প্রকাশিত: রবিবার, ১৫ জুন, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ।। ১ আষাঢ় ১৪৩২ বঙ্গাব্দ (বর্ষাকাল)।। ১৮ই জিলহজ, ১৪৪৬ হিজরী।
বিক্রমপুর খবর : লৌহজং প্রতিনিধি :
“” শতবর্ষের মৃত্যুদণ্ড “”
লেখক: সুলতান আহমেদ
১৩ অক্টোবর ২০০৪ সাল। স্থানীয় সময় ৭:৪০ মি:। দীর্ঘ ছয় বছর অর্থাৎ ২ বছর প্রস্তুতি পর্ব ও ৪ বছর বাস্তবায়ন পর্ব-এর চরম অবসান ঘটিয়ে এক ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা হয়। এই রায়ে বিবাদীর মৃত্যুদন্ড বহাল ও কার্যকর করা হয়। প্রচলিত বিধিতে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার কোনো বিধান না থাকায় বিশেষ ট্রাইবুনালের বিশেষ বিধির সাহায্য নেওয়া হয়। শাস্ত্রশাসিত মন্ত্রচালিত বস্ত্রধারী মাকাল মুখ্য হাকিমের উপস্থিতিতে সহ-মুখ্য হাকিম পদাধিকার বলে রায়নামায় স্বাক্ষর করেন। এই ঐতিহাসিক রায়ে সদ্যপ্রাক্তন মুখ্য হাকিম সাহেবও ঘটনাক্রমে উপস্থিত ছিলেন। রায়টি খুব আড়ম্বরপূর্ণ পরিবেশই ঘোষণা ও কার্যকর হয়। রায়ে স্বাক্ষরদাতা সংখ্যার উপস্থিতি ছিল বিধিসম্মত। আদালত প্রাঙ্গণে মুখ্য মূর্তির প্রতীক। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে শ্রদ্ধেয় ও সর্বজন প্রিয় সদ্যবিগৎ প্রাক্তন মুখ্য মহোদয়ের চোখেমুখে হৃদয়ের বাধভাঙ্গা ব্যথা-বেদনা ফুটে ছিল। আবার কাউকে দেখা গেছে হাস্য-কৌতুক করতে। আমার সহপাঠী বন্ধুটির অবস্থা ছিল বধ্যভূমিতে জবাই করতে নেওয়া চোখমুখ বাধা ভীত সন্ত্রস্ত পশুর মতো নির্বাক। তার অবস্থা এত বিমূঢ় ছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। সাথেই ছিল অনুজপ্রতিম। যার নামের অর্থ করলে দাঁড়ায় আলোকিত পথ প্রদর্শক। ওর চোখেমুখে ছিল করুণ কান্নার ছাপ। মাথায় বজ্রাঘাত। বাদীর পক্ষের আর্জিটি ছিল সময়োপযোগী। যেমন বোর্নিও সক্রেটিসের মৃত্যুদণ্ডের জন্য ছিল। বিবাদীর অন্তিম ইচ্ছে প্রকাশের সুযোগে যে বাক্যগুলি রেখে গেল:
‘হে মৃত্যু, তুমি জঠর জ্বালা নিবৃত্তির জন্য অনেক কিছুই উদরস্থ করো। আজকের আদালত লোভ ও ভয়ের বশবর্তী, তোমার হাতের এক নির্বোধ ক্রীড়নকমাত্র। ওদের জীবনের বেশিরভাগ উপাদানই ক্ষুধা, হীনতা ও নীচতার দ্বারা লালিত। ওদের দাড়িপাল্লা খারাপ, ওজন সবই ভুল। স্বভাবের ছিদ্র দিয়েই ওদের চরিত্র দেখা যায়। সামান্য একটা কীটের কাঁটাকেও ভয় করে। নিদ্রাই ওদের একমাত্র বিশ্রাম-যে নিদ্রা মৃত্যুরই পূর্বসূরী এবং দীর্ঘ সংস্করণ ছাড়া কিছুই নয়।
