাসন রাজার । তাঁর বাবা ছিলেন দেওয়ান আলী রাজা চৌধুরী, মাতা হরমত জাহান বিবি । হাসন রাজার পূর্বপুরুষেরা হিন্দু সম্প্রদায়ের ছিলেন। তাঁদের আদি বাস ছিল অযোধ্যায় । সিলেটে আসার আগে তাঁরা দক্ষিণ বঙ্গের যশোর জেলার অধিবাসী ছিলেন । সিলেটে তখন আরবি আর ফার্সির চর্চা বেশ ছিল । অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, অনেক দলিল দস্তাবেজে হাসন রাজা আরবি অক্ষরে নাম দস্তখত করেছেন ।

হাসন রাজা দেখতে খুবই সুদর্শন ছিলেন । চারি হাত লম্বা দেহ, উঁচু ধারালো নাসিকা, পিঙ্গল চোখ মাথায় বাবরি চুল—তাঁকে দেখে ইরানি সুফি কবিদের একখানা চেহারা চোখের সামনে ভাসত । হাসন রাজা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন না । তবে তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত। তিনি সহজ সরল আঞ্চলিক ভাষায় প্রায় সহস্রাধিক গান লিখে নিজেই সুরারোপ করেছেন ।উত্তরাধিকার সূত্রে বিশাল ভূসম্পত্তির মালিক ছিলেন হাসন । প্রথম যৌবনে তিনি ছিলেন ভোগবিলাসী এক শৌখিন জমিদার, তার এক গানে নিজেই উল্লেখ করেছেন, ‘সর্বলোকে বলে হাসন রাজা লম্পটিয়া’।

বর্ষা মৌসুমে বজরা (বৃহৎ নৌকা) সাজিয়ে নৃত্যগীতের ব্যবস্থাসহ তিনি চলে যেতেন এবং বেশ কিছু কাল ভোগবিলাসের মধ্যে নিজেকে নিমজ্জিত করে রাখতেন । এরই মধ্যে তিনি প্রচুর গান রচনা করে ফেলেন, এসব গান নৃত্য এবং বাধ্য সহকারে গাওয়া হতো । আশ্চর্যের বিষয় হল, এসব গানে তাঁর নিজের জীবনের নৈতিকতা সম্পর্কে, ভোগবিলাসের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে নিজেকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে এক সময় নিজের মধ্যে বিরাট পরিবর্তনের সূচনা করেন ।

হাসন রাজা দাপটের সঙ্গে জমিদারি পরিচালনা করতে লাগলেন । ধীরে ধীরে এক আধ্যাত্মিক পরিবর্তন তাঁর স্বপ্ন ও জীবন দর্শনে আমূল প্রভাব ফেলে দিল । তাঁর মনের দুয়ার খুলে যেতে লাগল । তাঁর চরিত্রে এল এক শান্ত ভাব । বিলাসী জীবন ছেড়ে তিনি সাদামাঠা জীবন বেছে নিলেন। জমকালো পোশাকের পরিবর্তে সাধারণ পোশাক পরতে এবং বিগত জীবনের ভুলভ্রান্তি তিনি শোধরাতে লাগলেন । একপর্যায়ে তিনি গেয়ে উঠলেন, ‘আমি না লইলাম আল্লাজির নামরে, না করলাম তার কাম।’এভাবে তাঁর বহির্জগৎ ও অন্তর্জগতে এল বিরাট পরিবর্তন । বিষয়-আশয়ের প্রতি তাঁর এক ধরনের অনীহা, এক ধরনের বৈরাগ্য তৈরি হল।

হাসন রাজার এই কালো অধ্যায়ের ইতি ঘটে বেশ অলৌকিক ভাবেই। লোক মুখে শোনা যায়- একদিন তিনি একটি আধ্যাত্নিক স্বপ্ন দেখলেন এবং এরপরই তিনি নিজেকে পরিবর্তন করা শুরু করলেন। বৈরাগ্যের বেশ ধারণ করলেন। জীবনযাত্রায় আনলেন বিপুল পরিবর্তন। নিয়মিত প্রজাদের খোঁজ খবর রাখা থেকে শুরু করে এলাকায় বিদ্যালয়, মসজিদ এবং আখড়া স্থাপন করলেন। সেই সাথে চলতে লাগলো গান রচনা।

হাসন রাজা আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন হলেন, আর রচনা করতে লাগলেন গান, সব গানেই যেন প্রকাশ পেতে লাগল সৃষ্টিকর্তার অপরূপ মহিমার বর্ণনা। তিনি সম্পূর্ণ বদলে গেলেন, মানুষ প্রেমের সঙ্গে সঙ্গে পশু-পাখির প্রতিও তিনি সদয় হলেন। পশু-পাখি হত্যা বন্ধ করে দিলেন। কুরা (পাখি) শিকার তিনি ছেড়ে দিলেন, এককালের উচ্চণ্ড হাসন এবার হয়ে উঠলেন নম্র হাসন । তাঁর গানে আক্ষেপের সুর ধ্বনিত হয়ে উঠল।

জরা-দুঃখে অতিশয় ক্লিষ্ট জীবনের যাতনা ভুলতে পরমের মহাভাবে লীন হতে গিয়ে নানাভাবে খুঁজে ফিরেন আরাধ্য মহাজীবনকে। আর তা গানে ও সুরে কেমন মোহনীয় রূপে পৌছে গেছে যুগ যুগ ধরে কান পেতে থাকা শ্রোতার অন্তরে,

“বাউলা কে বানাইলো রে/

হাসন রাজারে/

বাউলা কে বানাইলো রে”

“মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দী হইয়ারে/

কান্দে হাসন রাজার মন-ময়না রে”

