প্রকাশিত: রবিবার, ২৩ নভেম্বর ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ।। ৯ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ (হেমন্ত কাল)।। ৩০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৭ হিজরী।
বিক্রমপুর খবর: শ্রীনগর প্রতিনিধি : বিক্রমপুরের কৃতি সন্তান বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর জন্ম, মৃত্যু, শেষকৃত্য, পিতার প্রথম কর্মস্থল ও ভাই বোনের পরিচিতি ও তাঁর শেষ কর্মস্থল
জগদীশের পিতা ভগবান চন্দ্র বসুর চাকুরী জীবনের প্রথম কর্মস্থল ছিল ময়মনসিংহ, সেখানে ১৮৪৩-৫২ সময়ে ময়মনসিংহ সরকারী ইংরেজি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন, এরপর ১৮৫৩-৫৮ সময়ে সেখানকার জিলা স্কুলে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। জগদীশের মাতা বামা সুন্দরী দেবীসহ ভগবান বসুর পরিবার চাকরীর সুবাদে সেখানকার পর পর দুটি বাড়িতে বসবাস করেছিলেন। ১৮৫৮ সালের ৩০ নভেম্বর সেখানেই জগদীশের জন্ম হয়েছিল। জগদীশরা ৫ বোন ২ ভাই ছিলেন, ছোট ভাই জ্যোতিষ চন্দ্র বসু ১০ বছর বয়সে মারা যান, স্বর্ণপ্রভা, লাবন্যপ্রভা, হেমপ্রভা, সুবর্ণপ্রভা ও চারুপ্রভা নামে ৫ বোন ছিল। বড় বোন স্বর্ণপ্রভার সাথে বিখ্যাত আনন্দমোহন বসুর বিয়ে হয়, আনন্দমোহন বসুর বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা থানার জয়সিদ্ধি গ্রামে। তাঁর বাবা ছিলেন ময়মনসিংহ জজ আদালতের পেশকার পদ্মলোচন বসু। বিখ্যাত আনন্দমোহন কলেজ তাঁর নামেই প্রতিষ্ঠিত হয়। ২য় বোন লাবন্যপ্রভা বসু তৎকালীন সময়ে ময়মনসিংহের কীর্তিমান বিদুষী মহিলা হিসাবে পরিচিত ছিলেন, তিনি ময়মনসিংহের মুকুল পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন, রচনা করেছিলেন বাংলার প্রথম ভারতীয় র্যাংলার,ব্যরিস্টার ও জাতীয় কংগ্রেস নেতা আনন্দমোহন বসুর দুই খণ্ড জীবনী। তিনি ‘শ্রদ্ধায় স্মরণ’ ও ‘মাতা পুত্র’নামে আরো দুটি গ্রন্থ লিখেন। ৩য় বোন হেমপ্রভা বসু এম এ পাশ করার পর বেথুন কলেজে অধ্যাপনা করেন, তিনি পুরুষতন্ত্রকে চরমভাবে অস্বীকার করেন, বাঙ্গালী মহিলাদের মধ্যে প্রথম চারজন এম এ পাশের একজন হয়েও হেমপ্রভা সারাজীবন বিয়ে করেন নি। ৪র্থ বোন সুবর্ণপ্রভা বসুর সাথে বিয়ে হয় আনন্দমোহন বসুর ছোট ভাই ডাক্তার মোহিনী মোহন বসুর সাথে। ডাঃ মোহিনী মোহন প্রথম ভারতীয়দের একজন যিনি ডাক্তারি পড়ার জন্য আমেরিকা গিয়েছিলেন। সুবর্ণপ্রভা বসুর ছেলে দেবেন্দ্রমোহন বসু যিনি “ডি এম বোস” নামে একজন আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী হিসাবে সমধিক পরিচিত ছিলেন। জগদীশের মৃত্যুর পর তিনিই বসু বিজ্ঞান মন্দিরের অধিকর্তা হন। জগদীশের পিতা ডেপুটি ম্যজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ পেলে পরিবারসহ ময়মনসিংহ ছেড়ে ফরিদপুর, বর্ধমান ও অন্যান্য অঞ্চলে চলে যান।
জগদীশ নিঃসন্তান ছিলেন, শেষ সময়ে ভারতের ঝাড়খণ্ডের গিরিডিতে নিরিবিলি গবেষণা কর্মে নিয়োজিত ছিলেন, তাঁর গবেষণার প্রধান দিক ছিল উদ্ভিদ ও তড়িৎ চৌম্বক। তাঁর আবিস্কারের মধ্যে উদ্ভিদের বৃদ্ধিমাপক যন্ত্র ক্রেস্কোগ্রাফ, উদ্ভিদের দেহের উত্তেজনার বেগ নিরুপক সমতল তরুলিপি যন্ত্র রিজোনাস্ট রেকর্ডার অন্যতম। তিনি প্রমান করেছিলেন উদ্ভিদ ও প্রাণীজীবের মধ্যে অনেক সাদৃশ্য রয়েছে। এক কথায় উদ্ভিদজীবন প্রাণীজীবনের ছায়া মাত্র। জগদীশ কাজ করেছিলেন অতি ক্ষুদ্র তথা মাইক্রো বেতারতরঙ্গ নিয়ে যার প্রয়োগ ঘটেছে আধুনিক টেলিভিশন ও রাডার যোগাযোগের ক্ষেত্রে, অপর দিকে মার্কনী আধুনিক ছোট বা শর্ট তরঙ্গ ব্যবহার করে অনেক দূরে বেতার সংকেত পাঠাতে সক্ষম হয়েছিলেন যার ফলশ্রুতি হল রেডিও। জগদীশ চন্দ্র বসু বিহারের গিরিডিতে(বর্তমানে ঝাড়খন্ড) ১৯৩৭ সালের ২৩ নভেম্বর মঙ্গলবার সকাল ৮ টায় হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। পরদিন ২৪ নভেম্বর তাঁর মরদেহ কলকাতার বসু বিজ্ঞান মন্দিরে রাখা হয়, ঐ দিনই কোলকাতা “পার্ক সার্কাস ক্রিমোটোরিয়ামে” তাঁকে দাহ করা হয়। গিরিডিতে তাঁর বাড়িটির নাম দেয়া হয়েছে Vigyan Kendra । গবেষণা চালানোর ব্যয়ভার বহন করছে বিহার কাউন্সিল অব সাইন্স এন্ড টেকনোলজি, এছাড়া জগদীশের নামে সেখানে তাঁদের অর্থায়নে Sir J C Bose Girls High School নামে একটি স্কুল ও পরিচালিত হচ্ছে।
