ক্ষিতিমোহন সেনর জন্ম ১৮৮০ সালের ২ ডিসেম্বর বৃটিশ ভারতের পূর্ব বাংলার আজকের বাংলাদেশের বিত। সংস্কৃতচর্চার বিশেষ ঐতিহ্য ছিল এই বৈদ্যপ্রধান গ্রামটির। পরিবারটির নিষ্ঠাবান ও আচারপরায়ণ বলে খ্যাতিক্রমপুরের (বর্তমানে মুন্সিগঞ্জ জেলার টঙ্গিবাড়ী উপজেলার) সোনারং গ্রামের নামকরা অধ্যাপক, কবিরাজ ও বহুশাস্ত্রবিদ পণ্ডিত রামমণি শিরোমণির বংশে। জাতিতে বৈদ্য, পদবি তাই ‘সেন’। শাস্ত্রবিদের বংশে সকলেই পণ্ডিও ছিল। তার চেয়েও বেশি খ্যাতি ছিল পাণ্ডিত্যের। তবে রক্ষণশীল এই পরিবারের আর্থিক প্রাচুর্য ছিল না।
ক্ষিতিমোহনের পিতা ভুবনমোহন সেন ছিলেন চিকিৎসক। মা দয়াময়ী দেবী। এঁদের পুত্রকন্যারা হলেন অবনীমোহন, ধরণীমোহন, ক্ষিতিমোহন, মেদিনীমোহন ও প্রমোদিনী।
ক্ষিতিমোহন সেনের নানা ছিলেন বিচারক ও পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত আধুনিক মননের মানুষ।
ক্ষিতিমোহন সেনের মামারা উচ্চশিক্ষার জন্য বিলেতে গিয়েছিলেন কালা পানি পার হয়ে এই অপরাধের কারণে গ্রামে তাঁরা একঘরে হন।
ঘটনা হলো দুই পরিবারই ছিল টঙ্গিবাড়ির সোনারং গ্রামের বাসিন্দা। ফলে দুই পরিবার মধ্যে ছেলে মেয়ে বিয়ে দিয়ে (ক্ষিতিমোহন সেনের বাবা মা) আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে তুলেন। এই আত্মীয়তার সম্পর্ক বা দুই পরিবারের মধ্যে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার ফলে ক্ষিতিমোহন সেনের বাবা ডাক্তার ভুবনমোহন সেনের পরিবারেরও ধোপা, নাপিত বন্ধ হয়ে যায়। তাঁদেরকে সমাজে একঘরে করে দেয়া হয়।
যদিও ক্ষিতিমোহন সেনের দয়াময়ীকে দমানো যায়নি।
ক্ষিতিমোহন সেনের পিতামহ রামমণি শিরোমণি তার ওপর বিখ্যাত কবিরাজ। গ্রামে টোল খুলে অধ্যাপনাও করেন। প্রতিবেশী দশ-বিশটা গাঁয়ে তাঁর খুব নামডাক।
কিন্তু, সে-সব ছেড়ে রামমণি সপরিবারে কাশীবাসী হবেন বলে স্থির করে ফেললেন। কারণ, কোষ্ঠী। হ্যাঁ, কোষ্ঠীতে লেখা বাহাত্তর বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হবে। কাশীধামে মৃত্যু হলে মোক্ষ মেলে। হিন্দুধর্মের আজন্ম তাই-ই তো শাস্ত্রীয় বিশ্বাস। সে-কারণেই রামমণির কাশীবাসের সিদ্ধান্ত। বাহাত্তরে পা দিতেই তাঁরা টঙ্গিবাড়ীর সোনারং গ্রাম ছেড়ে পানিপথে পাড়ি দিলেন কাশী। বাসা বাঁধলেন এসে বাঙালিটোলার পাতালেশ্বরে। ক্ষিতিমোহন তখন নিতান্তই শিশু।
কাশীতে এসে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। পিতামহের বাহাত্তর পূর্ণ হল তবু মরলেন না, কিন্তু পিতামহী মারা গেলেন দুম করে। পিতামহ যে শুধু বাহাত্তরেই মরলেন না এমন নয়, কোষ্ঠীর লিখন মিথ্যে করে আরও পঁচিশটা বছর বহাল তবিয়তে কাটিয়ে দিলেন। তারই মধ্যে শিশু ক্ষিতিমোহন। ক্ষিতিমোহনের শৈশব কাশীতেই বেশি কাটে। নিজেকে তিনি কাশীর মানুষ বলেই মনে করতেন।