বৈষয়িক জীবনে সংসারী মানুষের কান-কথায় অতিষ্ঠ কবি যন্ত্রণার কথা বলতে সুরের ও ছন্দের আশ্রয় নিচ্ছেন। বিষয়-আশয়ের লোভে আসক্ত মানুষের চোখে নিত্য আনন্দের মূল্য নেই, পরমার্থেরও কোনো গুরত্ব নেই। কার কত ধন রয়েছে, কে কতটা সমৃদ্ধ ও সম্পদে বলীয়ান, এইসব তুচ্ছ হিসেবের দঙ্গলে পড়ে সাধকের যন্ত্রণার শেষ থাকে না। তাই আর্ত-আহাজারির মত বলে উঠছেন,

“লোকে বলে বলেরে, ঘর বাড়ি ভালা নায় আমার/

কি ঘর বানাইমু আমি, শূন্যের-ই মাঝার/

ভালা করি ঘর বানাইয়া, কয় দিন থাকমু আর/

আয়না দিয়া চাইয়া দেখি, পাকনা চুল আমার”

হাসন রাজার চিন্তা-চেতনার পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর গানে। তিনি কত গান রচনা করেছেন তার সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি। জানা গেছে, হাসন রাজার উত্তর পুরুষদের কাছে তাঁর গানের অনেক পাণ্ডুলিপি রক্ষিত আছে । সৈয়দ মুর্তজা আলীর ‘মরমি কবি হাসন রাজা’রচনার এক জায়গায় হাসন রাজার বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন, হাসন রাজা সুনামগঞ্জের একজন মুকুটহীন রাজা ছিলেন।

হাসন রাজা সম্পর্কে বিশিষ্ট দার্শনিক অধ্যক্ষ দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ লিখেছেন, রাজা সুলভ সত্তায় একটি অতি কোমল দয়ালু মনের পরিচয় পাওয়া যায় ।

ইদানীং হাসন রাজার উত্তর পুরুষদের অনেকের লেখার মধ্যে হাসন রাজা সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়। হাসন রাজা মিউজিয়ামের মহাপরিচালক তাঁরই একজন উত্তরসূরি সামারীন দেওয়ান এক বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করে তাঁর স্মৃতিকে ধারণ করে ইতিমধ্যেই দুটি গ্রন্থ রচনা করেছেন ‘এক নজরে হাসন রাজা’ ও ‘সুর তরঙ্গে হাসন রাজার গান’।

মরমি গানের ছকবাঁধা বিষয়কে অনুসরণ করেই হাসন রাজার গানগুলো রচিত । কোথাও নিজেকে দীনহীন বিবেচনা করেছেন, আবার তিনি যে অদৃশ্য কারও হাতে বাঁধা সেটাও ফুটে উঠেছে। যেমন, ‘গুড্ডি উড়াইল মোরে মৌলার হাতে ডুরি’। কোনো কোনো জায়গায় হিন্দু ও মুসলিম যুগল পরিচয় তাঁর গানে পাওয়া যায়। অনেকের ধারণা, কয়েক পুরুষ আগে হাসন রাজার পরিবার হিন্দু ছিলেন বলেই তাঁর গানে এমনটি পাওয়া যায় । হাসন রাজার মরমি লোকে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ঠাঁই ছিল না, তাই একদিকে আল্লাহর প্রেমে কাতর হাসন, অন্য দিকে শ্রীহরির বন্দনা গাইতেও বাধা ছিল না । কখনো হাসনের হৃদয় কান্নায় আপ্লুত হয়, ‘কী হবে মোর হাসরের দিন, ভাই মমিন’, আবার পাশাপাশি তাঁর হৃদয় ব্যাকুল হয় এভাবে স্পষ্টতই হাসনের গানে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যের সমন্বয় ঘটেছে, এ বিষয়ে তিনি ছিলেন লালন ও অন্যান্য মরমি কবির সমান মর্যাদা সম্পন্ন। যেমন, ‘বাউলা কে বানাইল রে, হাসন রাজারে বাউলা কে বানাইল রে’।

হাসন রাজার গানে সুফিবাদের সঙ্গে দেশীয়ত মরমি ধারা ও নিজস্ব চিন্তা-দর্শনের সমন্বয়ে তাঁর সাধনার পথ নির্মিত হয় বলে অনেকে মনে করেন। হাসন রাজার গানেও তাঁর চিন্তা দর্শনে অনেক আঞ্চলিক বুলি ব্যবহারে লক্ষ্য করা যায়। যেমন, ‘আঙ্গে আর ডাঙ্গে/স্বামীর সেবা না করিলে ধরাইবনি লাঙ্গে (অবৈধ পুরুষ বন্ধু)’, ‘চক্ষু মুঞ্জিয়া দেখ রূপ রে’, ‘হাড় খাইল হাড়ুয়া পুকে, মাড়ইল খাইল ঘুনে, যৌবনের গুমানে’, ‘বিষম উন্দুরায় লাগাল পাইল/উগার বইরা থইলাম ধান খাইয়া তুষ বানাইল’।

হাসন রাজার কিছু গান গ্রামীণ ছোঁয়া পাওয়া যায়—এমন কয়েকটি গানের উদাহরণ—‘বুড়ি বড় হারামজাদা, ডাকে মোরে দাদা দাদা’,‘লাঙ্গের সঙ্গে মন মজাইয়া হারাইলায় নিজ পতি’, ‘মুতিয়া দে তোর বাপের মুখে, তার মুখে দে ছাই’। আবার হাসন রাজার কোনো কোনো গানে স্থান-কাল-পাত্রের পরিচয় চিহ্নিত আছে। যেমন, ‘কোথায় রইব লক্ষণছিরি সাধের রামপাশা’— এতে তাঁর জন্মগ্রাম ও জমিদারি এলাকার কথা বারবার এসেছে। কোনো কোনো গানে প্রসঙ্গ হিসেবে নিজেই উপস্থিত হয়েছেন।