বিক্রমপুরের বাঙালী বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর শিক্ষা, চাকরী, গবেষণা
জগদীশ চন্দ্র বসুর পিতা ভগবান চন্দ্র ময়মনসিংহের জিলা স্কুলে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালনকালীন ( ১৮৫৩-৫৮) ফরিদপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ পেলেন। ইংরেজ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও তিনি ছেলেকে ইংরেজী স্কুলে ভর্তি না করিয়ে বাংলা মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। জগদীশের প্রথম হাতেখড়ি ছিল ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে। ভগবান চন্দ্র বসু ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে ফরিদপুরে বদলী হলে তারই প্রতিষ্ঠিত ফরিদপুর বাংলা স্কুলে পাঁচ বছর বয়সে জগদীশকে ভর্তি করালেন। বাংলা স্কুলে ভর্তি করানোর ব্যাপারে জগদীশ চন্দ্রের নিজস্ব যুক্তি ছিল। তিনি মনে করতেন ইংরেজি শেখার আগে এদেশীয় ছেলেমেয়েদের মাতৃভাষা আয়ত্ব করা উচিত। বাংলা স্কুলে পড়ার ব্যাপারটি জগদীশ চন্দ্রের জীবনে যেমন গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করেছে তেমনি বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করতেও সাহায্য করেছে। এর প্রমাণ বাংলা ভাষায় রচিত জগদীশের বিজ্ঞান প্রবন্ধগুলো। এরপর জগদীশের পিতা বর্ধমানে বদলী হলে প্রথমে ১০ বছর বয়সে জগদীশকে কলকাতার হেয়ার স্কুলে ভর্তি করার তিন মাস পরেই সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে স্থানান্তর করেন। ১৬ বছর বয়সে এ স্কুল থেকে একটি বৃত্তি নিয়ে ১৮৭৫ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। একই কলেজ থেকে তিনি এফএ পাশ করার পর বিএ ক্লাসে ভর্তি হন, ১৮৭৯ সালে বিএ পাশ করার পর অভাব অনটনে ভবিষ্যত লেখাপড়ায় সমস্যা দেখা দেয়, জগদীশ কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে বিএ পাশ করার পর ইংল্যান্ডে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল আইসিএস পরীক্ষায় পাশ করে দেশে এসে জজ-ম্যাজিস্ট্রেট হওয়া। কিন্তু ভগবান চন্দ্র স্বভাবতই এতে রাজী হননি। ছেলে বিদেশে যাক তা তিনি ঠিকই চেয়েছিলেন, তবে আইসিএস দিতে নয়, আধুনিক কৃষিবিদ্যা শিখে দেশীয় কৃষিকাজের উন্নতি সাধনের জন্য।
বাবার ইচ্ছা ও তার আগ্রহের মধ্যে টানাপোড়েনের শেষ পর্যায়ে তিনি ডাক্তারী বা চিকিৎসা বিজ্ঞান পড়বেন বলে স্থির করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞান পাঠের উদ্দেশ্যেই লন্ডনের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান ১৮৮০ সালে। কিন্তু অসুস্থতার কারণে বেশিদিন এই পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারেননি। অচিরেই চিকিৎসাবিজ্ঞান পাঠ ছেড়ে দিয়ে কেমব্রিজের ক্রাইস্ট কলেজে ভর্তি হন। অতপর কেমব্রীজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রাইস্ট চার্চ কলেজে বিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশুনা করে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে সর্বোচ্চ উপাধি ‘ট্রাইপস’ অর্থাৎ একই সাথে রসায়ন,পদার্থ ও উদ্ভিদবিজ্ঞানে একটি বৃত্তিসহ বিএসসি ডিগ্রী লাভ করেন। এর পরপরই বা প্রায় একই সাথে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি পাঠ সম্পন্ন করেন। বিদেশে অধ্যয়ন শেষে দেশে ফিরে আসেন ১৮৮৫ সালে। এসে প্রেসিডেন্সি কলেজে পদার্থবিজ্ঞানের অস্থায়ী অধ্যাপক পদে যোগ দেন। তার গবেষণার সূত্রপাতও এখান থেকেই। তার মহান বৈজ্ঞানিক গবেষণাসমূহের সূতিকাগার হিসেবে এই কলেজকে আখ্যায়িত করা যায়। আমরা যে জগদীশ চন্দ্রের সাথে পরিচিত তার জন্ম এখান থেকেই।
