ইতিহাসের চিরস্মরণীয় নাম এ টি এম হায়দার

0
60
ইতিহাসের চিরস্মরণীয় নাম এ টি এম হায়দার

প্রকাশিত:শনিবার,৭ নভেম্বর ২০২০ইং ।। ২২শে কার্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ (হেমন্তকাল)।। ২০শে রবিউল আউয়াল,১৪৪২ হিজরী।
বিক্রমপুর খবর : অনলাইন ডেস্ক : বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে লে.কর্নেল এটিএম হায়দার এসএসজি বীর উত্তম এক অবিস্মরণীয় নাম । রণাঙ্গণে বীরদর্পে যুদ্ধ করে একাত্তরে সেনাবাহিনীর যে বীর বাঙালি সদস্যরা মহান মুক্তিযুদ্ধে সামরিক প্রতিরোধ ও মুক্তিযোদ্ধা বাহিনীর ভিত্তি কাঠামো তৈরি করেছিলেন তাঁদের অন্যতম তৎকালীন মেজর ও পরবর্তী সময়ে লে. কর্নেল এটিএম হায়দার ।একজন গেরিলা কমান্ডার হিসাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অভূতপূর্ব অবদান রাখার জন্য তিনি বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত হন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় ২ নম্বর সেক্টর কমান্ডার (সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর) ছিলেন এটিএম হায়দার । মো. ইসরাইল মিয়া ও হাকিমুন্নেসার পুত্র এটিএম হায়দারের জন্ম কলকাতার ভবানীপুরে, ১৯৪২ সালের ১২ জানুয়ারি ।তাদের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার জয়কা ইউনিয়নের কান্দাইল গ্রামে। দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে হায়দার ছিলেন দ্বিতীয় । পাবনা বীণাপানি স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের পর ১৯৫৮ সালে কিশোরগঞ্জ রামানন্দ হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক, ১৯৬১ সালে কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল সরকারি কলেজ থেকে আইএ এবং ১৯৬৩ সালে লাহোর ইসলামিয়া কলেজ থেকে বিএসসি পাস করেন ।

লাহোরের পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটি থেকে পরিসংখ্যানে এমএসসি প্রথম পর্ব সমাপ্তির পর সামরিক বাহিনীতে কমিশন্ড পদে মনোনীত হন তিনি । ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন । তিনি প্রথমে কাকুলে ট্রেনিং নেন এবং কমিশন প্রাপ্তির পর গোলন্দাজ বাহিনীর অফিসার হিসেবে নিয়োজিত হন। চেরাটে এমএসজি (স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপ) ট্রেনিংয়ে অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে একজন দক্ষ গেরিলা কমান্ডার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

কমিশন প্রাপ্তির পর ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি পাকিস্তান মুলতান ক্যান্টনমেন্টে কর্মরত ছিলেন । ১৯৬৯ সালের শেষের দিকে তৃতীয় কমান্ডো ব্যাটালিয়নের একজন ক্যাপ্টেন হিসেবে তাঁকে কুমিল্লা সেনানিবাসে পাঠানো হয়। ১৯৭১ সালের জানুয়ারিতে তাঁকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। ১৫-২০ দিন পর পুনরায় কুমিল্লায় নিয়োগ করা হয়। মার্চ মাসের প্রথম দিকে ঢাকায় সামরিক ছাউনিতে তাঁবুর মধ্যে কয়েকজন বাঙালি অফিসারের সঙ্গে তাঁকেও অন্তরীণ রাখা হয় । মার্চ মাসের ২১-২২ তারিখে তাঁকে আবারো কুমিল্লা সেনানিবাসে তৃতীয় কমান্ডো ব্যাটালিয়নে পাঠানো হয়। এটিই বাংলাদেশে প্রথম পাকিস্তানি কমান্ডো ব্যাটালিয়ন ।

২৬-২৭ মার্চ কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের পতনের দিন সকাল ১০টায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পালিয়ে যান তিনি । তিনি চতুর্থ বেঙ্গলের অন্য অফিসারদের সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মিলিত হন। সেখান থেকে তেলিয়াপাড়া, পরে ভারতের মতিনগর হয়ে আগরতলার মেঘালয়ে যান। তখন দুই নম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টার ছিল মেঘালয়ে। হায়দার এখানে প্রথমে একটি স্টুডেন্ট কোম্পানি গঠন করেন । তিনি নিজেই কোম্পানিকে গেরিলা ট্রেনিং প্রদান করতেন ।পরবর্তী সময়ে দুই নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে তিনি নিয়োজিত হন। মেঘালয়ে মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের কমান্ডো, বিস্ফোরক ও গেরিলা প্রশিক্ষণসহ শপথও তিনি করাতেন। ৭ অক্টোবর ‘কে ফোর্স’ গঠনের পর মেজর হায়দার দুই নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত হন।

এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় তিনি ভারতীয় কমান্ডো ও ৬-৭ জন সৈন্য নিয়ে কিশোরগঞ্জে আসেন এবং কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ মহাসড়কের তারেরঘাট ব্রিজ, মুসুল্লি রেলওয়ে ব্রিজ ধ্বংস করে প্রতিরোধ ব্যবস্থা সুসংহত করেন । তিনি বিশেষ গেরিলা অপারেশন পরিচালনা করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনীতে অবস্থিত বড় ব্রিজটি ধ্বংস করেন মে মাসের শেষ সপ্তাহে । ডিসেম্বর মাসে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পতনের পর ঢাকায় পাক হানাদারদের আত্মসমর্পণের আগে মিত্রবাহিনীর হাই কমান্ডসহ হেলিকপ্টারে তিনি ঢাকার অদূরে ডেমরা পর্যন্ত আসেন এবং সার্বিক পরিস্থিতি স্বচক্ষে অবলোকন করেন ।

বীর মুক্তিযোদ্ধা লে. কর্নেল হায়দার ১৬ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাকিস্তানিদের আত্মসর্মপণের অনুষ্ঠানে যোগ দেন । যাঁরা এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তাদের মধ্যে তিনি ও এ কে খন্দকারই ছিলেন বাঙালি অফিসার ।

স্বাধীনতার পর ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ সকাল ৮টা ১০ মিনিটে মুক্ত বাংলাদেশে রেডিও প্রথম চালু হলো । মুক্তিযোদ্ধা ফতেহ আলী চৌধুরী ঘোষক হিসবে ঘোষণা করলেন যে, এখন জাতির উদ্দেশে কিছু বলবেন সেক্টর ২-এর কমান্ডার ইনচার্জ মেজর আবু তাহের মোহাম্মদ হায়দার । সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে মেজর হায়দার তাঁর সংক্ষিপ্ত বক্তব্য শুরু করলেন ।

তিনি বললেন: আমি মেজর হায়দার বলছি । প্রিয় দেশবাসী, আমাদের প্রিয় দেশকে মুক্ত করা হয়েছে। আমাদের দেশ এখন মুক্ত । আপনারা সবাই এখন মুক্ত বাংলাদেশের নাগরিক । এরপর মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশে বললেন, সকল গেরিলার প্রতি আমার নির্দেশ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে হবে । কোথাও যেন আইনশৃঙ্খলা বিনষ্ট না হয় । লুটপাট বন্ধ করতে হবে । এলাকায় এলাকায় পাহারার ব্যবস্থা করতে হবে । যতদিন পর্যন্ত প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার দেশে ফিরে দায়িত্ব না নেবেন, ততদিন পর্যন্ত গেরিলাদের যার যার এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে হবে । জনগণের প্রতি আমার আবেদন, আইন ও শৃঙ্খলা রক্ষা করুন । আলবদর, আলশামস, রাজাকার ও দালালদের ধরিয়ে দিন । নিজ হাতে আইন তুলে নেবেন না ।ওই দিন দুপুর থেকে মেজর হায়দার ইস্কাটনে লেডিস ক্লাবকে সেক্টর-২ সদর দপ্তর হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করলেন।

১৯৭২ সালে মেজর থাকা অবস্থায় কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে ১৩ ইস্টবেঙ্গল প্রতিষ্ঠা করেন হায়দার । ১৯৭৪ সালে তিনি লে. কর্নেল পদে উন্নীত হন এবং চট্টগ্রাম সেনানিবাসে অষ্টম বেঙ্গলের কমান্ডিং অফিসার হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন । ১৯৭৫-এর প্রথম সপ্তাহ অক্টোবর থেকে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি ছুটি কাটান। ২৭ অক্টোবর চট্টগ্রামের রুমা সেনানিবাসে যোগদান করেন।