দিলারাম নামে হাসন রাজার এক পরিচারিকা তাঁর গানে মাঝে মাঝে উপস্থিত হয়েছেন—‘ধর দিলারাম, ধর দিলারাম, ধর দিলারাম, ধর/হাসন রাজারে বান্দিয়া রাখ দিলারাম তোর ঘর’ কিংবা ‘তোমরা শুনছনি গো সই/হাসন রাজা দিলারামের মাথার কাঁকই।’

যুগ যুগ ধরে হাসন রাজার গান গেয়ে স্থানীয় তথা বাংলাদেশের শিল্পীরা সংগীতে হাতে খড়ি নিচ্ছেন। স্থানীয় শিল্পীদের মধ্যে প্রয়াত উজির মিয়া, আবদুল লতিফ, এমরান আলীসহ আরও অনেকে সফল শিল্পী হিসেবে নাম কুড়িয়েছেন।

হাসন রাজা মুখে মুখে গান রচনা করতেন আর তাঁর সহচর, নায়েব-গোমস্তারা তা লিখে রাখতেন। তাঁর স্বভাবকবিত্ব এসব গানের জন্ম দিত, সংশোধনের সুযোগ খুব একটা মিলত না। তাই ছন্দ পতন ও শব্দ প্রয়োগে অসতর্কতা লক্ষ্য করা যায় । অবশ্য এই ত্রুটি সত্ত্বেও হাসন রাজার গানে অনেক উজ্জ্বল পঙ্‌ক্তি, মনোহর উপমা চিত্রকল্পের সাক্ষাৎ মেলে ।দীর্ঘদিন ধরে সেলিম চৌধুরীর কণ্ঠে হাসন রাজার গান দেশে ও প্রবাসে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

তিনি গানের ভণিতায় নিজেকে ‘পাগলা হাসন রাজা’, ‘উদাসী’, ‘দেওয়ানা’,  ‘বাউলা’ ইত্যাদি বলে অভিহিত করেছেন। তিনি কৈশোর ও যৌবনে শ্রীকৃষ্ণের নানাবিধ লীলায় অভিনয়ও করেছেন। হাছন উদাস (১৯০৭), শৌখিন বাহার, হাছন বাহার ইত্যাদি গ্রন্থে তাঁর গানগুলি সংকলিত হয়েছে। ১৯০৭ সালে হাসন রাজা রচিত ২০৬টি নিয়ে গানের একটি সংকলন প্রকাশিত হয়। এই সংকলনটির নাম ছিল ‘হাসন উদাস’। এর বাইরে আর কিছু গান ‘হাসন রাজার তিনপুরুষ’ এবং ‘আল ইসলাহ্‌’ সহ বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ধারণা করা হয়, তাঁর অনেক গান এখনো সিলেট-সুনামগঞ্জের লোকের মুখে মুখে আছে এবং বহু গান বিলুপ্ত হয়ে গেছে। পদ্যছন্দে রচিত হাসনের অপর গ্রন্থ ‘সৌখিন বাহার’-এর আলোচ্যবিষয় ছিল- ‘স্ত্রীলোক, ঘোড়া ও কুড়া পাখির আকৃতি দেখে প্রকৃতি বিচার। এ পর্যন্ত পাওয়া গানের সংখ্যা ৫৫৩টি। অনেকে অনুমান করেন হাসন রাজার গানের সংখ্যা হাজারেরও বেশী।

হাসন রাজার আরও  কিছু গান বিশেষ করে ‘মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দী হইয়ারে’,‘সোনা বন্ধে আমারে দেওয়ানা বানাইল’, ‘মরণ কথা স্মরণ হইল না, হাসন রাজা তোর’, ‘কানাই তুমি খেইল খেলাও কেনে’,‘একদিন তোর হইবে রে মরণ রে হাসন রাজা’—এসব গান শুধু সমাদৃত ও জনপ্রিয় নয়, সংগীত সাহিত্যে বিরাট মর্যাদার স্থান দখল করে আছে।

উপমহাদেশের অন্যতম খ্যাতিমান মরমী কবি ও বাউল সাধক হাছন রাজার জীবনী নিয়ে তৈরি করা হয়েছে বড় বাজেটের ছবি “হাসন রাজা”। যেখানে হাসন রাজার চরিত্রে অভিনয় করেছেন উপমহাদেশের কিংবদন্তী অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তী। অন্যান্য চরিত্রে আছেন বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী রাইমা সেন, বাংলাদেশের খ্যাতিমান অভিনেতা মামুনুর রশীদ, অভিনেত্রী শম্পা রেজা সহ বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন শিল্পী।

২০০২ সালে বাংলাদেশে হাছন রাজাকে নিয়ে জীবনী ভিত্তিক একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন চাষী নজরুল ইসলাম । ছবিটি মূলত মরমী কবি এবং বাউল শিল্পী হাছন রাজার জীবন ও কর্ম নিয়ে নির্মিত। কোকা-কোলা নিবেদিত এই ছবিটি প্রযোজনা করেছেন অভিনেতা হেলাল খান। ছবির নাম ভূমিকায় (হাছন রাজা) অভিনয় করেছেন হেলাল খান এবং বিনোদিনী চরিত্রে শমী কায়সার। এছাড়াও আছেন শিমলা, মুক্তি, ববিতা, রেবেকা মনি, শানু, কাজী খুরশিদুজ্জামান উত্পল, অমল বোস এবং মমতাজউদ্দীন আহমেদ। চলচ্চিত্রটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রসহ আরও ছয়টি বিভাগে পুরস্কার লাভ করে, এবং দুটি বিভাগে বাচসাস পুরস্কার লাভ করে।

এদিকে কিংবদন্তি গানের স্রষ্টা হাসন রাজা’র জীবন নিয়ে ঢাকার মঞ্চের প্রথম সারির নাট্যদল প্রাঙ্গণেমোর ২০১৮ সালের জুলাই মাসে মঞ্চে আনে  ‘হাছনজানের রাজা’। শাকুর মজিদের লেখা, অনন্ত হিরার নির্দেশনায় নাটকটিতে মঞ্চ পরিকল্পনা করেছেন ফয়েজ জহির। সংগীত পরামর্শক শিল্পী সেলিম চৌধুরী, পরিকল্পনা রামিজ রাজু। আলোক পরামর্শক ছিলেন ঠান্ডু রায়হান। আলোক পরিকল্পনা তৌফিক আজীম এবং পোশাক পরিকল্পনা করেছেন নূনা আফরোজ।