প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপনার চাকুরিটি তিনি পেয়েছিলেন বড়লাট বাহাদুরকে ধরাধরি করে। কিন্তু একে তো এটি ছিল অস্থায়ী তার উপর ভারতীয় হওয়ায় সেখানে তার বেতন নির্ধারণ করা হল ইউরোপীয় অধ্যাপকদের বেতনের অর্ধেক। এই অন্যায় বৈষম্যের প্রতিবাদ করেছিলেন জগদীশ। দীর্ঘকাল তিনি কোন বেতন না নিয়েই শিক্ষকতা করে যান এবং অনেক ইংরেজ অধ্যাপকদের থেকে অধিক দক্ষতা প্রদর্শনে সমর্থ হন। এতে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে নতি স্বীকার করে। তার তিন বছরের বকেয়া মাইনে পরিশোধ করে দেয়া হয় এবং এর সাথে তার চাকুরিটিও স্থায়ী হয়ে যায়। তখন থেকেই ইউরোপীয় ও ভারতীয় অধ্যাপকদের বেতনের বৈষম্য দূরীভূত হয়। ইউরোপীয় শিক্ষকদের অনেকেই মনে করতেন ভারতীয়রা বিজ্ঞান শিক্ষাদান এবং গবেষণা কাজের উপযুক্ত নয়। জগদীশ তাদের এই ধারণা ভুল প্রমাণিত করেন। তার সফলতার প্রমাণ পাওয়া যায় তার হাতে গড়ে উঠা একদল কৃতী শিক্ষার্থী যাদের মধ্যে আছেন: সত্যেন্দ্রনাথ বসু, দেবেন্দ্রমোহন বসু, মেঘনাদ সাহা, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, জ্ঞান মুখোপাধ্যায় প্রমুখ।
স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর গবেষণার প্রধান দিক ছিল উদ্ভিদ ও তড়িৎ চৌম্বক। তার আবিষ্কারের মধ্যে উদ্ভিদের বৃদ্ধিমাপক যন্ত্র ক্রেস্কোগ্রাফ, উদ্ভিদের দেহের উত্তেজনার বেগ নিরুপক সমতল তরুলিপি যন্ত্র রিজোনাষ্ট রেকর্ডার অন্যতম। জগদীশ চন্দ্রের স্ত্রী অবলা বসু ছিলেন একজন বিদূষী ডাক্তার ও শিক্ষাবিদ। জগদীশ চন্দ্র ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বাংলা ভাষায় ছোটদের বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য জগদীশ চন্দ্র ‘অব্যক্ত’ নামে একটা বই লিখেছিলেন। জগদীশ চন্দ্র বসু ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম ব্যক্তি, যিনি আমেরিকান প্যাটেন্টের অধিকারী। ২০০৪ সালের এপ্রিলে বিবিসি রেডিওর জরিপে তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে সপ্তম স্থান অধিকার করেন।
তিনি গাছের প্রাণ এবং মার্কনির আগেই রেডিও আবিষ্কার করেছিলেন বলে বাঙালি মহলে একটি ধারণা প্রচলিত আছে। প্রথম ধারণাটি একেবারেই ভুল। গাছের প্রাণ সম্পর্কে অনেক প্রাচীনকাল থেকেই পণ্ডিতেরা সম্পূর্ণ নিঃসংশয় ছিলেন। জগদীশ চন্দ্র কেবল প্রচুর পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করেছিলেন যে, উদ্ভিদ এ প্রাণী জীবনের মধ্যে অনেক সাদৃশ্য রয়েছে; এক কথায় উদ্ভিদজীবন প্রাণীজীবনের ছায়া মাত্র। দ্বিতীয় ধারণাটিও যে অর্থ বলা হয় সে অর্থে সঠিক নয়। মার্কনি আধুনিক ছোট বা শর্ট তরঙ্গ মাপের বেতার তরঙ্গ ব্যবহার করে দূরে বেতার সংকেত পাঠাতে সফল হয়েছিলেন যার ফলশ্রুতি হল রেডিও। কিন্তু জগদীশ চন্দ্র কাজ করেছিলেন অতিক্ষুদ্র তথা মাইক্রো বেতার তরঙ্গ নিয়ে যার প্রয়োগ ঘটেছে আধুনিক টেলিভিশন এবং রাডার যোগাযোগের ক্ষেত্রে।
প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপনার প্রথম আঠারো মাসে জগদীশ যে সকল গবেষণা কাজ সম্পন্ন করেছিলেন তা লন্ডনের রয়েল সোসাইটির জার্নালে প্রকাশিত হয়। এই গবেষণা পত্রগুলোর সূত্র ধরেই লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় ১৮৯৬ সালের মে মাসে তাকে ডিএসসি ডিগ্রী প্রদান করে। এই গবেষণাগুলো একটু ভিন্ন আঙ্গিকে বিচার করতে হবে। প্রতিদিন নিয়মিত ৪ ঘণ্টা শিক্ষকতার পর যেটুকু সময় পেতেন তখন তিনি এই গবেষণার কাজ করতেন। তার উপর প্রেসিডেন্সি কলেজে কোন উন্নতমানের গবেষণাগার ছিলনা, অর্থ সংকটও ছিল প্রকট। সীমিত ব্যয়ে স্থানীয় মিস্ত্রীদেরকে শিখিয়ে পড়িয়ে তিনি পরীক্ষণের জন্য উপকরণ প্রস্তুত করতেন। তার এই গবেষণা কর্মগুলোর গুরুত্ব বিবেচনা করেই ইংল্যান্ডের লিভারপুলে বক্তৃতা দেয়ার জন্য ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। এই বক্তৃতার সাফল্যের পর তিনি বহু স্থান থেকে বক্তৃতার নিমন্ত্রণ পান। এর মধ্যে ছিল রয়েল ইন্সটিটিউশন, ফ্রান্স এবং জার্মানি। সফল বক্তৃতা শেষে ১৮৯৮ সালের এপ্রিল মাসে তিনি সস্ত্রীক দেশে ফিরে এসেছিলেন।
জগদীশের আঠারো মাসের সেই গবেষণার মধ্যে মুখ্য বিষয় ছিল অতিক্ষুদ্র তরঙ্গ নিয়ে গবেষণা।১৮৯৫ সালে তিনি অতিক্ষুদ্র তরঙ্গ সৃষ্টি এবং কোন তার ছাড়া এক স্থান থেকে অন্য স্থানে তা প্রেরণে সফলতা পান। ১৮৮৭ সালে জার্মান বিজ্ঞনী হার্টজ (Heinrich Rudolf Hertz) প্রতক্ষভাবে বৈদ্যুতিক তরঙ্গের অস্তিত্ব প্রমাণ করেন। এ নিয়ে অধিকতর গবেষণা করার জন্য তিনি চেষ্টা করছিলেন যদিও শেষ করার আগেই তিনি মারা যান। জগদীশচন্দ্র তার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করে সর্বপ্রথম প্রায় ৫ মিলিমিটার দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট তরঙ্গ তৈরি করেন। এ ধরণের তরঙ্গকেই বলা হয়ে অতি ক্ষুদ্র তরঙ্গ বা মাউক্রোওয়েভ। আধুনিক রাডার, টেলিভিশন এবং মহাকাশ যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই তরঙ্গের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মূলত এর মাধ্যমেই বর্তমান বিশ্বের অধিকাংশ তথ্যের আদান প্রদান ঘটে থাকে।
ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশনে তার বক্তৃতার বিষয় ছিল “অন ইলেকট্রিক ওয়েভ্স”। মাত্র ১৮ মাসের মধ্যে করা পরীক্ষণগুলোর উপর ভিত্তি করেই তিনি বক্তৃতা করেন যা ইউরোপীয় বিজ্ঞানীদের চমৎকৃত ও আশ্চর্য্রান্বিত করে। অশীতিপর বৃদ্ধ বিজ্ঞানী লর্ড কেলভিন বক্তৃতা শোনার পর লাঠিতে ভর দিয়ে এসে জগদীশের স্ত্রী অবলা বসুকে তার স্বামীর সফলতার জন্য অভিবাদন জানান। জগদীশ এবং অবলা দু’জনকেই তিনি তার বাসায় নিমন্ত্রণ করেছিলেন। এই বিষয়ের উপর বিখ্যাত সাময়িকী “টাইম্স”-এ একটি রিপোর্ট ছাপা হয় যাতে বলা হয়,”এ বছর ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশনের সম্মিলনে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল বিদ্যুৎ-তরঙ্গ সম্পর্কে অধ্যাপক বসুর বক্তৃতা। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক, কেমব্রিজের এম.এ. এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টর অব সাইন্স এই বিজ্ঞানী বিদ্যুৎরশ্মির সমাবর্তন সম্পর্কে যে মৌলিক গবেষণা করেছেন, তার প্রতি ইউরোপীয় বিজ্ঞানী মহলে আগ্রহ জন্মেছে। রয়্যাল সোসাইটি বিদ্যুৎরশ্মির তরঙ্গদৈর্ঘ্য ও প্রতিসরাঙ্ক নির্ণয়ের গবেষণাপত্রের ভূয়সী প্রশংসা করেছে।” এই বক্তৃতা বিষয়ে পারসন্স ম্যাগাজিন লিখেছিল:
“ বিদেশী আক্রমণে ও অন্তর্দ্বন্দ্বে বহুবছর ধরে ভারতে জ্ঞানের অগ্রগতি ব্যাহত হয়ে চলেছিল। প্রবল বাধা-বিপত্তির মধ্যে গবেষণা চালিয়ে একজন ভারতীয় অধ্যাপক আধুনিক বিজ্ঞানের জগতেও বিশেষ উল্লেখযোগ্য কাজের নজির রেখেছেন। বিদ্যুৎরশ্মি বিষয়ে তার গবেষণাপত্র ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশনে পঠিত হবার সময় তা ইউরোপীয় জ্ঞানী-গুণীমহলে প্রবল আলোড়নের সৃষ্টি করেছে। তাঁর ধৈর্য ও অসাধারণ শক্তির প্রশংসা করতেই হয়- অন্ততঃ যখন ভাবি যে তিনি মাত্র ১৮ মাসের মধ্যে বিদ্যুতের মতো অত্যন্ত দুরূহ বিভাগের ছয়টি উল্লেখযোগ্য গবেষণা শেষ করেছেন। ”
লিভারপুলে বক্তৃতার পর তার আরও সাফল্য আসে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল রয়্যাল ইন্সটিটিউশনে সান্ধ্য বক্তৃতা দেয়ার নিমন্ত্রণ। এই বক্তৃতাটি আনুষ্ঠানিকভাবে “ফ্রাইডে ইভনিং ডিসকোর্স” নামে সুপরিচিত ছিল। এই ডিসকোর্সগুলোতে আমন্ত্রিত হতেন একেবারে প্রথম সারির কোন আবিষ্কারক। সে হিসেবে এটি জগদীশচন্দ্রের জন্য একটি দুর্লভ সম্মাননা ছিল।১৮৯৮ সালের জানুয়ারি ১৯ তারিখে প্রদত্ত তার এই বক্তৃতার বিষয় ছিল “অন দ্য পোলারাইজেশন অফ ইলেকট্রিক রেইস” তথা বিদ্যুৎরশ্মির সমাবর্তন। এই বক্তৃতার সফলতা ছিল সবচেয়ে বেশি। বায়ুতে উপস্থিত বেশ কিছু বিরল গ্যাসের আবিষ্কারক হিসেবে খ্যাত বিজ্ঞানী লর্ড বেইলে তার বক্তৃতা শুনে এবং পরীক্ষাগুলো দেখে এতোটাই বিস্মিত হয়েছিলেন তার কাছে সবকিছু অলৌকিক মনে হয়েছিল। তিনি এ সম্পর্কে বলেছিলেন, “এমন নির্ভুল পরীক্ষা এর আগে কখনও দেখিনি- এ যেন মায়াজাল”। এই বক্তৃতার সূত্র ধরেই বিজ্ঞানী জেমস ডিউয়ার-এর সাথে জগদীশচন্দ্রের বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয়। ডিউয়ার গ্যাসের তরলীকরণের পদ্ধতি উদ্ভাবনের জন্য বিখ্যাত। এই বক্তৃতা সম্বন্ধে “স্পেক্টেটর” পত্রিকায় লিখা হয়েছিল, “একজন খাঁটি বাঙালি লন্ডনে সমাগত, চমৎকৃত ইউরোপীয় বিজ্ঞানীমণ্ডলীর সামনে দাঁড়িয়ে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অত্যন্ত দুরূহ বিষয়ে বক্তৃতা দিচ্ছেন- এ দৃশ্য অভিনব।”
এই বক্তৃতার পর ফ্রান্স এবং জার্মানি থেকে আমন্ত্রণ আসে এবং তিনি সেখানে কয়েকটি বক্তৃতা দেন। সবখানেই বিশেষ প্রশংসিত হন। বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও অধ্যাপক কর্ন তার বন্ধু হয়ে যায় এবং তিনি ফ্রান্সের বিখ্যাত বিজ্ঞান সমিতি Societe de Physeque-এর সদস্য মনোনীত হন।