ক্ষিতিমোহনের মামারা কালাপানি পেরিয়ে বিলেত গিয়েছিলেন পড়তে। সেই অপরাধে গ্রামের চাঁইরা তাঁদের একঘরে করে ধোপা-নাপিত বন্ধ করে দিয়েছিল। মামাবাড়িটি ছিল ক্ষিতিমোহনের গ্রামেই। এপাড়া-ওপাড়া। ফলে, মামাবাড়ির জন্য যে শাস্তি বহাল হল, ক্ষিতিমোহনদের বাড়িটি তার প্রকোপ থেকে রক্ষা পেল না। বিলেতমুখী পশ্চিমী-শিক্ষার জন্য যে পরিবারটির উপর দিয়ে অহেতুক ঝড় বয়ে গেছে, ক্ষিতিমোহনের সেই পরিবারটি কিছুতেই চাইল না যে, ছেলেরা ইংরেজিধারায় পড়ুক। ক্ষিতিমোহনের মনটি অবশ্য সংস্কৃত সাহিত্য-শাস্ত্র-স্মৃতি-ন্যায়-দর্শন-জ্যোতিষ-ব্যাকরণ পড়ার জন্য তৈরি হয়েই ছিল। টোল-চতুষ্পাঠীতে সেই পথ আরও প্রশস্ত হল। আর এ-পথেই কুইন্স কলেজ থেকে ‘শাস্ত্রী’ উপাধি নিয়ে এমএ পাশ করেন।
এম এ পাশ করার পরে তাঁর সঙ্গে বরিশাল জেলার গৈলা গ্রামনিবাসী পেশায় ইঞ্জিনিয়র মধুসূদন সেনের বড় মেয়ে কিরণবালার বিয়ে হয়।
ক্ষিতিমোহনের প্রথম কন্যাসন্তান রেণুকার জন্ম ১৯০৪ সালে।
তবে দ্বিতীয় কন্যাসন্তান ফেণী মাত্র আড়াই বছর বসে মারা যায়।
এর পর ১৯০৮ সালে পুত্র ক্ষেমেন্দ্রমোহন (কঙ্কর),
১৯১০ সালে কন্যা মমতা (লাবু) ও
১৯১২ সালে অমিতার জন্ম হয়। অমিতার পুত্র নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেন তাঁর নাতি।
ক্ষিতিমোহন কলকাতার মেডিক্যাল কলেজেও ভর্তি হন। তাঁর সহপাঠী ছিলেন বিধানচন্দ্র রায়। কিন্তু বড় দাদা অবনীমোহন হঠাৎ মারা যাওয়ায় পরিবারের যাবতীয় দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর উপরে। ফলে ডাক্তার হওয়ার চেষ্টা ছেড়ে চাকরির সন্ধানে নামতে হয় তাঁকে। ১৯০৭ সালে তিনি হিমালয়ের কোলে পাহাড় ঘেরা ছোট করদ রাজ্য চম্বায় রাজা ভুরি সিংহের বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের কাজ পান।
১৯০৮ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাকে শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্যাশ্রমের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদানের আহ্বান জানালে তিনি এতে সাড়া দিয়ে অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৫৩ থেকে ৫৪ সাল পর্যন্ত তিনি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ক্ষিতিমোহনই শিক্ষিত শহুরে বাঙালিকে ভারতীয় মধ্যযুগের সুফিসন্তদের সাধনা ও সাহিত্যর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন যেমন, তেমনই বাংলার বাউলদের গুপ্ত সাধনার খবরও এনে দিয়েছিলেন। আবার ভারতে হিন্দু মুসলমানের যুক্ত সাধনার খোঁজ ক্ষিতিমোহনের কাছ থেকেই আমরা পেয়েছি। ১৯১১-১৩ সময়কালের দিকে তাকালে দেখা যাবে শান্তিনিকেতন আশ্রমে ক্ষিতিমোহনের উৎসাহ ও ব্যবস্থাপনায় রবীন্দ্রনাথের পঞ্চাশ বছরের জন্মদিন পালিত হচ্ছে। পরের বছর কবি চিকিৎসার প্রয়োজনে ইংল্যান্ড যান। আমেরিকাতেও গিয়েছিলেন। এই ভ্রমণের সময়ে রবীন্দ্রনাথ আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন ক্ষিতিমোহনকে নিয়ে যেতে, যাতে স্বামী বিবেকানন্দের পর একজন যোগ্য ব্যক্তি পাশ্চাত্যের সামনে প্রাচ্যের সাধনার খবর সঠিক অর্থে পৌঁছে দিতে পারেন। কিন্তু শেষ অবধি তা সম্ভব হয়নি। তবে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ক্ষিতিমোহনের চিন ও জাপান সফর সম্ভব হয়েছিল ১৯২৪ সালে, যা তাঁর জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য পর্ব। একই ভাবে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে গুজরাত ভ্রমণও তেমনই একটি পর্ব।
