জয়তু বিপ্লবী দীনেশ গুপ্ত

0
1
জয়তু বিপ্লবী দীনেশ গুপ্ত

প্রকাশিত: সোমবার, ৭ জুলাই, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ।। ২৩ আষাঢ় ১৪৩২ বঙ্গাব্দ (বর্ষাকাল)।। ১১ মহরম, ১৪৪৭ হিজরী।

বিক্রমপুর খবর : অনলাইন ডেস্ক : ১৯৩১ সালের ৭ জুলাই দীনেশের ফাঁসির তারিখে তিনি ভোরবেলা স্নান করে ফাঁসির পোশাক পরলেন। অতঃপর হাসতে হাসতে সার্জেন্টকে বললেন, ‘এবার যাওয়া যেতে পারে।’ ধীর গম্ভীর পদক্ষেপে ফাঁসিমঞ্চের দিকে অগ্রসর হলেন মৃত্যুঞ্জয়ী দীনেশ। সার্জেন্ট তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমার কিছু বলার আছে কি বন্দি?’ দীনেশ উত্তর দিল ‘প্লিজ স্টপ। আমাদের বলার অধিকার যে কারা কেড়ে নিয়েছে, সে কথা তোমরাই ভাল জান। ডু ইওর ডিউটি, আই এম রেডি।’ পর মুহূর্তে দীনেশ ফাঁসির মঞ্চে উঠে নিজ হাতে ফাঁসি-রজ্জু গলায় পরেন। বন্দেমাতরম বলতে বলতে ফাঁসিরজ্জুতে শেষ নিঃশ্বাস থমকে যায়। সেই সাথে নিভে যায় বিপ্লবী দীনেশ গুপ্তের জীবন প্রদীপ। জয়তু বিপ্লবী দীনেশ গুপ্ত। ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করার সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৯ বছর।

ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে বিনয়-বাদল-দীনেশের নামানুসারে কলকাতার ডালহৌসি স্কয়ারের নাম পাল্টে রাখা হয় বি-বা-দী বাগ। অর্থাৎ বিনয়-বাদল-দীনেশ বাগ।
অগ্নিযুগের সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের সূচনা থেকেই ঢাকার অনুশীলন সমিতি, যুগান্তর পার্টি, চট্টগ্রামের দি ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি, বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স, মালামার বিপ্লবী দল, কলকাতার অনুশীলন সমিতি, মেদিনীপুর বিপ্লবী দল, বিপ্লবী কমিউনিস্ট সংগঠন, স্বরাজ পার্টিসহ অন্যান্য বিপ্লবী দল স্বাধীনতা সংগ্রামে সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। এসব দলের অসংখ্য বিপ্লবী সদস্যরা ভারতমাতার স্বাধীনতার জন্য জীবন বলিদানের মন্ত্র সানন্দে গ্রহণ করেন এবং তাদের মধ্যে অনেকেই জীবন উৎসর্গ করেন। বিপ্লবী দীনেশ গুপ্তও এই জীবন উৎসর্গকারীদের একজন।
বিপ্লবী দীনেশ গুপ্ত জন্মেছিলেন ১৯১১ সালের ৬ ডিসেম্বর (বাংলা ১৩১৮ সনের ২০ অগ্রহায়ণ)। তৎকালীন ঢাকা জেলার (বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলার টঙ্গিবাড়ী উপজেলার) যশোলঙ্গ গ্রামে। তার বাবা সতীশচন্দ্র গুপ্ত। আর মা বিনোদিনী দেবী। ছোটবেলায় দীনেশ গুপ্তের ডাকনাম ছিল নসু। চার ভাই ও চার বোনের মধ্যে দীনেশ গুপ্ত ছিলেন বাবা-মা’র তৃতীয় সন্তান।