চারিত্রিক সত্ত্বায় ওরা ভারবাহী গাধার তুল্য। সারাজীবনের ধন ও ঐশ্বর্যের বোঝা মৃত্যুর
হাতে তুলে দিতে অভ্যস্ত। ওদের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জীবনে শতশত মৃত্যু বিষাক্ত সর্পের মত বাসা বেঁধে লুকিয়ে আছে। মৃত্যু ক্ষুধাকে নিবারণের জন্য ওরা অনেক অবিশ্বাসকে ঠাঁই দিয়ে শূন্যতা প্রসব করে। ওদের রচিত বিধানগুলো নাপিতের দোকানে কাঁটা চুলের মতো অব্যবহৃত হয়ে গেল। উজ্জ্বল সূর্যের কিরণ ভোগ করেও অনুজ্জ্বল। মুখে হাসি মিশ্রিত বিদ্ধেষ।
ওদের মনের গোপন মতলব কুঅভ্যাস তৃপ্ত ও অতৃপ্ত কামনা থেকে উদ্ভূত। উদ্ধত উত্তাল দেহের রক্তজাত বিষাক্ত কালি দিয়ে লেখা গর্ভসার বাক্যগুলো তুমি জঠর জ্বালায় সৎকার করো না। এগুলো জ্বলন্ত সূর্যের ছটা থেকে ওরা অন্ধকারে লুকিয়ে রাখতে পারবে না। ওদের কৃতকর্ম মার্জনাতীত। ওরা ভাগ্যবান দেউলিয়া প্রজন্ম। জন্ম জন্মান্তরে অনাগত প্রজন্ম ওদেরকে কলংক চিহ্ন দেখে চিনে নেবে। সর্ব শাস্ত্রে ওরা যবন।
আমি মৃত্যুঞ্জয়ী। আমার জন্ম তারিখ আছে, মৃত্যু তারিখ নেই। আমি প্রবাহমান নদীর মত চলমান হৃদয়ের জাগ্রত সত্ত্বা। এক হাতে পান করি, অন্য হাতে পান করাই। সসীমের সাথে অসীমের ডাক-হরকরা।
আমরা জানি, মানি ও বিশ্বাস করি বোর্নিও সক্রেটিস জীবনকে ভালোবেসেই জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। আজ তারা সর্ব দেশের ও সর্বকালের মানস সম্পদ। তথাকথিত আদালত মানুষ মানবতা ও সভ্যতার কলঙ্ক।
আমাদের আদালতের কার্যক্রমের ভালো-মন্দ বিচারের ভার আগামী প্রজন্মের ওপরই রইলো। উক্ত রায়ের আমি একজন উপস্থিতি স্বাক্ষরদাতা হিসেবে আমার অতীত অভিজ্ঞতা, কার্যকারণতত্ত্ব ও বর্তমানকে যৌক্তিক বিশ্লেষণ করে বিশ্ব শিক্ষকদের থেকে যতটুকু উদ্ধার করতে পেরেছি তার প্রতিক্রিয়াই শুধু সংক্ষেপে লিপিবদ্ধ করার ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র। ইহা কোন প্রতিমূর্তি নয়, বরং প্রতিচ্ছবি মাত্র। চলচ্চিত্র নয়, বরং চালচিত্র। এই মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত আসামী আর কেউ নয়-সে বহু কাংঙ্খিত আমাদের “শতবার্ষিকী ২০০২”