১৯৭৫ সালের আগস্ট ১৫ আগস্ট ভোরে নৃশংসভাবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে ঘাতকেরা । খুব অল্প সময়ের মধ্যে বঙ্গবন্ধুসহ তার পরিবারের ১৮ জনকে এই পৃথীবি থেকে সরিয়ে দেয় তারা । সেই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডে পাষন্ড ঘাতকদের হাত থেকে রেহাই পায়নি শিশু রাসেল,শিশু বাবু,এমনকি অস্তঃসত্ত্বা বধূও ।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বাংলাদেশ ঘোর অমাবশ্যায় ডুবে থাকা এক জনপদের নাম । সপরিবারে হত্যার পর বিশ্বাসঘাতক খন্দকার মোশতাক রাষ্ট্রপতির পদ দখল করেন। বিপথগামী খুনী মেজরচক্র ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান করে । খেয়াল-খুশি মতো আদেশ-অধ্যাদেশ জারি করে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার চেষ্টা চালায় । ২৩ আগস্ট মোশতাক সরকার গ্রেফতার করে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন (অব.) এম মনসুর আলী, তাজউদ্দীন আহমদ, এএইচএম কামরুজ্জামান, শেখ আবদুল আজিজ, আবদুস সামাদ আজাদ, এম কোরবান আলী, আবদুল কুদ্দুস মাখন, হাশেম উদ্দিন পাহাড়ীসহ আরও বেশ কয়েকজন নেতাকে। তাঁদের গ্রেফতারের পরদিন ২৪ আগস্ট মেজর জেনারেল কেএম শফিউল্লাহকে অপসারণ করে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সারাদেশে সামরিক বিধি জারি করে বেশ কয়েকটি সংক্ষিপ্ত সামরিক আদালত গঠন করা হয়। ৩০ আগস্ট এক সরকারী আদেশে সকল রাজনৈতিক কর্মতৎপরতা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ৬ সেপ্টেম্বর জিল্লুর রহমান, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ এবং কয়েকদিনের ব্যবধানে আমির হোসেন আমু, গাজী গোলাম মোস্তফা, এমএ জলিল, এমএ মান্নান, সরদার আমজাদ হোসেন, নুরুল হক, এম শামসুদ্দোহা, এম মতিউর রহমানসহ অসংখ্য নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। এই সময় অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের নামে নির্যাতন-নিপীড়ন, বাড়িঘর ভাঙচুর, গ্রেফতার চালানো হয় দেশব্যাপী।

কেউ কেউ আশ্রয় নেন প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ, শেখ সেলিম, ওবায়দুল কাদের, মো. নাসিম, মোস্তফা মহসিন মন্টু, শাহ মোহাম্মদ আবু জাফর, লতিফ সিদ্দিকী, পংকজ ভট্টাচার্য, ডাঃ এসএ মালেক, এসএম ইউসুফ, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, খোকা রায়, রবিউল মুক্তাদিরসহ অসংখ্য নেতৃস্থানীয় সংগঠক ।

কাদের সিদ্দিকী বেশকিছু অনুসারীসহ মেঘালয়ে আশ্রয় নেন এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ ও খুনীদের বিতাড়িত করার জন্য প্রতিরোধের ডাক দেন।

১৬ অক্টোবর এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকার বীরউত্তমকে বিমানবাহিনী প্রধানের পদ থেকে অপসারণ করে পাকিস্তানপন্থী এমজি তাওয়াবকে বিমান বাহিনীর প্রধান নিযুক্ত করা হয়। এ সময় সেনাবাহিনীতে চরম বিশৃঙ্খলা চলতে থাকে। খন্দকার মোশতাক এবং জেনারেল জিয়ার প্রশ্রয়ে খুনী ফারুক-ডালিম-রশীদ চক্রের ঔদ্ধ্যত্বপূর্ণ আচরণ সেনাবাহিনীর অনেকেই পছন্দ করেনি। এমনি পরিস্থিতিতে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ জেনারেল জিয়ার নিজস্ব বেঙ্গল রেজিমেন্টের ৪৬ ব্রিগেডের কিছু তরুণ অফিসার দিয়ে জিয়াকে গৃহবন্দী করে সেনাবাহিনীর পদ থেকে অবসরের কাগজ স্বাক্ষর করিয়ে নেয়। খালেদ মোশাররফ সেনাপ্রধানের দায়িত্ব নেন।