দীনেশ গুপ্তের বাবা সতীশচন্দ্র ছিলেন ডাক বিভাগের কর্মচারী। চাকুরি সূত্রে তিনি একবার পরিবার নিয়ে বেশ কিছুদিন গৌরীপুরে ছিলেন। গৌরীপুরেই দীনেশ গুপ্ত একটি পাঠশালাতে পড়াশুনার হাতেখড়ি নেন। এরপর তারা বাবার চাকুরির কারণে ঢাকায় বদলি হয়ে আসেন। তখন দীনেশ গুপ্ত নয় বছরে পা দিয়েছেন। ঢাকায় আসার পর তাকে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি করানো হয়। এসময় দীনেশ গুপ্ত ঢাকার গেন্ডারিয়া অঞ্চলে দাদুর বাড়িতে বসবাস করতেন। কিছুদিন পর পৈত্রিক বাসভবন ওয়ারীতে চলে আসেন।
ছোটবেলা থেকেই দীনেশ গুপ্ত ছিলেন নির্ভীক ও দুরন্ত প্রকৃতির। পড়াশুনার পাশাপাশি খেলাধুলায়ও পারদর্শী ছিলেন তিনি।
স্কুলজীবন থেকেই দীনেশ গুপ্ত স্বদেশপ্রেম ও রাজনীতির বিষয়ে সচেতন হয়ে উঠতে থাকেন। কারণ ওই সময়ে সমগ্র ভারতে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। যা প্রতিটি সচেতন পরিবারের সদস্যরা জানতো এবং সন্ধ্যার পরে পাড়া-মহল্লায় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন নিয়ে নানা আলোচনা হতো। এই আলোচনার মাঝে ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকী, বাঘা যতীনসহ আরো অনেক বিপ্লবীর বিপ্লবী জীবনের কথা উঠে আসতো। তখন ওই সমস্ত পরিবারের কিশোর-তরুণরা খুব মনোযোগ দিয়ে এসব কিংবদন্তি বিপ্লবীদের জীবন কাহিনী শুনতো। কিশোর-তরুণরা বিপ্লবীদের নিয়ে লেখা বই-পুস্তকও বেশ আগ্রহ সহকারে পড়তো। দীনেশ গুপ্তও ছিল সেইসব তরুণদের একজন। ১০ম শ্রেণিতে পড়াশুনাকালীন সময়ে তিনি বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্স (বিভি) নামে একটি গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠনের সংস্পর্শে আসেন।
১৯২৬ সালে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে (ঢাকা বোর্ড) ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হন। পরীক্ষার পরে তিনি মেদিনীপুরে বেড়াতে যান। সেখানে তার বড়দা জ্যোতিশ চন্দ্র গুপ্ত থাকতেন। দীনেশের দাদা জ্যোতিষ গুপ্ত ছিলেন মেদিনীপুর আদালতের স্বনামধন্য আইনজীবী।
মেদিনীপুর ছিল বাংলার বিপ্লবীদের আরেক তীর্থস্থান। মেদিনীপুরের বিপ্লবীদের সাথে ভারতের প্রায় সকল বিপ্লববাদী দলের কমবেশি সম্পর্ক ছিল। এই সময় দীনেশ গুপ্ত মেদিনীপুরের বিপ্লবী কার্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার কথা দলকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু দল তাঁকে মেদিনীপুরে কাজ করার অনুমতি দেয়নি। বরং তাকে ঢাকায় গিয়ে কাজ করতে বলা হয়। ঢাকায় ফিরে দীনেশ গুপ্ত ঢাকা কলেজে আইএসসি’তে ভর্তি হন। পড়াশুনা ও বিপ্লবী কাজকর্মে মনোনিবেশ করেন। এক পর্যায়ে তিনি পড়াশুনার চেয়ে বিপ্লবী দলের কাজকর্মের উপর বেশি গুরুত্ব দেন। ১৯২৮ সালে তিনি ঢাকা কলেজ থেকে আইএসসি পরীক্ষা দেন। কিন্তু পড়াশুনার চেয়ে বিপ্লবী দলের কাজকর্মের উপর বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কারণে তিনি আইএসসি’তে পরীক্ষা দিয়ে কৃতকার্য হতে পারেননি।