সমাজ শতাধিক বছর ধরে মনের ও চিন্তার জন্য যে ছাঁচ তৈরি করে দিয়েছে তা ভেঙ্গে বেরিয়ে আসা কঠিন। আর সেই সমাজ বদলে ফেলা কঠিনতর। শিক্ষার সঙ্গে মনের, আর মনের সঙ্গে সমাজের পরিবর্তনের কার্যকারণ পরস্পরায় আস্থা না থাকায় আশা-ভঙ্গ অপেক্ষা করছিল। বিষেশত: বিশেষ শাস্ত্রের বীজ যাদের মনে ও মননে আছে তারা কোন বৈজ্ঞানিক সত্যের কথা শুনলে, সেই সত্য সমন্ধে তাদের শ্রদ্ধা ও অনুসন্ধিৎসা জাগা দূরে থাক তার ফল হয় বিপরীত। অর্থাৎ সেই শাস্ত্রের প্রতি তাদের বিশ্বাস আরো গভীর হয় ও শাস্ত্রের কুসংস্কার বাড়তে থাকে। যেন শেষ পর্যন্ত শাস্ত্রেরই জয় হয়। রাজার সিংহাসন বা রাজনীতি যত দ্রুত বদলায় প্রচলিত সামাজিক নীতি ও প্রথা তত দ্রুত বদলায় না। পুরাতন প্রকৃতি ও প্রবৃত্তি বিশিষ্টদের চাষ উঠিয়ে দিয়ে নতুন মুক্ত মানুষের চাষ করতে না পারলে…। কচুরিপানাপূর্ণ পুকুরে যতই মাছেরপোনা ছাড়া হোক না কেন তা বিকশিত হতে পারে না।
আমরা সবকালের নিম্ন বর্ণের গোত্রের এবং নিম্ন জীবীকার। স্মরণাতীত কাল থেকে অশিক্ষিত মন্ত্রচালিত ও শাস্ত্রশাসিত।
আমরা আরম্ভ করি শেষ করি না,
আমরা আড়ম্বর করি, কাজ করি না।
যা অনুষ্ঠান করি, তা বিশ্বাস করি না।
যা বিশ্বাস করি তা পালন করি না।
ভুরি পরিমাণ বাক্য রচনা করিতে পারি, তিল পরিমাণ ত্যাগ করতে পারি না।
আমরা অহংকার দেখিয়ে পরিতৃপ্ত থাকি, যোগ্যতা লাভের চেষ্টা করি না।
অথচ পরের ত্রুটি নিয়ে আকাশ বিদীর্ণ করতে থাকি। পরের অনুকরণে আমাদের গর্ব, পরের অনুগ্রহে আমাদের সম্মান, পরের চোখে ধুলি নিক্ষেপ করে আমাদের পলিটিক্স ও বাকচাতুর্যে নিজের প্রতি ভক্তি বিহ্বল হয়ে ওঠাই আমাদের জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য।
মনে যা বলি মুখে তা বলি না, কাজে যা করি কাগজে তা বাড়িয়ে লিখি। আমাদের বুদ্ধি ঘোড়া দৌড়ের ঘোড়ার মতো। অতিসূক্ষ্ণ তর্কের বাহাদুরিতে ছোটে ভালো, কিন্তু কর্মের পথে চলে না। আমাদের খাওয়া-পড়া, কাজকর্ম সমস্ত স্বার্থের অঙ্গ। ইহাই আমাদের বর্হিজীবনের মূলগ্রন্থী। স্বার্থ ও সুবিধা লংঘন করে যদিও সামাজিক কর্ম ক্ষণকালের জন্য আকর্ষণ করে, কিন্তু সে দমকা হাওয়া চলে গেলে সে কথা আর মনেও থাকে না। আমরা সর্বোতভাবে পরমুখাপেক্ষী। আমাদের মেরুদন্ডের কোমলতা হতেই এ অবস্থার উৎপত্তি। বলিষ্ঠ মন না থাকলে দুধর্ষ জোয়ানও পঙ্গু হীনবীর্য হয়ে যায়। আমাদের হৃৎপিণ্ড বরফের পিণ্ড, যার মধ্যে ভালবাসার স্থান পায় না। তা সুদীর্ঘকাল তাজা থাকে, কূপনের মতো অন্তরে বাহিরে আপনাকে জড়িয়া রাখতে পারে।