পাল্টা অভ্যুত্থানের খবর পেয়ে সে রাতেই খুনী মোশতাক ও মেজরচক্র কারাভ্যন্তরে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী যারা বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্ব দিয়েছিল তাদের হত্যার পরিকল্পনা করে। ৩ নবেম্বর শেষরাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সকল নিয়মনীতি ভঙ্গ করে খুনীর দল কারাভ্যন্তরে প্রবেশ করে জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এইচএম কামরুজ্জামানকে একটি কক্ষে জড়ো করে ব্রাশ ফায়ারে নির্মমভাবে হত্যা করে ।

জাতীয় ৪ নেতাকে হত্যার পর সর্বত্র আতঙ্ক, বিশৃঙ্খলা ও গুজব প্রচার হতে থাকে । সর্বত্র প্রচার হতে থাকে যে, ভারতীয় সহযোগিতায় খালেদ মোশাররফ ক্ষমতা দখল করেছে। এমনি পরিস্থিতিতে কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান ঘটানোর জন্য ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ ও গণবাহিনীর নামে লিফলেট বিতরণ এবং বাস্তব উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।যাই হোক, পাল্টা অভ্যুত্থানে জেনারেল খালেদ মোশাররফ নিহত হন এবং জিয়া পুনরায় সেনাপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। জাসদের অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং দেশী-বিদেশী চক্রান্তে জিয়া সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হন।

১৯৭৫ সাল ৬ই নভেম্বর বাবার টেলিগ্রাম পেয়ে পারিবারিক কাজে বান্দরবানের রামু থেকে ঢাকায় এসেছিলেন হায়দার। সেদিন দুপুরে তিনি জেনারেল ওসমানী ও সেনাবাহিনীর কয়েকজন বন্ধুর সাথে দেখা করেন। একই দিন সন্ধ্যায় তাঁর প্রিয় সেক্টর কমান্ডার এবং নতুন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের সাথে তার যোগাযোগ হয়। সে রাতে তাঁর সাথে বঙ্গভবনে যান।

সিপাহী বিপ্লবের খবর পেয়ে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর রাত ১২ টায় বঙ্গভবনে সিপাহী বিপ্লবের খবর পেয়ে জেনারেল খালেদ কর্নেল হুদা ও কর্ণেল হায়দারকে সঙ্গে নিয়ে প্রথমে ব্রিগেডিয়ার নুরুজ্জামানের বাসায় যান। সেখান থেকে ভোর প্রায় ৩ টায় জেনারেল খালেদ কর্নেল হুদা ও কর্ণেল হায়দার শেরে বাংলা নগরে অবস্থিত ১০ম বেঙ্গল রেজিমেন্টে যান ! উল্লেখ্য এই রেজিমেন্টের তৎকালীন কমান্ডিং অফিসার ছিলেন কর্নেল নওয়াজিস ।

৭ই নভেম্বর ভোরবেলা, কথিত সিপাহী বিদ্রোহের প্রবল ঢেউ ১০ম বেঙ্গলে এসে পড়ে। পরিস্থিতি কর্নেল নওয়াজিসের নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যায় । আফিসার মেসে বসে খালেদ মোশাররফ, হায়দার এবং হুদা সকালের নাস্তা করছিলেন । এমন সময় মেজর জলিল (জাসদ নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা মেজর জলিল নন), ক্যাপ্টেন আসাদ কয়েকজন উত্তেজিত সৈনিক নিয়ে মেসের ভিতর প্রবেশ করে। তার সাথে একজন হাবিলদারও ছিল ।

ওই মেজর জলিল চিৎকার দিয়ে জেনারেল খালেদকে বলল-“আমরা তোমার বিচার চাই”! জেনারেল খালেদ শান্তকণ্ঠে জবাব দিলেন,” ঠিক আছে , তোমরা আমার বিচার করো। আমাকে জিয়ার কাছে নিয়ে চলো।”

স্বয়ংক্রিয় রাইফেল বাগিয়ে হাবিলদার চিৎকার করে বললো-“আমরা এখানেই তোমার বিচার করবো।”

ধীর স্থির জেনারেল খালেদ বললেন, ” ঠিক আছে, তোমরা আমার বিচার করো”