প্রখ্যাত এ সাধক ১৯২২ সালের ৬ ডিসেম্বর ৬৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। সুনামগঞ্জের লক্ষণশ্রীতে তাঁর মায়ের কবরের পাশে কবর দেওয়া হয়। তাঁর এই কবর তিনি মৃত্যুর পূর্বেই নিজে প্রস্তুত করেছিলেন ।

হাসন রাজার স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য সিলেট নগরীর প্রাণকেন্দ্র জিন্দাবাজারে গড়ে তোলা হয়েছে একটি জাদুঘর, যার নাম ‘মিউজিয়াম অব রাজাস’। এখানে দেশ বিদেশের দর্শনার্থীরা হাসন রাজা ও তার পরিবার সম্পর্কে নানা তথ্য জানতে প্রতিদিন ভিড় করেন। এছাড়াও, সুনামগঞ্জ শহরের তেঘরিয়ায় এলাকায় সুরমা নদীর কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে হাসন রাজার স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি। এ বাড়িটি একটি অন্যতম দর্শনীয় স্থান।

কালোত্তীর্ণ এ সাধকের ব্যবহৃত কুর্তা, খড়ম, তরবারি, পাগড়ি, ঢাল, থালা, বই ও নিজের হাতের লেখা কবিতার ও গানের পাণ্ডুলিপি আজও দর্শনার্থীদের আবেগাপ্লুত করে।

গানের রাজা হাছন রাজা। তার বেশিরভাগ গানেই আছে দর্শন। এখানে তার বেশ কিছু দার্শনিক গান তুলে ধরা হলো


বিচার করি চাইয়া দেখি সকলেই আমি।
সোনা মামি। সোনা মামি গো। আমারে করিলায় বদনামি ॥
আমি হইতে আল্লা রছুল, আমি হইতে কুল।
পাগলা হাছন রাজা বলে তাতে নাই ভুল ॥
আমা হইতে আসমান জমিন আমি হইতেই সব।
আমি হইতে ত্রিজগৎ, আমি হইতে রব ॥
আমি আউয়াল, আমি আখের জাহের বাতিন।
না বুঝিয়া দেশের লোকে ভাবে মোরে ভিন ॥
আমা হইতে পয়দা হইছে, এই ত্রিজগৎ।
গউর করি চাইয়া দেখ হে, আমার ও মন ॥
আক্কল হইতে পয়দা হইল মাবুদ আল্লার।
বিশ্বাসে করিল পয়দা, রছুল উল্লার ॥
মম আঁখি হইতে পয়দা, আসমান জমিন।
কর্ণ হইতে পয়দা হইছে, মুসলমানী দিন ॥
আর পয়দা করিল যে, শুনিবারে যত।
সবদ, সাবদ, আওয়াজ ইত্যাদি যে কত।
শরীরে করিল পয়দা, শক্ত আর নরম।
আর পয়দা করিয়াছে, ঠান্ডা আর গরম ॥
নাকে পয়দা করিয়াছে খুশবয় আর বদবয় ॥
আমি হইতে সব উৎপত্তি হাছন রাজা কয় ॥
মরণ জিয়ন নাইরে আমার ভাবিয়া দেখ ভাই।
ঘর ভাঙ্গিয়া ঘর বানানি এই দেখিতে পাই ॥
পাগল হইয়া হাছন রাজা কিসেতে কি কয়।
মরব মরব দেশের লোক মোর কথা যদি রয় ॥
জিহ্বায় বানাইয়ি আছে মিঠা আর তিতা।
জীবনের মরণ নাইরে দেখ সর্বদাই জিতা ॥
আপন চিনিলে দেখ খোদা চিনা যায়।
হাছন রাজায় আপন চিনিয়ে এই গান গায় ॥


হাছন রাজায় বলে ও আল্লা ঠেকাইলায় ভবের জঞ্জালে।
বেভুলে মজাইলায় মোরে এই ভবের খেলে ॥
বন্ধের সনে প্রেম করিবার বড় ছিল আশা।
ভবের জঞ্জালে ফেলে করিলে দুর্দশা ॥
স্ত্রী হইল পায়ের বেড়ি পুত্র হইল খিল।
কেমনে করিবায় হাছন বন্ধের সনে মিল ॥
স্ত্রীপুত্রের মায়ায় রইলায় ভবেতে মজিয়া।
মরণ পরে স্ত্রী-পুত্র না পাইবায় খুঁজিয়া ॥
(আর) বাপ মইলা, ভাই মইলা আর মইলা মাও।
এর কিনা বুঝলায় হাছন এ সংসারের ভাও।
(আর) দিন গেল হেলে দুলে রাত্রি গেল নিন্দে ॥
ফজরে উঠিয়া হাছন হায় হায় করি কান্দে ॥
(আর) কান্দিয়া হাছন রাজায় কয় আরপীন নগর বইয়া।
দিবা নিশি আছি কেবল বন্ধের চরণ চাইয়া।


মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দী হইয়া রে।
কান্দে হাছন রাজার মন মনিয়া রে ॥
মায়ে বাপে বন্দী কইলা, খুশী র মাঝারে।
লালে ধলায় বন্দী হইলাম, পিঞ্জিরার মাঝারে ॥
উড়িয়া যায় রে ময়না পাখী, পিঞ্জিরায় হইল বন্দী।
মায়ে বাপে লাগাইয়া, মায়া জালের আন্দি ॥
পিঞ্জিরায় সামাইয়া ময়নায় ছটফট করে।
মজবুত পিঞ্জিরা ময়নায় ভাঙ্গিতে না পারে ॥
উড়িয়া যাইব শুয়া পক্ষী, পড়িয়া রইব কায়া।
কিসের দেশ কিসের খেশ, কিসের মায়া দয়া ॥
ময়নাকে পালিতে আছি দুধ কলা দিয়া।
যাইবার কালে নিষ্ঠুর ময়নায় না চাইব ফিরিয়া ॥
হাছন রাজায় ডাকব তখন ময়না আয়রে আয়।
এমন নিষ্ঠুর ময়নায়, আর কি ফিরিয়া চায় ॥


লোকে বলে, লোকে বলে রে, ঘর বাড়ী ভালা না আমার।
কি ঘর বানাইব আমি শূন্যের মাঝার ॥
ভালা করি ঘর বানাইয়া কয়দিন থাকব আর।
আয়না দিয়া চাইয়া দেখি পাকনা চুল আমার ॥
এই ভাবিয়া হাছন রাজায় ঘর দুয়ার না বান্ধে।
কোথায় নিয়া রাখবো আল্লায় এর লাগিয়া কান্দে ॥
হাছন রাজায় বুঝতো যদি, বাঁচব কত দিন।
দালান কোঠা বানাইত করিয়া রঙ্গীন ॥


আঁখি মুঞ্জিয়া দেখ রূপ রে, আঁখি মুঞ্জিয়া দেখ রূপ রে,।
আরে দিলের চড়ে চাহিয়া দেখ বন্ধুয়ার স্বরূপ রে।
কাজল কোঠা ঘরের মাঝে, বসিয়াছে কালিয়া।
দেখিয়া প্রেমের আগুন উঠিল জ্বলিয়া ॥
কিবা শোভা ধরে (ওরে) রূপে দেখতে চমৎকার।ৎ
(আর) বলা নাহি যায় বন্ধের রূপের বাহার ॥
ঝলমল ঝলমল করে (ওরে) রূপে বিজলীর আকার।
মনুষ্যের কি শক্তি আছে, চক্ষু ধরিবার ॥
হাছন রাজায় রূপ দেখিয়া, হইয়া ফানা ফিল্লা।
হু হু হু হু ইয়াহু ইয়াহু, বল আল্লা আল্লা।


আমি যইমুরে যাইমু আল্লার সঙ্গে।
ও আমি যাইমুরে যাইমু আল্লার সঙ্গে ॥
হাছন রাজায় আল্লা বিনে কিছু নাহি মাঙ্গে ॥
আল্লার রূপ দেখিয়ে হাছন রাজা, হইয়াছে ফানা।
নাচিয়ে নাচিয়ে হাছন রাজায় গাইতেছে গানা ॥
আল্লার রূপ, আল্লর রঙ, আল্লারও ছবি।
নুরের বদন আল্লার, কি কব তার খুবি ॥
হাছন রাজা দিলের চক্ষে আল্লাকে দেখিয়া।
নাচে নাচে হাছন রাজা প্রেমে মাতয়াল হইয়া ॥
উন্মাদ হইয়া নাচে, দেখিয়া আল্লার ভঙ্গী।
হুস-মুস কিছু নাই, হইছে আল্লার সঙ্গী ॥
আদম ছুরত আল্লার জানিয়ায় বেসক।
খলকা আদমা আলা ছুরতেহি হক ॥
রূপের ভঙ্গী দেখিয়ে হাছন রাজা হইছে ফানা।
শুনে নারে হাছন রাজায়, মুল্লা মুন্সীর মানা।


রঙ্গিলা বাড়ৈ এই ঘর বানাইয়াছে কলে।
রঙ্গে রঙ্গে ঘর বানাইয়া, বসি ঘরে খেলে ॥
মাটি দিয়া ঘর বানাইয়া, চামড়ার দিছে ছানি।
পত্তন করিয়াছে ঘর মূলধন তার পানি ॥
(আর) মনির চেরাগ দিছে টুল্লির নীচে দিয়া।
সর্ব কার্য করে সে যে, সেই রওশনী দেখিয়া ॥
কত কোঠা বানাইয়াছে, দেখতে মনোহর।
সারি সারি কোঠা সব দেখিতে সুন্দর ॥
কোঠার মাঝে প্যাদা পাইক আছে সারি সারি।
কোঠায় কোঠায় বসাইয়াছে কত যে প্রহরী ॥
মলকুতে, মেকাইল দিছে, ঘুরে আজরাইল।
নাছুতে ইছরাফিল খাঁড়া, মুখে জিব্রাইল ॥
ঘরখানি বানাইয়া ঘরে বসিয়া রঙ্গ চায়।
ছয়টি রিপু দিছে ঘরে কেমনে খেইড় খেলায় ॥
হাছন রাজায় বলে আমার, বাড়ৈর হাতে তালা।
ঘরের মাঝে বসিয়া কত রঙ্গে করে খেলা ॥


হাছন রাজায় কয়, আমি কিছু নয়রে, আমি কিছু নয়।
অন্তরে বাহিরে দেখি, (কেবল) দয়াময় ॥
প্রেমেরি বাজারে হাছন রাজা, হইয়াছে লয়।
তুমি বিনে হাছন রাজায়, কিছু না দেখয় ॥
প্রেম জ্বালায় জ্বলি মইলাম, আর নাহি সয়।
যেদিকে ফিরিয়ে চাই, বন্ধু দেখি ময় ॥
তুমি আমি, আমি তুমি ছাড়িয়াছি ভয়।
উন্মাদ হইয়া হাছন, নাচন করয় ॥