যৌবনে যা বল করে লই, বয়স কালে তা ছল করে লই। বলনীতির প্রেমনীতিকে যোগ করে নীতির নীতিত্ব বাড়াই, কিন্তু বলের বলত্ব কমে যায়। জঠরানল প্রজ্জ্বলিত করে ক্রোধানলকে উদ্দীপ্ত করে থাকি। কোন সংকীর্ণ রাস্তা ধরে কাজে সংক্ষেপ করে দিশাহারা হয়ে শেষ পর্যন্ত পথও হারাই, কাজও নষ্ট করি। চোখে বালি দিয়া রগরাইতে শুরু করি। কথাগুলো যেখানে কর্কশ সেখানে জবাব দেন না। নিন্দাকে ভালোবেসে নিজকে বলীয়ান করি, সত্যকে ভালোবাসি না।
ফাঁকিই সহজ, সত্য কঠিন। পাগল হলেই অনেক কঠিন কথা অতি সহজে মীমাংসা করবার শক্তি জন্মায়। স্রোতের জল ঘোলা হলেও অনায়াসে তার ব্যবহার চলে। যে আগুন ঘরকে পোড়ায়, সে আগুন পরকেও পোড়ায়। স্বভাব আমাদের কাহিল করে রেখেছে তাই অন্যের স্বভাবকে কাহিল করি।
যেমন মূর্তি তেমন স্বভাব। শিখা একভাবে ঘরের প্রদীপরূপে জ্বলে আর একভাবে ঘরে আগুন জ্বলে দেয়। ঝড়ের সময় নৌকার শিকল নোঙ্গরকে টেনে ধরে। বিষ মনে প্রবেশ করলে মৃত্যুর যন্ত্রনা আনে, মৃত্যু আনে না। যে ইট পাঁজায় পড়েছে তা দিয়ে ঘর তৈরি করলে আর পোড়বার ভয় থাকে না। সব তৃণেই তো ধান ফলে না। বিধাতার বরে অপাত্রে জিনিষটা অমর।
ভাববাদীরা পেছনের দিকে বস্তুবাদীদের সঙ্গে একমত, কিন্তু সামনের দিকে না। আবেগ প্রায়ই সুস্থ্য বিচার বুদ্ধিকে আছন্ন করে। শ্রমের প্রক্রিয়ায় মানুষ নিজের লক্ষ্য নির্ধারণ করে তারপরে সে উপযুক্ত উপায় উদ্ভাবন করে এবং সেগুলো প্রয়োগ করে তার ফল হিসাবে অর্জন করে কল্পিত জিনিসটি। কিছু না থেকে নতুন কিছু সৃষ্টি হয় না।
চিহ্ন না রেখে কিছুই অদৃশ্য হয় না। মানুষ নিজেই সবকিছুর পরিমাপক। যতো মত আছে ততো লোক আছে। মত চৈতন্যর ফুল ও ফসল। এটা নির্ধারিত হয় মস্তিকের ঘটমান শরীরবৃত্তিয় প্রক্রিয়া সমূহের দ্বারাই নয়, সামাজিক ও বৈষয়িক সম্পর্কের দ্বারা বিভিন্ন প্রভাবে জীবন সত্তার স্নায়ুগত নাড়া ও সাড়া থেকে।
অকারণে ওড়ার চেয়ে সকারণে খাচায় আবদ্ধ থাকা ভালো। আমরা সওদাগর মানুষ, যা স্বার্থ দেখি তার থেকে দর যাচাই করি। আর যা দেখতে পাইনা তার ওপর আমাদের বিশ্বাস। খাঁটি পাগল তো চেনা সহজ নয়। মুখ্যকুলীন সুখ থেকে উৎপত্তি। সততার লাগামে এক-আধটু ঢিল না দিলে আর ব্যবসা চলে না। বর্তমানে আমাদের অবস্থা:
আমাদের চিত্র, অতি বিচিত্র
অতি বিশুদ্ধ, অতি পবিত্র।
সিংহের চামড়া দিয়ে আসন বা গৃহসজ্জা করতে পারি, কিন্তু সিংহের সাথে চামড়া বদল করতে পারি না। সম্মানের জন্য শিরোপা প্রার্থনা করি। শিরোপায় মাথা বড় হয় না। আসল গৌরবের বার্তা মগজেই আছে। শিরোপায় নাই।
প্রাণের স্মৃতি ঘরে আছে, দোকানে বা কারখানায় নেই। প্রয়োজনের গরজ যেখানে বেশি সেখানে রূপ জিনিসটা অবান্তর। যে মাছ জলে আছে তার কোনো বালাই নেই, যে মাছ হাটে এসেছে তাকে নিয়েই তো মেছোবাজার। সমাপ্তির জন্য বিলুপ্তির আবশ্যক।
বাণিজ্য মানুষকে প্রকাশ করে না, প্রচ্ছন্ন করে। সঞ্চয় কম হলে খরচ করতে সংকোচ হয়। রাখালকে কেউ রাজ সিংহাসনে আমন্ত্রণ করে না। এজন্য সে বটতলায় বাঁশি বাজাবার সময় পায়। জমা করে পাওয়া আমাদের লোকসান, হারিয়ে পাওয়াই লাভ। সাবেক আমলের ভূতই বর্তমানে ভগবান সেজে এসেছে। পূর্ণতার বিপরীতে শূন্যতা। আলো থেকেই জ্বলে; বর্তমান বিলাপ:
ওরে লক্ষণ, একি অলক্ষণ
বিপদ ঘটেছে বিলক্ষণ
অতি নগণ্য কাজে, অতি জঘন্য সাজে
ঘোর অরণ্য মাঝে কত কাঁদিলাম।
কৃষিক্ষেত্র দু’রকমে নষ্ট হতে পারে-প্রকৃতির দৌরাত্নে আর নিজের অযত্নে। আমাদের ক্ষেত্রে উভয়ই কার্যকর। যতো আগ্রহ ততো বড় সংগ্রহ। ঝর্ণশুকিয়ে গেলে পাথরগুলো বেরিয়ে পড়ে। এটা আমাদের শিক্ষার বিড়ম্বনা। শতবর্ষে ছিল আমাদের মাতৃশালায় ভ্রাতৃ সম্মেলন।
অবাধ ক্ষমতার লোভ বুদ্ধির বিকাশ ঘটায়। ক্রোধের মাপ থেকে লোভের মাপের অন্ত পাওয়া যায় না। গরজ যতোই জরুরি হোক, বল জিনিসটা একতরফা ভাঙ্গে, সৃষ্টি করে না। দরদ কমে গেলে মানুষকে অপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর মতো দেখতে অভ্যস্ত হয়।
মূর্য্যরাই বিধাতার ওপর নির্ভর করে, নিজেদের উপর ভরসা করে না। আকাশের তারার দিকে তাকিয়ে থাকে। আবর্জনার একটা মূল্য আছে যদি সে তার আপন ঠাঁইটুকু চিনে নেয়। যদি না হয় তাহলে তাকে ঝেটিয়ে দূর করতে হয়। নয় তো নাকে কাপড় দিতে হয়। শতবর্ষ ছিল আমাদের মানসিক আবর্জনা।
আমাদের তীর্থস্থান হলো রন্ধনশালা, আমাদের ভগবান হলো পাকের ঘরের হাড়ি-পাতিল। যেখানে সংগঠনের উদ্দেশ্যের চেয়ে দল বড় সেখানে শতবর্ষ উদযাপন ডুমুরের ফুল। ন্যাংটাদের গ্রামে ধোপার দরকার হয় না।
কারণ; “Last year I was a Bapari, this year I am a Mia if the price rises next year I shall he Sayed”.
