প্রকাশিত: সোমবার, ২৩ জুন, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ।। ৯ই আষাঢ় ১৪৩২ বঙ্গাব্দ (বর্ষাকাল)।। ২৬ জিলহজ, ১৪৪৬ হিজরী।
বিক্রমপুর খবর : নিউজ ডেস্ক : মানকুমার বসু ঠাকুর ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন অন্যতম ব্যক্তিত্ব ও ভারতীয় নৌবিদ্রোহের শহীদ।
মানকুমার বসু জন্ম ১৯২০ সালের ২৮ আগস্ট। তার পিতা ভূপতিমোহন এবং মাতা হেমপ্রভা।
তার আদি নিবাস ঢাকার বিক্রমপুরের মালখানগর-এ।
মানকুমার বসু ঠাকুর ঢাকার সেন্ট গ্রেগরি হাইস্কুলে পড়তেন। সেখান থেকে তিনি ১৯৩৭ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পাশ করেন। তারপর তিনি পড়ার জন্য ঢাকা জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হন। জগন্নাথ কলেজে পড়ার সময় রাজনীতির সংস্পর্শে আসেন তিনি।
পরিবারের অমতে কলেজ ছেড়ে ব্রিটিশ নৌ-বাহিনীতে যোগ দেন মানকুমার বসু। তিনি ভারতীয় উপকূল রক্ষা বাহিনীর ১৩ টি বিভাগীয় পরীক্ষায় প্রথম স্থানাধিকার করেছিলেন। ১৯৪২ সালে যখন ভারত ছাড়ো আন্দোলন ও অন্য দিকে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর “দিল্লী চলো” আহবানে সৈন্যশিবিরে দেশীয় সিপাইদের মধ্যে বিপুল উত্তেজনা দেখা দেয়।
তখন মানকুমার বসু আজাদ হিন্দ বাহিনীর গোপন বিভাগের সাথে যোগাযোগ করেন। তারপর তিনি দেশী সিপাইদের মধ্যে বিদ্রোহের চেতনা জাগিয়ে তোলেন। তারই নেতৃত্বে গোলন্দাজ বাহিনীর সৈন্যরা সঞ্চিত গোলাবারুদ গোপনে সমুদ্রে ফেলে দিতে থাকে। ইংরেজ ও দেশী সৈন্যদের মধ্যে পক্ষপাতিত্ব ও আনুষঙ্গিক নানা অব্যবস্থার প্রতি অসন্তোষ ধ্বনিত হয়। চতুর্থ মাদ্রাজ উপকূল বাহিনীর মধ্যে বিদ্রোহের বীজ আছে এই অভিযোগে ১৮ই এপ্রিল ১৯৪৩ সালে সামরিক পুলিশ মানকুমার সহ বারো জনকে গ্রেপ্তার করে।
শুরু হলো বিচারের পালা..
=======
মানকুমার বসু সহ ১২ সিপাহীর শুরু হলো বিচার, যুদ্ধে বাধাসৃষ্টি, সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে প্ররোচনা ও বিদ্রোহের অপরাধে ৫ই আগস্ট ১৯৪৩ সালে মানকুমার বসুঠাকুর এর মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হয়। তার সঙ্গে আরো ৮ জনের ফাঁসির সাজা দেওয়া হয়। বাকি তিনজনের মধ্যে আবদুল রহমান ও রবীন্দনাথ ঘোষের দ্বীপান্তর এবং অনিলকুমার দে’র সাত বছর কারাদন্ড হয়েছিল।
এসে গেল সেই প্রহর যখন ৯ জন স্বাধীনতা সংগ্রামীকে ফাঁসির মঞ্চে হাসতে হাসতে শহীদ হতে হবে। দিনটি ছিল ২৭শে সেপ্টেম্বর ১৯৪৩ সাল মানকুমার বসু ও বাকি ৮ জন সঙ্গী “বন্দেমাতরম” স্লোগান দিতে দিতে ফাঁসির মঞ্চে উঠে গেলেন। একসাথে ৯ জন স্বাধীনতা সংগ্রামী দেশের জন্য মাদ্রাজের দূর্গে ফাঁসিতে নিজেদের আত্মবিসর্জন দেন..।
১৯৩৪ এবং ১৯৪৩ সাল দু’টি বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে সব থেকে দুর্ভাগ্যজনক বছর।