একদিন তোর হইবে মরণ রে হাছন রাজা
একদিন তোর হইবে রে মরণ।
মায়াজালে বেড়িয়ে মরণ, না হইল স্মরণ রে,হাছন রাজা।
একদিন তোর হইবে মরণ ॥
যমের দূতে আসিয়া তোমায়, হাতে দিবে দড়ি।
টানিয়া টানিয়া লইয়া যাবে, যমেরও পুরী রে ॥
সে সয়ম কোথায় রইব (তোমার) সুন্দর সুন্দর স্ত্রী।
কোথায় রইব রামপাশা, কোথায় লক্ষণছিরি রে ॥
করবায়নি রে হাছন রাজা রামপাশায় জমিদারী।
করবায়নি রে কাপনা নদীর পারে ঘুরাঘুরি রে ॥
(আর) যাইবায়নি রে হাছন রাজা, রাজাগঞ্জ দিয়া।
করবায়নি রে হাছন রাজা দেশে দেশে বিয়া রে ॥
ছাড় ছাড় হাছন রাজা, এ ভবের আশা।
প্রাণ বন্ধের চরণতলে, কর গিয়া বাসা রে ॥
গুরুর উপদেশ শুনিয়া, হাছন রাজায় কয়।
সব তেয়াগিলাম আমি, দেও পদাশ্রয় রে ॥
হাছন রাজা, একদিন তোর হইবে মরণ।
১০
দেখা দেও দেখা দেও বন্ধুরে ভুবন মোহন।
দেখা দিলে থাকে হাছন রাজার জীবন রে ॥
দেখা দেও দেখা দেও বন্ধুরে ॥
দেখা দেও দেখা দেও বন্ধু, হৃদয়ের চান।
দেখা দিলে বাঁচে তোমার হাছনের প্রাণ রে ॥
প্রেমানলে জ্বলিয়া আমার তনু ঝর ঝর।
এব নাকি প্রাণের বন্ধে ভাবে মোরে পর রে।
কাকুতি করিয়ে ডাকি আইস বন্ধু কোলে।
গাঁথিয়া রেখেছি হায় পরাইব তোর গলে রে।
ঘরখানি সাজাইয়ে আছি কত রঙ দিয়া।
পবিত্র করিয়াছি ঘর গোলাব ছিটাইয়া রে।
হাছন রাজার মনের আশা পূরাও দেখা দিয়া।
তোমায় লাগি হাছন রাজার প্রাণ যায় জ্বলিয়া রে ॥

১১
মরণ কালেরে কে যাইবে তোর সঙ্গে
তুমি তো ভুলিয়া আছ, স্ত্রী পুত্রের রঙ্গে ॥
কিসে কি কররে মন আঙ্গে আর ডাঙ্গে।
স্বামীর সেবা না করিলে, ধরাইবনি লাঙ্গে ॥
স্বামীর সেবা না করিলায়, দিন গেল গইয়া।
বেভুলে মজিয়া রইলায়, কার দিকে চাইয়া ॥
আমার ভাসাইলায় গো আল্লা সুরমা নদী গাঙ্গে।
ভাসিয়া ভাসিয়া হাছন রাজা, তোমার চরণ মাঙ্গে ॥

১২
কামাই কৈলে জামাই পাইবায় ভালো গো সুন্দরী নাতিন।
কামাই কৈলে জামাই পাইবায় ভাল।
সোনা জামাই বুচা দিব, তোমার রাঙ্গা গাল গো ॥
ভাল করিয়া কর কামাই, দিন আর রাইত।
রাত্রির মাঝে বিছানায় না হইও কাইত।’
নিজ নাম ধরিয়া জামাইর, ডাকে দিলে জানে।
অবশ্য আসিব জামাই, শুনিলে করণে।
হাছন রাজায় বলে জামাই, আছে গো অন্তরে।
একমনে না ডাকিলে, আইসে না মন্তরে।
ডাক ডাক হাছন জান গো, এক মন হইয়া।
এখনি তোর প্রাণের জামাই কোলে লইব আইয়া ॥

১৩
ছাড়িলাম হাছনের নাও রে।
হাছন রাজার নাও রে ॥
চলো চলো পবন ঘোড়া।
আরে বৈঠা ফালাইতে নারে ॥
হৈ হেঁইয়া-হেঁ-হেঁ-হেঁ-
সুখের মায়ায় করছিল পীরিত
নদীর কূলে বইয়া।
এখন কেন ছাইড়া গেল
সায়রে ভাসাইয়া রে ॥
হৈ হেঁইয়া-হেঁ- হেঁ- হেঁ।
নায়ের থাইকা হাছন রাজা
বলে যে ডাকিয়া।
পীরিত না করিও রে ভাই
মন না দেখিয়া রে ॥

১৪
সোনা বন্ধে আমারে দেওয়ানা বানাইল।
দেওয়ানা বানাইল মোরে, পাগল করিল ॥
আরে না জানি কি মন্ত্র পড়িয়ে যাদু করিল।
কিবা ক্ষণে হইল আমার, তার সঙ্গে দেখা
অংশীদার নাইরে তার সে তো হয় একা ॥
রূপের ঝলক দেখিয়ে তার আমি হইলাম ফানা।
সে অবধি লাগল আমার, শ্যামপীরিতের টানা ॥
হাছন রাজা হইল পাগল, লোকের হইল জানা।
নাচে নাচে, ফালায় ফালায়, আর গায় গানা।
মুখ চাইয়া হাসে আমার, যত আরি-পরি।
দেখিয়াছি বন্ধের রূপ ভুলিতে না পারি।
ভালো মন্দ যাই বল, তার লাগিয়া না ডরি।
লাজলজ্জা ছাড়িয়া বন্দের থাকব চরণ ধরি ॥
দেওয়ানা হইয়া হাছন, কিসেতে কি বলে।
মার কাট যাই কর থাকব চরণ তলে ॥