বজ্রাঘাত বা বিদ্যুৎপাত যা কিছুর উপর পতিত হয় তাকেই পুড়িয়ে মারে বা নিজের বলে আকরে ধরে। বিদ্যুতের ইশারার চেয়ে বজ্রের বাণী স্পষ্ট বেশি। তাতে ভুল বুঝার আশংকা কম। জৈবিক ক্ষুধা ভুড়ির পরিমাণ দিয়ে নিজেদের সুখ পরিমাপ করি। যখন ভালবাসা না থাকে তখনই আমরা ঘুমাই। মৃত্যুর পর কী আছে তা জানা থাকলে আর মৃত্যুকে ভয় করতাম না। মঠ গীর্জার সংখ্যাধিক্য তো অনুন্নতির লক্ষণ। কথার সংখ্যা বাড়লে কলংকের চিহ্নটাই জাগবে। বর্ষাকে না জানলে শরৎকে জানা যায় না। সোনার দাম আর আলোর দাম এক নয়। পুজার ফুলে দেবতা খুশি। ভোগের ফুলে উপদেবতা হাসে। সকালের আলোয় ফুলের পাঁপড়ি খুলে যায়, কিন্তু রাজ প্রাসাদের দেয়াল খুলে না। পতিত এসেছে পরিত্রাণের উপদেশ নিয়ে। পুত্র যখন অপুত্র হয়ে মার কাছে আসে তার মতো দুঃখ আর নেই। দুর্বলের ধর্ম মানুষকে দুর্বল করা। পর্বত পাথর দিয়ে সৃষ্টি, প্যাক দিয়ে নয়। মন্ত্র পড়লে কি রক্ত বদল হয়। যকৃতের বিকার উপস্থিত হলে সবই হলুদ বর্ণ দেখায়।
বাক্যে হার মানতে পারি, ভঙ্গিতে কে হারাবে। আমরা মরে প্রমাণ করলাম, আমরা মরি নি। যে পথ দিয়ে ডাকের পত্রবাহকগণ চলে সেই পথ দিয়ে সমস্ত ঠিকানা পাওয়া যায়। বিধবার অন্নহীন, পত্রহীন গৃহ মৃত্যুর অপেক্ষাও অন্ধকার। ভিক্ষুক রাজপ্রসাদের বাহির দাড়িয়ে রাজ ভান্ডারের রুদ্ধ সিন্ধুগুলির মধ্যে অসম্ভব রত্ন মানিক্য কল্পনা করে। কল্পনায় উপকরণের প্রাচুর্য থাকিলে মনটা কুঁড়ে হয়ে যায়। পালতোলা নৌকায় আমাদের মন বিনা ভাড়ায় সওয়ারী হয়ে বসিত এবং যে সব দেশে যাত্রা করিতে বাহির হইত, ইতিহাস ও ভূগোলেও আজ পর্যন্ত তাহাদের পরিচয় পাওয়া যায় নাই।
কাঁচা আমের রস অম্লরস, কাঁচা লেখা মানে গালিগালাজ। অন্য ক্ষমতা কম থাকে তখন খোঁচা দিবার ক্ষমতাটা তীঘ্ন হইয়া থাকে। বিশ্বাস করিবার, আশা করিবার উল্লাশ করিবার, সময় বাল্যকাল অনেক আগেই অতিক্রান্ত; মিলন, অধীনতার মিলন এবং দায়ে পরিয়া মিলন মিলনের গোজামিল মাত্র। এগুলোকে এক করার চেষ্টা করা, হত্যা করার সামিল। ধনী না হইলে দান করা কষ্টকর। বড় কৃত্রিম মিলন। যোগ্যতা লাভছাড়া অধিকার ও কর্তব্য বিমূঢ় শব্দমাত্র। যাহা ঠিক মতো পাই নাই তাহা দেওয়ার চেষ্টাও করিনা।
কথায় সমস্তই দিই কাজে হৃদয়েটুকু দেই না। বিদ্যার বল নাই, কায়দাটাই অস্ত্র।