বিজ্ঞান শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে জগদীশ চন্দ্রের সফলতার কথা কর্মজীবন অংশেই উল্লেখিত হয়েছে। এছাড়া তিনি বিজ্ঞান গবেষণায়ও প্রভূত সাফল্য অর্জন করেছিলেন যার জন্য তার সুখ্যাতি তখনই ছড়িয়ে পড়েছিল। বাঙালিরাও বিজ্ঞান গবেষণার ক্ষেত্রে নিউটন-আইনস্টাইনের চেয়ে কম যায়না তিনি তা প্রমাণ করেন। জগদীশ চন্দ্র যে গ্যালিলিও-নিউটনের সমকক্ষ বিজ্ঞানী তার স্বীকৃতি দিয়েছিল লন্ডনের ডেইলি এক্সপ্রেস পত্রিকা, ১৯২৭সালে। আর আইনস্টাইন তার সম্পর্কে নিজেই বলেছেন:
“ জগদীশচন্দ্র যেসব অমূল্য তথ্য পৃথিবীকে উপহার দিয়েছেন তার যে কোনটির জন্য বিজয়স্তম্ভ স্থাপন করা উচিত। ”
১৯১৫ সালে বিক্রমপুরে কনফারেন্সে বসু তাঁর বক্তৃতায় বলেছিলেন,
“আমাদের সময়ে সন্তানদের ইংরেজী স্কুলে ভর্তি করানো ছিলো আভিজাত্যের প্রতীক। যে স্বদেশী স্কুলে আমাকে ভর্তি করে দেয়া হয়েছিলো, সেই স্কুলে আমার ডানপাশে বসতো আমার পিতার মুসলিম পরিচারকের ছেলে এবং আমার বামপাশে বসতো একজন জেলের ছেলে। তারাই ছিলো আমার খেলার সাথী। আমি সম্মোহিতের মতো শুনতাম তাদের বলে যাওয়া পশুপাখির গল্প, জলজ প্রাণীদের গল্প। হয়তো এই গল্পগুলোই আমাকে প্রকৃতির কর্মকাণ্ড নিয়ে গবেষণা করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলো। যখন আমরা ক্লাস শেষে বাড়ি ফিরে আসতাম, আমার মা আমাদের একসাথেই খাবার খেতে দিতেন। আমার মা স্বধর্মপরায়ণ এবং প্রথাসম্মত গৃহিণী ছিলেন। কিন্তু ধর্ম নিয়ে গোঁড়ামি করা তার স্বভাব ছিলো না। তাই তিনি তাঁর ছেলের সঙ্গী অস্পৃশ্য বালকদের প্রতি ছিলেন যথেষ্ট মমতাশীল।”
অবলা দাস- জগদীশ চন্দ্র বসুর সহধর্মিণী
১৮৮৭ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি জগদীশ চন্দ্র বসুর সাথে অবলা দাসের বিয়ে হয়। তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম সমাজের বিখ্যাত সংস্কারক দুর্গামোহন দাসের কন্যা, বিক্রমপুরের আরেক কৃতিসন্তান বিখ্যাত দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস( সি আর দাস) অবলার পিতা দুর্গা মোহন দাসের ভ্রাতুস্পুত্র, মায়ের নাম ছিল ব্রম্মময়ী দেবী। তাঁদের বাড়ি ছিল টংগীবাড়ি উপজেলার তেলিরবাগ গ্রামে, যা পদ্মার ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। জগদীশের পিতা ভগবান চন্দ্র বসু ঋণভারে জর্জরিত হয়ে পড়লে তিনি রাড়িখালের সমুদয় সম্পত্তি তাঁর এক চাচাত ভাই সতিশ বোসের নিকট ১৮৮৬ সালে বিক্রি করেন। ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত সতিশ বোসের উত্তরাধিকারি ছেলে হেমচন্দ্র বসু ও নাতি সমর বসুকে আমরা দেখেছি। অবলা দাস (পরবর্তীতে অবলা বসু) কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হতে চেয়েছিলেন কিন্তু সেখানে মেয়েদের পড়ার সুযোগ ছিল না, এরপর তিনি বঙ্গ সরকারের বৃত্তি নিয়ে পড়াশুনার জন্য মাদ্রাজ চলে যান সেখানে চিকিৎসা বিজ্ঞানে অধ্যায়ন শুরু করলেও অসুস্থতার কারণে ফিরে আসতে বাধ্য হন। তিনি সে সময় ছোটদের মুকুল পত্রিকায় তাঁর ভ্রমন কাহিনি নিয়মিতভাবে লিখতেন। তাঁদের বিয়ের সময় জগদীশ আবারো আর্থিক সংকটে পড়ে যান, তিনি কলেজ থেকে বেতন নিতেন না। অনেক কষ্টে দুজনে আর্থিক সংকট মোকাবেলা ও পিতাকে সম্পূর্ণ ঋণ ভার হতে মুক্ত করতে পারলেও অল্প কিছু দিনের ব্যবধানে বসুর পিতা মাতার জীবনাবসান ঘটে। বিয়ের কিছু দিনের মাথায় অবলা বসুর গর্ভে সন্তান এলেও আতুর ঘরেই সে সন্তানের মৃত্যু হয়। এরপর তাঁদের ঘরে আর কোন সন্তানাদি হয় নি। অবলা বসু জন্মেছিলেন ১৮৬৫ সালের ৮ আগস্ট এবং মৃত্যু হয়েছে ১৯৫১ সালের ২৫ এপ্রিল। কলকাতার প্রকাশনী সংস্থা পরশপাথর হতে সম্প্রতি ‘অবলা বসুর ভ্রমন কাহিনী’ নামে একটি বই প্রকাশিত হয়েছে।
সাহিত্য ও শিল্পকর্মে বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুঃ
বিজ্ঞানের পাশাপাশি সাহিত্যেও বিভিন্ন শিল্পকর্মে ছিলো জগদীশচন্দ্রের অবাধ বিচরণ। তার প্রকাশিত ‘অব্যক্ত’ গ্রন্থটি এই প্রতিভার স্বাক্ষর বহন করে। ‘ভাগীরথীর উৎস সন্ধানে’ তার একটি অনবদ্য রচনা। ভাগীরথী গঙ্গা নদীর একটি ধারা। গঙ্গা নদী হিমালয় পর্বতশ্রেণীর নন্দদেবী গিরিশৃঙ্গের হিমশৈলে উৎপন্ন হয়ে দীর্ঘ পথ পরিক্রম করে ভাগীরথী ধারা বেয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়েছে। জগদীশচন্দ্র নদীর উৎপত্তি, তার গতিপথ, সাগরে পতন এবং তারপরেও জলের নৈমিত্তিক কাজ অতীব সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন। ভূগোল ও বিজ্ঞানের মতো জটিল বিষয়কে তিনি তার রচনায় সুসংহত করেছেন, ছন্দবদ্ধ করেছেন। তার সাবলীল লেখা নদীর স্রোতের মতই গতিময়। এই গতিময়তায় অবগাহন করলে সমুদ্র স্নানের স্বাদ মেলে।
এই লেখাটি ১৮৯৫ সালে দাসী পত্রিকার এপ্রিল সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ভাগীরথীর উৎস সন্ধান পাঠে প্রীত হন এবং জগদীশচন্দ্রকে সাহিত্য চর্চায় উৎসাহিত করেন। জগদীশচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথ উভয়ের বন্ধুত্ব ছিলো অতীব গভীর। তারা দুজনেই জীবদ্দশায় স্ব স্ব ক্ষেত্রে বিশ্বস্বীকৃতি লাভ করেন।
অব্যক্ত বইটি সম্পর্কে সাধারণ তথ্য,
বই: অব্যক্ত, লেখক: শ্রীজগদীশচন্দ্র বসু, প্রথম প্রকাশক: বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ, প্রকাশকাল: ১৩২৮সন/১৯২১ সাল। পরবর্তীকালে বইটি প্রকাশ করেন বসুবিজ্ঞান মন্দির, ৯৩/১ আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রোড, কলিকাতা-৭০০০০৯. বইটির প্রচ্ছদের সর্ব উপরে লেখা, আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, তার নীচে জগদীশচন্দ্রের ছবি। তা ছাড়া রয়েছে বসুবিজ্ঞান মন্দিরের দুটি চিহ্ন, প্রথমটি বজ্র চিহ্ন আর দ্বিতীয়টি আমলকা চিহ্ন।
জগদীশচন্দ্রের এই গ্রন্থে বিজ্ঞান, সাহিত্য, কল্পবিজ্ঞান, বক্তৃতা ইত্যাদি নিয়ে মোট নিবন্ধের সংখ্যা ২১। এর ভেতর বিজ্ঞান বিষয়ক রচনা-সাত, বক্তৃতা-সাত, সাহিত্য-ছয় ও কল্পবিজ্ঞান-এক। প্রথম নিবন্ধের নাম, ’যুক্তকর’, রচনাকাল ১৮৯৪ সাল। ১৮৯৫ সালে যে বছর তিনি ’ক্ষুদ্র তরঙ্গের সাহায্যে সংকেত প্রেরণের সম্ভাবনা’ শীর্ষক পরীক্ষাটি কলকাতা টাউন হলে প্রদর্শন করেন, সে বছর লেখাটি প্রকাশিত হয়।
জগদীশচন্দ্রের প্রথম মুদ্রিত বই হচ্ছে ১৯০২ সালে প্রকাশিত `Response in the Living and Non-living.’’ প্রায় একই সময়ে উদ্ভিদ বিষয়ক তার গবেষণাপত্রটি ‘On the Electric Pulsation Accompanying Automatic Movement in Desmodium Gyrans’ বিলাতের Linn. Society কর্তৃক প্রকাশিত হয়। তার আর একটি গবেষণা গ্রন্থ ‘Plant Response as a means of Psychological Investigation’’ ১৯০৬ সালে প্রকাশিত হয়।
১৯০৭ সালে প্রকাশিত হয় ‘Comparative Electro-psychology’ ১৯২৩ সালে Physiology of the Ascent of Sap, ১৯২৪ সালে Physiology of Photosynthesis, ১৯২৬ সালে প্রকাশিত হয় Nervous Mechanism in Plants এই বইটি তিনি উৎসর্গ করেন রবীন্দ্রনাথকে।
উৎসর্গপত্রে তিনি লেখেন, ‘To my life long friend Rabindranath Tagore. ১৯২৭ সালে প্রকাশিত হয় Collected Physical Papers, ১৯২৮ সালে Motor Mechanism of Plants এবং ১৯২৯ সালে Growth and Tropic Movement in Plants. বিলাতের বিখ্যাত Nature পত্রিকায় তার ২৭টি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়।
উপরের বইগুলোর মধ্যে “On the Electric Pulsation Accompanying Automatic Movement in Desmodium Gyrans” বাদে অবশিষ্ট বইগুলো প্রকাশ করেছেন Longmans, Green & Co. London তাঁর Plant Autographs and Their Revelations বইটি The Macmillan Company, New York প্রকাশ করেন।
তিনি Photograpy নিয়ে গবেষণা করেন। বিলাতের জড়ুধষ Royal Photographic Society কর্তৃক আহুত হয়ে তিনি On a new theory of Photographic action বিষয়ে বর্ক্তৃতা করেন। উপস্থিত সবাই তাঁর নতুন তত্ত্বে বিস্মিত ও পুলকিত হন। আনন্দিত আবেগাপ্লুত জগদীশচন্দ্র এই প্রসঙ্গে ১৯০২ সালের ২৭ জুন তারিখের এক পত্রে লন্ডন হতে রবীন্দ্রনাথকে যা লেখেন তা বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। ‘.. … আমি সম্প্রতি বিনা আলোকে ছবি তুলিতে সমর্থ হইয়াছি। বন্ধু আমি এইসব নূতন নূতন তত্ত্বের সন্ধান পাইয়া বিহ্বল হইয়াছি। ইহার অন্ত কোথায়? মানুষের মন যে আর ধারণা করিতে পারে না।