খালেদ দু’হাত দিয়ে তার মুখ ঢাকলেন।

একটি ব্রাস ফায়ার।

মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন সেনাবাহিনীর অফিসার বীর মুক্তিযোদ্ধা জেনারেল খালেদ মোশাররফ । কামরার ভেতরেই গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণত্যাগ করলেন আগরতলা ষড়যন্ত্রমামলার অন্যতম আসামী, মুক্তিযুদ্ধে ৮নং সেক্টরের সাবসেক্টর কমান্ডার কর্নেল নাজমুল হুদা বীর বিক্রম ।

কর্নেল হায়দার ছুটে বেরিয়ে যান কিন্তু সৈনিকদের হাতে বারান্দায় ধরা পড়েন । উত্তেজিত সৈনিকদের হাতে তিনি নির্দয়ভাবে লাঞ্ছিত হন। তাকে সিপাহীরা কিল ঘুষি লাথি মারতে মারতে দোতলা থেকে নিচে নামিয়ে এনে গুলি করে হত্যা করে।” এই কাপুরোষিত হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার আজো হয়নি আজও ।

পাক হানাদাররা যাকে স্পর্শ করতে পারেনি, এমন একজন বীরকে তার দেশেরই কতিপয় সেনার হাতে নিহত হতে হয়। চিরকুমার তুখোড় মুক্তিযোদ্ধা হায়দারকে পিতা কর্তৃক স্থাপিত কিশোরগঞ্জ শোলাকিয়া মসজিদের পাশে সমাহিত করা হয়। বাবার টেলিগ্রাম পেয়ে হায়দার কিশোরগঞ্জ যাওয়ার জন্য ঢাকায় এসেছিলেন। কিশোরগঞ্জে এলেন ঠিকই তবে ঘাতকের নির্মম বুলেটে রক্তাক্ত লাশ হয়ে।কিশোরগঞ্জের গ্রামের বাড়িতে চিরনিদ্রায় শায়িত বাঙালি জাতির এ বীর যোদ্ধা ।

এ.টি.এম. হায়দারের ছোট বোন ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম ও একমাত্র ছোট ভাই এ.টি.এম সফদার (জিতু) মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এ.টি.এম সাফদার ভারতের মেলাঘরে অবস্থিত ট্রেনিং ক্যাম্প থেকে প্রশিক্ষণ নেন এবং শালদানদী এলাকায় বিভিন্নযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি ভারতের আগরতলাস্থ ৯২ বি. এস. এফ. ক্যাম্পের সঙ্গে বিভিন্ন যুদ্ধ বিষয়ক যোগাযোগ ও খবরাখবর (অফিসিয়াল) আদান-প্রদান করতেন। ক্যাপ্টেন সেতারা বেগম বিশ্রামগঞ্জে বাংলাদেশ হাসপাতালে কাজ করতেন। পাঁচশত বেডের এই হাসপাতালে তিনি একজন কমান্ডিং অফিসার হিসাবে নিয়োজিত ছিলেন। হাসপাতালটি সম্পূর্ণভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের দ্বারা পরিচালিত ছিল। তিনি মুক্তিযুদ্ধে বীর প্রতীক খেতাব পান ।

লে. কর্নেল হায়দার বীর উত্তমের বোন ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম বীর প্রতীক বলেন, স্বাধীন দেশের বীর সেনানী ভাই এটিএম হায়দারের অবিশ্বাস্য মৃত্যুই তাঁর জীবনে সবচেয়ে দুঃখময় স্মৃতি।

হায়দারের একমাত্র ছোট ভাই মুক্তিযোদ্ধা এটিএম সাফদার জিতু জানান, মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাঁর ভাই-বোনের অবদান জাতি মর্যাদার সাথে স্মরণ করলে পরিবারের দুঃখ থাকত না । কিন্তু জাতীয় দিবসসহ অন্যান্য দিবসে তাদের সঠিক মূল্যায়ন হচ্ছে না। এটি জাতি হিসেবে আমাদের এক ধরনের সংকীর্ণ মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ । এ থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস থেকে নতুন প্রজম্ম সত্যিকার অর্থেই বঞ্চিত হবে।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস ও ইন্টারনেট।

নিউজটি শেয়ার করুন .. ..

‘‘আমাদের বিক্রমপুর-আমাদের খবর।
আমাদের সাথেই থাকুন-বিক্রমপুর আপনার সাথেই থাকবে!’’

একটি উত্তর দিন

দয়া করে আপনার কমেন্টস লিখুন
দয়া করে আপনার নাম লিখুন