মানুষের পক্ষে অন্নের দরকার, থালাও দরকার, যেখানে অন্ন জুটিতেছেনা সেখানে তালা সমন্ধে কষাকষি থাকা দরকার। বাঁধ ও বিধিকে নমস্কার। মোমবাতির দুই মুখেই শিখা জ্বালানো চলে না। আমিও এক মুখে জ্বলিব। যেখানে ব্যথা সেখানেই হাত পরে। এক চোখ অনেক দিন ধরে বন্ধ। বাকীটা খুলতে পা কাঁপে। বাহির ও অন্তর মহল দুই পঙ্গু। গায়ের জোর ও তেজের জোর নাই। অর্থাৎ বুকের পাটা নাই।
ভিক্ষুকের কাজ না রাজাকে চেনা, ছোট ভিক্ষুক বড় ভিক্ষুকেই রাজা বলে জানে। এ কোন দুর্লক্ষণ নয়, যদি ভয় না থাকে। যে নিয়ম সত্য তাকে ভাঙ্গতে না দিলে তার পরীক্ষা হয় না। জীবনহীন শান্তিতে মৃত্যু, শক্তিহীন শান্তিতে লুপ্তি। ইচ্ছা যখন সীমা লংঘন করে তখন আর কোথাও তাহার থামিবার কারণ থাকে না। তখন কেবল চাই চাই করিয়া বেড়াইলেই চলে। ভোগ আমাদের কোথায়, দাঁড়াতে দিতে চায় না, সে কেবলই বলে আরো চাই, পদ পদবী দখল করতে হবে। এ এক বিকার পাত্র ফেটে যায়।
এক জাতীয় পাখী একই সুরে গান গায়। আমরা নানা সুরে গাই। আমাদের হাতেই আমাদের সত্যের অবসান। আজ স্বাতন্ত্র অপমান নয়, গৌরব। সর্বত্রই নিয়ম ভঙ্গের পালা। শক্তি অসহায়। তর্কের লাইন সত্যের বিপরীত। সবই স্বাথের দ্বন্দ। যন্ত্রের সামিল। ঠাট্টার মধ্যে কিছু সত্য থাকিলেই লোক চটিয়া ওঠে। অন্ধকারে শত্রুমিত্র ভেদ করা কঠিন। গোল জিনিসের ২টি পিঠ এক সঙ্গে দেখানো যায় না। সকল সুবিধা এক সাখে পাওয়া যায় না। দাতারা মূলধন নষ্টের ভয়ে দান করিলেন না। যে গাড়িতে পারে না, সে ভাঙ্গিবার অধিকারী। সেই দলে মিশতে আমার লজ্জা। শিক্ষা দিবার হাড়াহুড়ায় শিক্ষা পাইবার অবকাশ মিলে না, রোগীর নিয়ম ও যোগীর নিয়ম এক নয়। যাহারা দাতা তাহারা রোগী ও যোগী দেখলেই চিনতে পারে। হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের সাক্ষাৎ সহজ নহে, মানুষের সাথে মানুষের সমন্ধ সরল নহে। দেবতার উপর দোষ দিলে দেবতা কোন জবাব করেন না। আমাদের দাতারা মা কালী ও রাবনের বংশধর।
নিজের অভিমান না থাকলেও বন্ধুত্বের অভিমানকে ঠেকানো শক্ত। পৃথিবীতে যারা মুখ ফুঁটে নালিশ করতে পারে না, চুপ করে থাকে, তারাই উল্টো আসামী হয়। সহ্য করতে তো অপমান নেই। অন্যায়কে সহ্য না করাই হচ্ছে তার প্রতি উচিত ব্যবহার। ঘটনা অনিবার্য, দুঃখও অনিবার্য। রাগ সহ্য করা যায় কিন্তু ঘৃণা সহ্য করা কঠিন। শুদ্র আপন শুদ্রত্বের দ্বারাই বাচিয়া আছে, ব্রাহ্মণত্বের অভাবে মৃত্যু, সুতরাং ইহারাই অপবিত্র। সকল প্রকল্পের পরিমাণ পরিত্যক্ত। হে অদৃষ্ট, তৃনকে তৃন করে গড়েছ, সেই জন্য তোমাকে দোষ দেইনি। কিন্তু বটগাছকে বটগাছ করেও তাকে ঝড়ের ঘায়ে-তৃনের সঙ্গে এক মাটিতে শোয়াও, এতেই বুঝেছি তোমার হৃদয়টা পাষাণ। রাজাতো পৃথিবীর রাজা, তার কূটচালে বা আদেশে পৃথিবী নষ্ট করতে পারে। রাজকার্যে ছোটদের বিজ্ঞাকরতে নেই মহারাজ।