উল্লেখ্য যে, অব্যক্ত হচ্ছে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত তার একমাত্র গ্রন্থ। তার অধিকাংশ লেখা পুস্তকাকারে প্রকাশিত হবার আগে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় ছাপা হয়। উল্লেখযোগ্য পত্রিকাগুলো হচ্ছে, সুরেশচন্দ্র সমাজপতি প্রতিষ্ঠিত ‘সাহিত্য’ পত্রিকা (এতে প্রকাশিত হয়, আকাশ স্পন্দন ও আকাশ-সম্ভব জগৎ), শিবনাথ শাস্ত্রী সম্পাদিত শিশুপত্রিকা ‘মুকুল’ (গাছের কথা, উদ্ভিদের জন্ম ও মৃত্যু, মন্ত্রের সাধন), মোজাম্মেল হক সম্পাদিত ‘মোসলেম ভারত’ (অদৃশ্য আলোক), রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত মাসিক পত্রিকা ‘দাসী’ (পলাতক তুফান, অগ্নিপরীক্ষা, ভাগীরথীর উৎস-সন্ধানে), রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘প্রবাসী’ (বিজ্ঞানে সাহিত্য, বোধন, আহত উদ্ভিদ, হাজির), ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ পত্রিকা’ (নবীন ও প্রবীন), দ্বিজেন্দ্রলাল রায় সম্পাদিত ’সচিত্র ভারতবর্ষ’ (রানী সন্দর্শন), ’নারায়ণ’, ’প্রবাসী’, ও ’সাহিত্য পত্রিকা’ (নিবেদন) ইত্যাদি।
অব্যক্ত গ্রন্থের শেষ রচনা ‘হাজির’। রচনাটি তার শেষ বয়সের লেখা (মৃত্যু ২৩ নভেম্বর, ১৯৩৭)। এ রচনায় তার আত্ম-উপলদ্ধি ও জীবনদর্শনের পরিপূর্ণ প্রকাশ ঘটেছে। তার সাহিত্য কর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ তাকে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ এর সভাপতি নির্বাচিত করা হয়।
‘পলাতক তুফান’ গল্পটি রচিত হয় যখন তার বয়স ৩৮ (জন্ম ৩০ নভেম্বর, ১৮৫৮)। বিশেষ বিচারে গল্পটি সে সময়ে বিখ্যাত ছিলো, আজও বিশেষ।
এ গল্পের দুটি অংশ। প্রথম পরিচ্ছেদে ২৭ সেপ্টেম্বর তারিখে সিমলা হাওয়া অফিসের পূর্বাভাস: ‘বঙ্গোপসাগরে শীঘ্রই ঝড় হইবার সম্ভাবনা’। তারপর ২৮, ২৯, ৩০ সেপ্টেম্বর ও ১ অক্টোবর তারিখে পর পর ধারাবাহিক পূর্বাভাস। শেষ পূর্বাভাসটি আসে ২ অক্টোবর তারিখে। তাতে ঘোষণা করা হয়, ‘কলিকাতায় ঝড় হইবার কথা ছিল, বোধ হয় উপসাগরের কূলে প্রতিহত হইয়া ঝড় অন্য অভিমুখে চলিয়া গিয়াছে। ঝড় কোন দিকে গিয়াছে তাহার অনুসন্ধানের জন্য দিক্-দিগন্তরে লোক প্রেরিত হইল, কিন্তু তাহার কোন সন্ধান পাওয়া গেল না।’
এরূপ ভৌতিক কাণ্ডে বিজ্ঞান জগতে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। বিলাতের বিখ্যাত পত্রিকা Nature ফরাসি দেশের La Nature, মার্কিন পত্রিকা Scientific American অনেক লেখালেখি করেন। কিন্তু রহস্যের কোনো মীমাংসা হয়না। দেশীয় ইংরেজি পত্রিকা Englishman লিখলেন, এতদিনে বুঝা গেলো বিজ্ঞান সর্বৈব মিথ্যা। Daily News, Pioneer, Civil and Military Gazette, Statesman এর মতো বিখ্যাত সব পত্রিকা সিমলা হাওয়া অফিস বন্ধ করে দেবার জন্য তারস্বরে চিৎকার শুরু করে দেন। গণ আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। সরকার বিপদের আশঙ্কা করেন। কারণ সম্প্রতি এক লাখ টাকা ব্যয়ে সিমলা হাওয়া অফিস স্থাপন করা হয়েছে, যন্ত্রপাতি সব নতুন। অফিস বন্ধ করে দিলে যন্ত্রপাতির কি হবে, কে কিনবে কি কাজে লাগবে, অফিসের বড় সাহেবের কি গতি হবে ইত্যাদি। নিরুপায় সরকার বায়ুর চাপ হ্রাস-বৃদ্ধিতে জনস্বাস্থ্যের উপর এর কি প্রভাব পড়ে তা জানার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন। কারণ ৩০ সেপ্টেম্বর এক পূর্বাভাসে বলা হয়েছিল যে, ‘আধ ঘন্টার মধ্যে Barometer দুই ইঞ্চি নামিয়া গিয়াছে। আগামীকল্য ১০ ঘটিকার মধ্যে কলিকাতায় অতি প্রচণ্ড ঝড় হইবে, এরূপ তুফান বহু বৎসরের মধ্যে হয় নাই।’ এ কাজের দায়িত্বভার অধ্যক্ষ Medical College এর উপর অর্পণ করা হয়। এই বিষয়ে অধ্যক্ষ যা লেখেন তা সবিশেষ প্রণিধানযোগ্য।
‘‘.. কলিকাতাবাসীরা আপাতত বহুবিধ চাপের নীচে আছে:
১ম চাপ বায়ু প্রতি বর্গইঞ্চে ১৫ পাউন্ড
২ চাপ ম্যালেরিয়া প্রতি বর্গইঞ্চে ২০ পাউন্ড
৩য় চাপ পেটেন্ট ঔষধ প্রতি বর্গইঞ্চে ৩০ পাউন্ড
৪র্থ চাপ ইউনিভার্সিটি প্রতি বর্গইঞ্চে ৫০ পাউন্ড
৫ম চাপ ইনকাম ট্যাক্স প্রতি বর্গইঞ্চে ৮০ পাউন্ড
৬ষ্ঠ চাপ মিউনিসিপ্যাল ট্যাক্স প্রতি বর্গইঞ্চে ১ টন”
তাই এত চাপের মধ্যে বায়ুর চাপ দু এক ইঞ্চি বাড়লেই বা কি, কমলেই বা কি।