ওই বছর সুভাষ চন্দ্র বসু নতুনভাবে বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স বাহিনীকে গড়ে তোলেন। যার চরিত্র ছিল সামরিক। বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স বাহিনীতে নারী ও পুরুষ বিপ্লবী ছিল। তার উদ্যোগে বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স বাহিনীকে সামরিক মানসিকতায় শিক্ষা প্রদান করা হয় এবং স্বাধীনতার জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে বিপ্লবীদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করা হয়। দীনেশ গুপ্ত ঢাকা কলেজে পড়াশুনাকালীন সময়ে সুভাষ চন্দ্র বসু’র নতুনভাবে গড়া বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত হন।
১৯২৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে দীনেশ গুপ্ত মেদিনীপুরে গিয়ে পড়াশুনা করার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর তিনি দলের অনুমতি নিয়ে মেদিনীপুরে চলে যান। সেখানে গিয়ে মেদিনীপুর বিপ্লবী দলের সাথে যোগাযোগ রাখতে শুরু করেন। সাথে সাথে তিনি ওইখানে বিভি’র শাখা স্থাপনের কাজ শুরু করেন। তখন দীনেশ গুপ্ত পড়াশুনা করার জন্য ভর্তি হলেন মেদিনীপুর কলেজে। থাকতেন আইনজীবী দাদা’র কাছে। এসময় তিনি বিপ্লবী দলের সদস্য সংগ্রহের পাশাপাশি পড়াশুনা চালিয়ে যেতে থাকেন। দীনেশ মেদিনীপুরের বহু স্কুল-কলেজের ছাত্রকে বিপ্লবী দলে টেনে এনেছিলেন।
সে সময় বাংলাসহ সারা ভারতের বিপ্লবীদের ওপর ইংরেজ শাসকগোষ্ঠী নির্মমভাবে অত্যাচার-নির্যাতন চালাতে শুরু করে। একের পর এক বিপ্লবীকে ধরে নিয়ে জেলখানায় আটক রেখে পাশবিক নির্যাতন চালায়। যে কারণে অনেক বিপ্লবী মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন হয়ে যায়। ক্ষুদিরামের ফাঁসির পর ব্রিটিশ সরকার দৃঢ়ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, যারা সশস্ত্র বিদ্রোহের মাধ্যমে ব্রিটিশ-শাসনকে উচ্ছেদ করতে চাইবে, তাদের মধ্যে যারা ফাঁসিকাষ্ঠ থেকে রেহাই পাবে, তাদেরকে আন্দামানে পাঠানো হবে। বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে চল্লিশের দশক পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকারের ফাঁসিকাষ্ঠ থেকে রেহাই পাওয়া প্রায় সকল সশস্ত্র বিপ্লবীকে আন্দামানে যেতে হয়েছিল। আর আন্দামান সেলুলার জেল ছিল সবচেয়ে ভয়ংকার জেল। এক কথায় বলা যায়, মৃত্যুফাঁদ।