(পাতা-৬-)
অসহ্য হলে ছোটরা জোট বাঁধেলেই ছোটরা বড় হয়। কুপুত্র যদিবা হয় কুমাতা কখনো হয়নি। ফন্দি জিনিসটা ভালো, যদি তার মধ্যে নিজে আটকা পড়া না যায়। যাদের কোন অনুষ্ঠান জোটে না তাদের আবার শতবার্ষিকী কিসের। বুদ্ধিমানের কিছুতেই সন্দেহ ঘোচেনা, তাই নির্বোধ নিয়ে আমাদের কারবার। ভয়ের কক্ষে সব লক্ষণই দুলক্ষণ।
নিরামিশ তরকারি রাধতে হইলে ঝালমসলা বেশি দিতে হয়, নইলে স্বাদ পাওয়া যায় না। এই মসলা পুষ্টির জন্য নহে। ইহা কেবল রসানাকে তাড়া দিয়া উত্তেজিত করিবার জন্য। আমার ভাবনাও তদরূপ। হায় নদীর স্রোত, হায় যৌবন, হায় সংসার তোমরা কেবল সুমুখেই চলিতে পার। যে পথে স্মৃতির স্বর্ণমন্ডিত উপলখন্ড ছড়িয়া আছে, সে পথে আর ফিরিয়া যাইও না। মানুষের মন কেবল পশ্চাৎদিকে চায়, অনন্ত জগৎসংসার সেদিকে ফিরিয়াও তাকায় না।
মুনীর মোরশেদের মনন চিন্তার ভিডিও চিত্র যদিও শতবর্ষের ছানার রসগোল্লা নয়, তবু আশা করি বিকল্প কাঁচা ছানার সন্দেশ তুল্য হবে। এতে ছানার আধিক্য থাকবে, চিনির আধিক্য হলে বহুমূত্র রূগীর জন্য হবে অখাদ্য। সবই প্রতীক্ষা।
========
** প্রতিকূলের যাত্রী সদ্য প্রয়াত সুলতান আহমেদ ১৯৬৭ সালে ব্রাহ্মণ গাঁও উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি উত্তীর্ণ। বালকবেলার দুরন্ত সুলতানকে এখন আর চেনা যায় না। কেননা, পরিণত বয়সে এখন গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রীধারী সুলতান অনেক বিচক্ষণ এবং বোদ্ধা পাঠক। ঈর্ষণীয়ভাবে বই সংগ্রহের পাশাপাশি তিনি মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন।
-: “শতবর্ষের মৃত্যুদণ্ড” :-
ব্রাহ্মণ গাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র সমিতির “পুনর্মিলনী ২০০৪” উপলক্ষে প্রকাশিত ম্যাগাজিনে শতবর্ষ উদযাপন নিয়ে সুলতান আহমেদ ভাইয়ের লেখা “শতবর্ষের মৃত্যুদণ্ড”। লেখাটি লেখকের মৃত্যুর একদিন পর পাঠকের জন্য —-
নিউজটি শেয়ার করুন .. ..
‘‘আমাদের বিক্রমপুর– আমাদের খবর।
আমাদের সাথেই থাকুন– বিক্রমপুর আপনার সাথেই থাকবে!’’
Login করুন : https://www.bikrampurkhobor.com
আমাদের পেইজ এ লাইক দিন শেয়ার করুন।
জাস্ট এখানে ক্লিক করুন। https://www.facebook.com/BikrampurKhobor
email – bikrampurkhobor@gmail.com
















