১৫
প্রেমের আগুন লাগল রে, হাছন রাজার অঙ্গে।
নিভে না আগুন, ডুবলে সুরমা গাঙ্গে ॥
ধা ধা করি জ্বলছে আগুন, কিসে কি করেঙ্গে।
আনিয়া দে গো প্রাণের বন্ধুরে গলেতে ধরেঙ্গে ॥
হাছন রাজা বন্ধু বিনে কিছু নাহি মাঙ্গে।
বন্ধুর আশায় নাচে হাছন, প্রেমেরই তরঙ্গে ॥
হাছন রাজায় বলে আমি, যাইমু বন্ধের সঙ্গে।
আমিত্ব ছাড়িয়া দিয়া মিশব তার সঙ্গে ॥

১৬
কারে বন্ধে করিব পার মোল্লার ঝি কারে বন্ধে করিব পার।
তোর বাপে করে নমাজ-রোজা আমি গোনাগার ॥
তোর বাপে দিনে-রাইতে নমাজ রোজা করে।
লোক সমাজে বসিয়ে কেন, নিন্দা করে মোরে ॥
তোর বাপে সর্বদাই, করে এবাদত।
মুই গুনাগারে লইয়া কট মোল্লার মত।
নামাজ নামাজ কও মোল্লাজী জায়নামাজনি চিন।
পিছ করটে আল্লা থৈয়া ঢুস দেও যে ময়দান ॥
খোদা খোদা কও মোল্লাজী খোদারেনি চিন।
গাই বান্দ দুধ থৈয়া লেইজ ধরি টান ॥
হাছন রাজার আল্লারে মুল্লায় নাহি দেখে।
আজলের আন্ধি লাগছে কট মোল্লাজীর চোখে।
চউক থাকিতে দিনের কানার মত নাহি রই।
সাক্ষাতে যে বন্ধু খাড়া মোল্লায় বলে কই ॥

১৭
বাড়ৈ, কই লুকাইলায় রে।
ঘরখানি বানাইয়া রে বাড়ৈ, কই লুকাইলায় রে ॥
(আর) ঘরে বাইরে হাছন রাজায় তারে তুকাইল রে।
বরুয়া বাশেঁর ঘরখানি
বাখাল বাঁশের আড়া।
ঢলুয়া বাঁশ দিয়া দিছে
চতুর্দিকের বেড়া রে ॥
উলুছন দিয়া দিছে
ঘরে এই না ছানি।
মেঘ আসিলে চুয়ায় চুয়ায়
পড়ে ঘরে পানি ॥
সকল ঘর বিচারিয়া দেখি।
টুল্লিয়ে দুয়ার।
সেইখানে বসিয়া আছে।
বন্ধুয়া আমার ॥
(আর) বন্ধুয়ারে দেখিয়া আমার
চিত্ত ব্যাকুল।
হাছন রাজায় গান গায়।
বাজাইয়া ঢোল ॥

১৮
প্রেমানলে হাছন রাজা জ্বলিল।
জ্বলিয়া যাইতে হাছন রাজা এই বলিল ॥
আমি যে জ্বলিয়া মরি নাই মোর দুঃখ।
জ্বলিয়া পুড়িয়া দেখিমু বন্ধের মুখ ॥
হাছন রাজা জ্বলিয়া মরতে নাচা কুদা করে।
প্রেমের আগুন ধরিয়াছে সকল শরীরে ॥
নিভাইলে না নিভে আগুন ধাক ধাকিয়া উঠে।
লুটন কবুতরের মত, হাছন রাজা লুটে ॥
ছটফট করে হাছন, চতুর্দিকে চায়।
মম দুঃখ দেখিয়ানি মোর প্রাণবন্ধু আয় ॥

১৯
আমি তোমার কাঙ্গালী গো সুন্দরী রাধা,
আমি তোমার কাঙ্গালী গো।
তোমার লাগিয়া কান্দিয়া ফিরে,
হাছন রাজা বাঙ্গালী গো ॥
তোমার প্রেমে হাছন রাজার মনে হুতাশন।
একবার আমি হৃদ কমলে, করয়ে াাসন ॥
আইস আইস প্রাণপ্রেয়সী ধরি তোমার পায়।
তোমায় না দেখিলে আমার জ্বলিয়ে প্রাণ যায় ॥
ছট্ ফট্ করে হাছন তোমার কারণ।
ত্বরা করি না আসিলে হইব মরণ ॥
কান্দে কান্দে হাছন রাজা পড়ে আছাড়া খাইয়া।
শীঘ্র করি প্রাণপ্রেয়সী, কোলে লও উঠাইয়া ॥
কোলে লইলে ঠা-া হইব, হাছন রাজার হিয়া।
সব দুঃখ পাশরিব, চান্দ মুখ দেখিয়া ॥
হিন্দুয়ে বলে তোমায় রাধা, আমি বলি খোদা।
রাধা বলিয়া ডাকিলে, মুল্লা মুন্সিয়ে দেয় বাধা ॥
হাছন রাজা বলে আমি, না রাখিব জুদা।
মুল্লা মুন্সির কথা যত সকলই বেহুদা ॥

২০
বন্দে কেন আমায় ভালবাসে না।
ছয় মাসে নয় একদিন আসে না ॥
আমি বলি আইস তারে,সে তো যায় গিয়া পরের ঘরে।
কাকুতি মিনতি করি আমার ঘরে বসে না।
কপালে মোর কি যে লেখা লেখিয়াছে প্রাণসখা।
দিয়ে দেখা আয়না কাছে প্রাণ মোর বাঁচে না ॥
কি যে আমি কি করিব, কেমন করিয়ে মন ফিরাব।
যত যতœ করি সে তো আমার হয় না।
হাছন রাজা কান্দিয়া বলে আবার আসলে ধরব গলে।
তুলিয়ে লইব প্রিয় কোলে, ছাড়িয়া দিব না ॥

২১
আগুন লাগাইয়া দিল কোনে, হাছন রাজার মনে।
নিবে না দারুণ আগুন জ্বলে দিল জানে ॥
ধাক্ ধাক্ করিয়ে উঠিল আগুন
ধৈল আমার প্রাণে।
সুরমা নদীর জল দিয়ে নিবে না সে কেনে ॥
লাগাইল, লাগাইল আগুন আমার মনমোহনে।
বাঁচি না গো বাঁচি না গো, প্রাণ বন্ধু বিহনে।
জ্বলিয়া জ্বলিয়া যায় রে আগুন, কিসে নাই মানে।
বুঝিয়া দেখরে হাছন রাজা ধরাইল না তোর ধনে ॥