এসমস্ত ঘটনার কারণে ব্রিটিশদের চরম শিক্ষা দেওয়ার জন্য সুভাষ চন্দ্র বসু তখন ‘বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স’কে অ্যাকশনধর্মী বিপ্লবী সংগঠন হিসেবে গড়ে তোলেন। শুরু হয় বিপ্লবীদের আগ্নেয়াস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ। এই প্রশিক্ষণে দীনেশ গুপ্তও বিপ্লবীদের প্রশিক্ষণ দিতেন। এক পর্যায়ে সুভাষ চন্দ্র বসু’র নেতৃত্বে এই সংগঠনের বিপ্লবীরা কুখ্যাত ব্রিটিশ পুলিশ অফিসারদের হত্যা বা নিশ্চিহ্ন করার পরিকল্পনা করেন। ১৯২৯-৩০ সালের মধ্যে দিনেশ গুপ্তের প্রশিক্ষিত বিপ্লবীরা ডগলাস (উড়ঁমষধং), বার্জ (ইঁৎমব) এবং পেডি (চধফফু) এই তিনজন কুখ্যাত ব্রিটিশ জেলা ম্যাজিস্ট্রটকে হত্যা করেছিল।
১৯৩০ সালে ইংরেজ শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচার-নির্যাতন আরো বহুগুণে বেড়ে যায়। শতশত রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও বিপ্লবীদের গ্রেফতার করে জেলে আটক রেখে নির্যাতন চালায়। এই সময় ব্রিটিশ পুলিশ সুভাষচন্দ্র বসু, যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত এবং সত্য বকসীর মত নেতৃত্বকেও গ্রেফতার করে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে আটক রাখে। একের পর এক নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করে আলিপুর সেন্ট্রাল জেল ভরিয়ে ফেলা হচ্ছিল। এইসব বন্দিদের মধ্যে ছিলেন অসংখ্য সশস্ত্র বিপ্লবী দলের সদস্য এবং অহিংস আন্দোলনের স্বেচ্ছাসেবকরা। একপর্যায়ে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে নতুন বন্দিদের জায়গা দেওয়া যাচ্ছিল না। জেলের মধ্যে সৃষ্টি হল এক অসহনীয় অবস্থা। রাজবন্দিদের মধ্যে বিক্ষোভ দানা বেঁধে উঠেছিল। তারা জেলকোড অনুযায়ী কয়েকটি দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। এই আন্দোলন দমানোর জন্য ব্রিটিশ পুলিশ বেদমভাবে লাঠিচার্জ করে। অতঃপর পাগলা ঘণ্টি বাজানো হল। রাজবন্দিদের ওপর চলল নির্মম-নিষ্ঠুর অত্যাচার। সুভাষচন্দ্র, যতীন্দ্রমোহন এবং সত্য বকসীরাও বাদ গেলেন না নির্মম-নিষ্ঠুর অত্যাচার থেকে। এ ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ল জেলের ভেতরে। জানা গেল এই নির্মম-নিষ্ঠুর অত্যাচারের পিছনে রয়েছে ইন্সপেক্টর জেনারেল কর্নেল এন. এস সিম্পসন সাহেব।
বিপ্লবীরা প্রস্তুতি নিলেন অত্যাচারী সিম্পসনকে উচিৎ শিক্ষা দেওয়ার জন্য। পরিকল্পনা হল শুধু সিম্পসন নয়, ইংরেজ আমলাদের বুঝিয়ে দিতে হবে যে, বাঙালিরাও লড়তে জানে, মারতে জানে। কাঁপিয়ে দিতে হবে বিদেশি সাম্রাজ্যবাদকে।
বিপ্লবীরা জেলের ইন্সপেক্টর জেনারেল কর্নেল এন. এস সিম্পসনকে টার্গেট করেছিল। সিম্পসন জেলখানার বন্দিদের ওপর পাশবিক নির্যাতনের জন্য কুখ্যাত ছিল। শুধু সিম্পসন নয়, রাইটার্স ভবনে আক্রমণ করে ব্রিটিশ অফিসারদের হত্যা করে ওদের অত্যাচার-জুলুমের জবাব দিতে হবে। কলকাতার ডালহৌসি স্কোয়ারে অবস্থিত ছিল ব্রিটিশ শাসকদের সচিবালয়। যার নাম রাখা হয়েছিল রাইটার্স ভবন। এই ভবনেই উচ্চপদস্থ ব্রিটিশ আমলারা অফিস করতেন।