বিখ্যাত এক জার্মান বিজ্ঞানী পলাতক তুফান নিয়ে অতি পাণ্ডিত্যপূর্ণ এক রচনা লিখে বিশ্ব বিজ্ঞান সমাজে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। দেশে দেশে তা নিয়ে আলোচনা চলতে থাকে। সে সব আলোচনায় বায়ুমণ্ডলের সৃষ্টি, মাধ্যাকর্ষণ শক্তি, আপেক্ষিক গুরুত্ব, অম্লজান-দ্ব্যম্লজান-উদ্জানের উৎপত্তি,আলফা-বিটা-গামা রে, থিওসোফিক্যাল সোসাইটি, ভূত, ভারতের পুরুষজাতি-নারীজাতি ইত্যাদি বহুবিধ বিষয় নিয়ে জ্ঞানগর্ভ সব আলোচনা হয়; কিন্তু তুফান কেন পালিয়ে গেলো সে রহস্যের কোনো মীমাংসা হলোনা। এ ঘটনার প্রায় ছয় মাস পরে ‘সায়েন্টিফিক আমেরিকান’ একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন তাতে রহস্যের কারণ জানা যায় নি
তবে সমুদ্রে নিক্ষিপ্ত তৈল রহস্যসহ সব রহস্যের কারণ জানেন মাত্র একজন, তিনি স্বয়ং জগদীশচন্দ্র।
জগদীশচন্দ্র গল্পটি প্রথমে লেখেন ‘নিরুদ্দেশের কাহিনী’ নামে। পরে অব্যক্ত গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করার সময় শিরোনাম করা হয় ‘পলাতক তুফান বৈজ্ঞানিক রহস্য।’ ‘পলাতক তুফান বৈজ্ঞানিক রহস্য’ বাংলা সাহিত্যে প্রথম কল্পবিজ্ঞান। বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু হচ্ছেন বাংলা সাহিত্যে কল্পবিজ্ঞানের জনক।
পলাতক তুফান বৈজ্ঞানিক রহস্য গল্পটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন বোধিসত্ত্ব চট্টোপাধ্যায়।
আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর ‘পলাতক তুফান’ গল্পটির রূপ-রস-ভাষা ও কাহিনী মূল্যায়ন করে ‘বিজ্ঞান সাহিত্যিক জগদীশ চন্দ্র’ প্রবন্ধে সুজিতকুমার নাহা যথার্থই মন্তব্য করে বলেছিলেন, ‘তার পলাতক তুফান’ গল্পটিই বাংলায় রচিত প্রথম কল্পবিজ্ঞান কাহিনী। বিজ্ঞান সুবাসিত এই গল্পটি একটি রসোত্তীর্ণ রচনা, বাংলা ভাষার এক অমূল্য সম্পদ। তথ্য সুত্র- লেখক জ্যোতির্ময় বসু, সাবেক উপ পরিচালক বাপাউবেক, জগদীশ্চন্দ্র বসু রচনাসংগ্রহ দে’জ পাবলিশিং কলকাতা।
জগদীশ চন্দ্র বসুর বাংলায় লেখা একমাত্র বই অব্যক্ত
তাঁর লিখিত এ বইটি ভারতীয় বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ হতে ৯৫ বছর আগে ১৩২৮ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাসে প্রকাশিত হয়। বইটির তৃতীয় মুদ্রণের মুল্য ছিল তিন টাকা। বিভিন্ন প্রবন্ধের সংকলন যেমন ইতিপূর্বে মুকুল, দাসী, প্রবাসী এবং ভারতবর্ষে বঙ্গীয় লেখকের সাহিত্য সন্মিলনির ময়মনসিংহ অধিবেশনে সভাপতির অভিভাষণ, বোধন অংশে বিক্রমপুর সন্মিলনে সভাপতির ভাষণসহ এখানে সমসাময়িক কালে দেশের স্বাস্থ্য, সেবাশিল্প ও শিক্ষা নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। ১৯১৭ সালে জগদীশ তাঁর স্বপ্নের বসু বিজ্ঞান মন্দির নির্মাণে হাত দেন। এটির পরিচালনার অর্থ সংগ্রহের জন্য ১৯১৮ সালের প্রথম থেকেই ধারাবাহিক বক্তৃতা দিতে শুরু করেন ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরিক্ষার বিষয়গুলো প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেন। তাঁর বক্তৃতা শুনার জন্য টিকেটের দাম ধরা হত ২ টাকা ও ১ টাকা। পৈত্রিক বাড়ি বিক্রি করার জন্য তিনি পিতার উপর অনেকটা ক্ষুব্ধ ছিলেন, ধারনা করা হয় এ সময়কালে গোয়ালন্দ ভাগ্যকূল হয়ে ঢাকা যাবার পথে রাড়িখালে তাঁর পিতৃপুরুষের বাড়িতে ব্যথিত মন নিয়ে ক্ষণিক সময়ের জন্য এসেছিলেন। বাড়ির একটি উঁচু তাল গাছে তিনি একটি কাটা চিহ্ন দিয়েছিলেন, যা অনেকদিন মানুষের মূখে প্রচলিত ছিল। আমরাও সে গাছটির কাটা চিহ্নিত অংশটুকু দেখেছি। ১৯৯৮ সালের ঝড়ে গাছটি পড়ে গেলে এর খন্ডিত অংশ জগদীশ যাদুঘরে সংরক্ষিত রাখা হয়েছে।
বসু বিজ্ঞান মন্দির প্রতিষ্ঠার কথা
সময়টা ১৮৯৬-৯৭, জায়গাটা লন্ডন। এখানে এসেছেন আধুনিক ভারতের বিজ্ঞানচর্চার জনক অধ্যাপক জগদীশচন্দ্র বসু, সঙ্গে রয়েছেন তাঁর মহীয়সী স্ত্রী লেডি অবলা বসু। অধ্যাপক বসু লন্ডনে এসেছেন তাঁর আবিষ্কৃত তড়িৎ-তরঙ্গের স্বরূপ।
সম্পাদনা: আব্দুর রশিদ খান
নিউজটি শেয়ার করুন .. ..
‘‘আমাদের বিক্রমপুর– আমাদের খবর।
আমাদের সাথেই থাকুন– বিক্রমপুর আপনার সাথেই থাকবে!’’
Login করুন : https://www.bikrampurkhobor.com
আমাদের পেইজ এ লাইক দিন শেয়ার করুন।
জাস্ট এখানে ক্লিক করুন। https://www.facebook.com/BikrampurKhobor
email – bikrampurkhobor@gmail.com
















