শান্তিনিকেতনে আসার মাত্র চার বছরের মধ্যে ক্ষিতিমোহন আশ্রমের একজন অপরিহার্য ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছিলেন। সকলের কাছে তিনি কালক্রমে আশ্রমের ‘ঠাকুর্দা’ এবং তাঁর স্ত্রী কিরণবালা হয়ে উঠেছিলেন ‘ঠানদি’। রবীন্দ্রনাথ ক্ষিতিমোহনকে কেবল শিক্ষক হিসেবে চাননি, ‘আপনি মনে করিতেছেন, আপনি কেবল আপনার ছাত্রদের লইয়াই কাজ করিবেন – সেটা আপনার ভুল। আমরাও আছি।… ছাত্রদের পাইয়া আমাদিগকে অবহেলা করিবেন না’।
মধ্যযুগের সন্তদের বাণী, বাউল সঙ্গীত এবং সাধনতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা ও সংগ্রহে তার কৃতিত্ব উল্লেখযোগ্য। প্রায় পঞ্চাশ বছরের চেষ্টার ফলে সংগৃহীত বিষয়গুলো কয়েকটি বইতে তিনি প্রকাশ করেন। রবীন্দ্রনাথ সম্পাদিত ওয়ান হান্ড্রেড পোয়েমস অফ কবির (১৯১৪) বইটিও তার সংগ্রহ অবলম্বনে রচিত। এছাড়াও তিনি বেদ, উপনিষদ, তন্ত্র, স্মৃতিশাস্ত্র, সঙ্গীতশাস্ত্র এবং আয়ুর্বেদশাস্ত্রেও পারদর্শী ছিলেন।
তার রচিত হিন্দুইজম বইটি ফরাসি, জার্মান এবং ডাচ ভাষায় এবং আরো কয়েকটি গ্রন্থ হিন্দি, গুজরাটি এবং অসমীয়া ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। তিনি সংস্কৃত, বাংলা ও হিন্দি ছাড়াও গুজরাতি, রাজস্থানি, আরবি ও ফারসি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। তিনি সুবক্তা ও অপেশাদার অভিনেতা হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। ১৯৪৬ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে লীলা বক্তব্য দেন।
ক্ষিতিমোহন সেনের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে:
∆কবীর (১৯১১)
∆ভারতীয় মধ্যযুগের সাধনার ধারা (১৯৩০)
∆ভারতের সংস্কৃতি (১৯৪৩)
∆বাংলার সাধনা (১৯৪৫)
∆যুগগুরু রামমোহন (১৯৪৫)
∆জাতিভেদ (১৯৪৬)
∆বাংলার বাউল (১৯৪৭)
∆হিন্দু সংস্কৃতির স্বরূপ (১৯৪৭)
∆ভারতের হিন্দু-মুসলমান যুক্ত সাধনা (১৯৪৯)
∆প্রাচীন ভারতে নারী (১৯৫০)
∆চিন্ময় বঙ্গ (১৯৫৭)
∆রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ (১৯৬১)
∆Hinduism (১৯৬৩)
∆Medieval Mysticism of India (১৯৩৬)
বিশ্বভারতী থেকে ‘রবীন্দ্র-স্মৃতি স্বর্ণপদক’ (১৯৪২) ও প্রথম ‘দেশিকোত্তম’ (১৯৫২)
ওয়ার্ধার হিন্দি ভাষা প্রচার সমিতি থেকে ‘মহাত্মা গান্ধী পুরস্কার’ (১৯৫৩)
প্রয়াগের হিন্দি সাহিত্য সম্মেলন থেকে ‘মুরারকা পুরস্কার’ (১৯৫৩) এবং
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘সরোজিনী বসু স্বর্ণপদক’ (১৯৫৪)
১৯৬০ সালের ১২ মার্চ আশি বছর বয়সে বিক্রমপুরের কৃতিসন্তান পণ্ডিত ক্ষিতিমোহন সেনশাস্ত্রী পরলোকগমন করেন।
@
নাছির উদ্দিন আহমেদ জুয়েল
তারিখ: ১৮ জুলাই ২০২৫