১৯৩০ সালের ৮ ডিসেম্বর ‘রাইটার্স বিল্ডিং’ আক্রমণ করার সিদ্ধান্তÍ নেয়া হল। আক্রমণের জন্য সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করা হল। খুব সতর্ক অবস্থায় তাদের প্রশিক্ষণের কাজও সমাপ্ত হল। বিনয়-বাদল-দীনেশ বিপ্লবী নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনা করে বিদায় নিলেন। ৮ ডিসেম্বর অ্যাকশনের জন্য তিন বিপ্লবী প্রস্তুত। ‘রাইটার্স বিল্ডিং’ এর একটি কক্ষে কারা বিভাগের সর্বময় কর্তা ইন্সপেক্টর জেনারেল কর্নেল সিম্পসন তার কাজকর্ম পরিচালনা করছেন। তার ব্যক্তিগত সহকারী জ্ঞান গুহ পাশে দাঁড়িয়ে আলোচনা করছেন। বেলা ঠিক ১২ টার সময়। সামরিক পোশাক পরে তিনজন বাঙালি যুবক এসে কর্নেল সিম্পসনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন।
তারা সিম্পসনের চাপরাশিকে (সহকারী) ঠেলে কামরার ভেতরে প্রবেশ করেন। হঠাৎ পদধ্বনি শুনে কর্নেল তাদের দিকে তাকান। বিস্ময়-বিমূঢ় চিত্তে দেখতে পান সম্মুখে মিলিটারি পোশাক পরে তিনটি বাঙালি যুবক রিভলবার হাতে দণ্ডায়মান। মুহূর্তের মধ্যে বিনয়ের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়– ‘প্রে টু গড কর্নেল। ইওর লাস্ট আওয়ার ইজ কামিং।’ কথাগুলি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে তিনটি রিভলবার হতে ছয়টি গুলি সিম্পসনের দেহ ভেদ করে। সিম্পসন লুটিয়ে পড়ে মেঝের উপর। এরপরই গুলির আঘাতে আহত হন জুডিসিয়াল সেক্রেটারি মি. নেলসন। এলোপাথাড়ি গুলিবর্ষণ করতে করতে বিপ্লবীরা পরবর্তী লক্ষ্য হোম সেক্রেটারি আলবিয়ান মারের কক্ষের দিকে অগ্রসর হন। ততক্ষণে এই আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য ছুটে আসেন পুলিশ-ইন্সপেক্টর জেনারেল মি. ক্র্যাগ ও সহকারি ইন্সপেক্টর জেনারেল মি. জোনস। তারা কয়েক রাউন্ড গুলিও ছুড়েন। কিন্তু বিনয়-বাদল-দীনেশের বেপরোয়া গুলির মুখে তারা দাঁড়াতে পারলেন না। প্রাণ নিয়ে পালালেন। সমস্ত ‘রাইটার্স বিল্ডিং’ জুড়ে তখন এক বিভীষিকাময় রাজত্ব। চারিদিকে শুধু ছুটাছুটি। কে কোন দিকে পালাবে দিশা খুঁজে পাচ্ছিল না। শুধু কলরব-কোলাহল-চিৎকার। শুধু এক রব, বাঁচতে চাও তো পালাও।
‘রাইটার্স বিল্ডিং’ আক্রমণের সংবাদ পেয়ে পুলিশ কমিশনার টেগার্ট আসেন। ডেপুটি কমিশনার গার্ডন আসেন সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে। পাদ্রী রেভারেন্ড জনসন ‘ড্রেন-পাইপে’র মধ্য পালিয়ে থাকলেন। জুডিসিয়াল সেক্রেটারি মি. নেলসন, মি. টয়নয় প্রমুখ অনেক ইংরেজ রাজপুরুষ আহত হলেন। আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য ডেকে আনা হল গুর্খাবাহিনী।