দশ জন করে বিপ্লবী ফাঁসির দড়ি গলায় পরেছেন এই বছর দু’টিতে। এর মধ্যে ১৯৪৩ সালের ইতিহাস এক কথায় নৃশংস, নারকীয়। এই বছরে যে দশ জনের ফাঁসি হয়েছিল তার মধ্যে নয় জনকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল একই দিনে, একই জেলে! নয় বাঙালি তরুণই পেশায় ছিলেন চতুর্থ মাদ্রাজ উপকূল রক্ষী বাহিনীর সেনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে থেকে তাঁরা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিলেন সে দিন। ধরা পড়ে গেলেন। শুরু হল বিচারের নামে প্রহসন।
নয় জনের অন্যতম দুর্গাদাস রায়চৌধুরী মৃত্যুর কয়েক দিন আগে জেলখানায় বসে লিখেছিলেন একটি ‘খোলা চিঠি’: “আমাদের কেন ফাঁসি হইতেছে তাহা জানিবার জন্য আপনারা আগ্রহান্বিত। ব্রিটিশ সম্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করাই ইহার কারণ।… আমরা বাঙালি সৈনিক। দেশের স্বাধীনতার আহ্বানে আমাদের নয়টি জীবনদীপ নির্বাপিত হইতে চলিয়াছে।”
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে একই দিনে এক সঙ্গে নয় জনের ফাঁসির ঘটনা আর কখনওই ঘটেনি। দুর্গাদাস ছাড়া বাকি যে আট জনের ফাঁসি হয়েছিল তাঁরা হলেন কালীপদ আইচ, চিত্তরঞ্জন মুখোপাধ্যায়, নন্দকুমার দে, নিরঞ্জন বড়ুয়া, নীরেন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়, মানকুমার বসু ঠাকুর, সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায় এবং ফণিভূষণ চক্রবর্তী।
এদের মধ্যে মানকুমার ছিলেন প্রখ্যাত রসায়নবিদ প্রতুলচন্দ্র রক্ষিতের শ্যালক। ফাঁসির পাঁচ দিন আগে, ১৯৪৩-এর ২২ শে সেপ্টেম্বর, মানকুমার জামাইবাবুকে লিখেছেন: “আমার চলে যাওয়ার সেই চরম মুহূর্ত এসেছে। আমি আপনার কাছে আমার বন্ধনমুক্ত আত্মার জন্য শুধু আশীর্বাদ চাইবো।… আমার আত্মার শান্তির জন্য আমি আপনাদের সকলের প্রার্থনা কামনা করছি।”
২৭ শে সেপ্টেম্বর ১৯৪৩ ভোরবেলায় এদের গলায় ফাঁসির দড়ি পরিয়ে দিয়েছিলেন ফাঁসুড়ে শিবু ডোম। পুরো নাম শিবলাল। তাঁর স্মৃতিচারণ: “সেদিন তেনারা খুব গান গাইছিলেন সবাই মিলে। যখন শেষ সময় এসে গেল, জোর গলায় বলতে লাগলেন জয় হিন্দ-জয় হিন্দ-জয় হিন্দ।” এই শিবলালই নয় বছর আগে, ১৯৩৪-এর ১২ জানুয়ারি, চট্টগ্রাম জেলে ফাঁসির দড়ি পরিয়ে দিয়েছিলেন মাস্টারদা সূর্য সেন এবং তারকেশ্বর দস্তিদারের গলায়।
আমরা অনেকেই বিক্রমপুরের গর্বিত সন্তানের কথা জানি না। নিরবে নিভৃতে ইতিহাসের পাতায় রয়ে গেছে নাম। বিক্রমপুরের আলোকিত মানুষ ব্রিটিশ বিরোধী নৌবিদ্রোহের শহীদ মানকুমার বসু ঠাকুর এর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।
তথ্য সূত্রঃ গুগলের সহায়তা সম্পাদিত।
নাছির উদ্দিন আহমেদ জুয়েল
কিউরেটর,
বিক্রমপুর জাদুঘর
এবং
সম্পাদক ও প্রকাশক
বিক্রমপুর খবর ডটকম
তারিখ: ২২ জুন ২০২৫

See insights and ads
পোস্টের প্রচার করুন · Boost post
All reactions:
1
















