২২
মরণ কথা স্মরণ হইল না হাছন রাজা তোর,
মরণ কথা স্মরণ হইল না ॥
যখনে মরিয়া যাইবায়, মাটিতে হইব বাসা।
তখনে কোথায় রইব লক্ষণছিরি রঙ্গের রামপাশা ॥
হাড় খাইব হাড়–য়া পোকে, মাড়ইল খাইব ঘুণে।
পূণ্য পন্থা না চিনিলায় যৌবনের গুমানে ॥
না রহিব ঘর বাড়ী না রহিব সংসার।
না রহিব লক্ষণছিরি নাম পরগণার ॥
কান্দিয়া হাছন রাজায় বলে, আল্লা কর সার।
কি ভাবিয়া নাচ হাছন শূন্যের মাঝার।

২৩
গুড্ডি উড়াইল মোরে, মৌলার হাতে ডুরি।
হাছন রাজারে যেমনে ফিরায়, তেমনে দিয়া ফিরি ॥
মৌলার হাতে আছে ডুরি, আমি তাতে বান্ধা।
যেমনে ফিরায়, তেমনে ফিরি, এমনি ডুরির ফান্ধা।
গুড্ডি যে বানাইয়া মোরে বাতাসে উড়াইয়া।
খেইড় খেলায় মোরে দিয়া, কান্না মু-া দিয়া ॥
রঙ্গে রঙ্গে মোরে দিয়া, খেইড় খেলাইয়া।
হাউস মিটাইয়া, মুই গুড্ডিরে, ফেলিব ফাড়িয়া ॥
গুড্ডি হাছন রাজায় কান্দে, না লাগব তার দয়া।
মাটিতে মিশাইব আমার, সোনার বরণ কায়া।
হাছন রাজায় মিন্তি করে, মৌলার চরণ ধরি।
চরণ ছায়ায় রাখ মৌলা, দাসকে তোমারি ॥

২৪
হাছন রাজা রে কয়দিন, কয়দিন তোর আর বাকী।
এখনও নাচ তুমি লইয়ে সব সখী ॥
পুতের দাড়ি পাকিয়ে গেল নাতির উঠিল রেকি।
এখনও সংসারী কামে, রহিলায় ঠেকি ॥
দিন গেলদিন গেল কেবল দেখি দেখি দেখি।
চিরকালই এই মতে কাল কাটাইবায় নাকি ॥
আনন্দ করিতে আছ করিয়াছি সুখী।
পাছে দিয়া নাহি চাও কি রাখিয়াছি লেখি ॥
পরমাত্মা, জীবাত্মা সঙ্গে করে ডাকাডাকি।
পিছে দিয়া ফিরিয়া চাও না হইবায় দুঃখী ॥
হাছন রাজায় শুনিয়া বাক্য, ফিরাইল আঁখি
বন্ধের সঙ্গে মিলত গিয়া, করে উকি বাকি।

২৫
কলে হাসে কলে মাতে, কলে করে কারখানা।
মন রে তুই হইল ফানা।
কলের মালিক দেখিয়া হইল, হাছন রাজা মস্তানা ॥
রঙ্গে রঙ্গে কল বসাইয়া, করতেছে কলে খেলা।
সুজন যারা বুঝবে তারা, জ্ঞানীদের আছে জানা ॥
চক্ষে দেখে, কানে শুনে নাকে বাস পায়।
মুখে দেখ রঙ্গ বিরঙ্গে গাইতেছে কলে গানা ॥
উন্দা কল, আনন্দ কল, হৃদয় কলে মারিয়ে তালা।
দম্ কারিগর আইস হাছন রাজার তো জানা চিনা।
আইস বন্ধু বইস কাছে, কেন কর টানামানা।
কারিগরের রূপ দেখিয়ে, হাছন রাজা দেওয়ানা।
প্রেমের নাচন নাচে হাছন, শুনে না কারও মানা ॥
মন রে তুমি হইলায় ফানা ॥
২৬
দিলবরের মা কেনে আইলে বাজারে ॥
কি জিনিস কিনিলে তুই, বল্লে না আমারে ॥
হাছন রাজা জিজ্ঞাস করে দিলবরের মা তোরে।
কি জিনিস কিনিয়া আনলায়, আপনার ঘরে ॥
নুন নিমু, মরিচ নিমু, আর নিমু আদা।
ছালন রান্ধিয়া খাইমু, শোন ঠাকুর দাদা।
পেটের ধান্ধা দুর করিয়া বন্দের চরণ ধর ॥

২৭
আইস পর্দা খুলিয়া গো মা, আইস পর্দা খুলিয়া গো।
হাছন রাজার প্রাণ যায়, তোমার লাগি জ্বলিয়া গো ॥
তোমার আমার বাড়ীর মধ্যে আছে একখান টাটি।
কাটিয়া কুটিয়া টানিখান, করিয়াছি বাটী গো ॥
টাটির আড়ে থাকিয়া তুমি, বসিয়া রঙ্গ কর।
আড় নয়নের চাও কেন, বসিয়া একই ঘর গো ॥
হাছন রাজায় দেখিয়ে তোরে, মুস্করিয়া হাসে ॥
অন্তরের সহিতে তোরে, বড় ভালবাসে গো ॥

নিউজটি শেয়ার করুন .. ..                  

 ‘‘আমাদের বিক্রমপুরআমাদের খবর

আমাদের সাথেই থাকুনবিক্রমপুর আপনার সাথেই থাকবে!’’

একটি উত্তর দিন

দয়া করে আপনার কমেন্টস লিখুন
দয়া করে আপনার নাম লিখুন