অন্যদিকে তিনটি বাঙালি তরুণ, হাতে শুধু তিনটি রিভলবার। আর অপরদিকে রাইফেলধারী সুশিক্ষিত গুর্খাবাহিনী। আরম্ভ হল ‘অলিন্দ যুদ্ধ’। ইংরেজ মুখপত্র ‘স্টেটসম্যান’ পত্রিকার ভাষায় ‘বারান্দা বেটল’। দীনেশের পিঠে একটি গুলিবিদ্ধ হল। তিনি তাতে ভ্রুক্ষেপও করলেন না। অসংকোচে গুলিবর্ষণ করতে লাগলেন শত্রুকে লক্ষ্য করে। যতক্ষণ পর্যন্ত বিনয়-বাদল-দীনেশের হাতে গুলি ছিল, ততক্ষণ কেউই তাদের আক্রমণ করে প্রতিহত করতে পারেননি। একপর্যায়ে তাদের গুলি নিঃশেষ হল। গুর্খা ফৌজ অনবরত গুলিবর্ষণ করে চলল। তখন তিনজন বিপ্লবী একটি শূন্য কক্ষে প্রবেশ করে সঙ্গে আনা ‘সায়ানাইড’-বিষের পুরিয়াগুলি মুখে দিলেন। বিষক্রিয়ায় অতি-দ্রুত জীবনপ্রদীপ নির্বাপিত না হওয়ার আশঙ্কায় এবং মৃত্যুকে নিশ্চিত করার জন্য প্রত্যেকেই নিজ নিজ মস্তক লক্ষ্য করে রিভলবারে রাখা শেষ গুলিটি ছুঁড়ে দিলেন। বাদল তৎক্ষণাৎ মৃত্যুবরণ করেন। বিনয় ও দীনেশ সাংঘাতিক আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মেঝের উপর পড়ে রইলেন।
ভীষণভাবে আহত বিনয় ও দীনেশকে একটু সুস্থ করে তাদের ওপর চলল প্রচণ্ড অত্যাচার। উভয়কেই পুলিশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। পুলিশ কমিশনার টেগার্ট এতদিন পরে বিনয়ের ওপর আক্রোশ মিটানোর সুযোগ পেলেন। অচেতন বিনয়ের হাতের আঙুলের উপর সবুট পদক্ষেপে সবগুলি আঙুল ভেঙে ফেলে বীরত্ব প্রদর্শন করলেন। বিনয় ছিলেন মেডিকেল স্কুলের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। তিনি জানতেন মৃত্যুর পথ। হাসপাতালে অবস্থানকালে তিনি ১৪ ডিসেম্বর রাত্রে আকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুকে বরণ করার জন্য মস্তকের ‘ব্যান্ডেজে’র ভিতর আঙুল ঢুকিয়ে স্বীয় মস্তিষ্ক বের করে আনেন এবং মৃত্যুকে বরণ করে নেন।
অন্যদিকে ডাক্তার ও নার্সদের আপ্রাণ চেষ্টায় দীনেশ ক্রমশ সুস্থ হয়ে উঠেন। সুস্থ হওয়ার পর দীনেশের উপর চলে প্রচণ্ড অমানবিক নির্যাতন। এভাবে দীর্ঘদিন নির্যাতন ও চিকিৎসার পর তাঁকে হাসপাতাল থেকে ‘কনডেমড’ সেলে নেয়া হয়। দীনেশের বিচারের জন্য আলীপুরের সেশন জজ মি. গ্রালিকের সভাপতিত্বে ব্রিটিশ সরকার এক ট্রাইবুন্যাল গঠন করে। দীনেশের ফাঁসির আদেশ দেয়া হয়। উক্ত ট্রাইবুন্যালে বিচারের নামে চলে প্রহসনের নাটক।
অবশেষে ইংরেজ সরকার ১৯৩১ সালের ৭ জুলাই দীনেশের ফাঁসি কার্যকর করার নির্দেশ দেয়।
লেখক : শেখ রফিক, সম্পাদক: বিপ্লবীদের কথা
√√ বিনয়-বাদল-দীনেশ বিপ্লবী ৩ জনই বিক্রমপুরের কৃতি সন্তান।

নিউজটি শেয়ার করুন .. ..           

‘‘আমাদের বিক্রমপুর– আমাদের খবর।
আমাদের
সাথেই থাকুন– বিক্রমপুর আপনার সাথেই থাকবে!’’

Login করুন : https://www.bikrampurkhobor.com
আমাদের পেইজ এ লাইক দিন শেয়ার করুন।
জাস্ট এখানে ক্লিক করুন। https://www.facebook.com/BikrampurKhobor
email – bikrampurkhobor@gmail.com

একটি উত্তর দিন

দয়া করে আপনার কমেন্টস লিখুন
দয়া করে আপনার নাম লিখুন