প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৪ জুন, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ।। ১০ই আষাঢ় ১৪৩২ বঙ্গাব্দ (বর্ষাকাল)।। ২৭ জিলহজ, ১৪৪৬ হিজরী।
বিক্রমপুর খবর : অনলাইন ডেস্ক :
শতবর্ষের অভিমুখে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ ও শিখা
‘বাংলার রেনেসাঁস’ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে এর ভূমিকায় অন্নদাশঙ্কর রায় উল্লেখ করেছেন : ‘এতকাল আমরা যেটাকে বাংলার রেনেসাঁস বলে ঠিক করেছি বা ভুল করেছি, সেটা ছিল অবিভক্ত বাংলার ব্যাপার। পার্টিশনের পর পূর্ব বাংলা – এখন তো বাংলাদেশ – নতুন করে জেগে ওঠে। সেখানে দেখা দেয় দ্বিতীয় এক রেনেসাঁস। প্রথম রেনেসাঁসে নায়কদের মধ্যে ইউরোপীয় ছিলেন, খ্রিষ্টান ছিলেন, কিন্তু মুসলমান ছিলেন না। দ্বিতীয় রেনেসাঁসের নায়করা প্রায় সকলেই মুসলমান। এবার তাঁরা পা মিলিয়ে নিচ্ছেন। প্রথম রেনেসাঁস ছিল কলকাতাকেন্দ্রিক। দ্বিতীয় রেনেসাঁস হচ্ছে ঢাকাকেন্দ্রিক। এর পূর্বাভাস পার্টিশনের পূর্বেই সূচিত হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনতিকাল পরে। মুসলিম বুদ্ধিজীবী মহলে যখন জগৎ সম্বন্ধে, জীবন সম্বন্ধে, মানুষ সম্বন্ধে, ধর্ম সম্বন্ধে নতুন করে অনুসন্ধিৎসা জাগে, তখন একে বলা হতো ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলন। এর নায়কদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন আবুল হোসেন [হুসেন] ও কাজী আবদুল ওদুদ [এবং কাজী মোতাহার হোসেন]। গত শতাব্দীর ডিরোজিও ও তাঁর ‘ইয়ং বেঙ্গল’ গোষ্ঠীর সঙ্গেই এঁদের তুলনা। এঁরাও গোঁড়াদের বিষ নজরে পড়েন। এক্ষেত্রেও প্রবাহিত হচ্ছিল রিভাইভালের স্রোত। মুসলিম রিভাইভালের। রিভাইভালই প্রবলতর। রিভাইভালের স্রোতের তোড়ে দেশ ভেঙে যায়। তারপরে যখন ভাষার প্রশ্নে একুশে ফেব্রুয়ারির শহীদের রক্তে ঢাকার মাটি রঞ্জিত হয়, তখন সে মাটিতে জন্ম নেয় দ্বিতীয় রেঁনেসাস। মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের রক্ত তাকে আরো শক্তি জোগায়। ‘বাংলার রেনেসাঁস’ না বলে এর নাম রাখা যাক ‘বাংলাদেশের রেনেসাঁস।’ (বাংলার রেনেসাঁস, কলকাতা, আগস্ট ১৯৭৪, ‘ভূমিকা’)।
বাংলার রেনেসাঁসের পরম্পরায় ঢাকার শিখাগোষ্ঠীর উল্লেখ আরো কেউ কেউ করেছেন, যেমন ইতিহাসবিদ সালাহ্উদ্দীন আহ্মদ। উনিশ শতকে ভারতের মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ‘আধুনিক’ ও ‘অগ্রগামী চিন্তার ঐতিহ্য’ বিশেষভাবে ধারণ করেছেন যাঁরা, সৈয়দ আহমদ খান, আবদুর রহীম দাহরী, সৈয়দ আমির আলি ও দেলোয়ার হোসেন তাঁদের মধ্যে অগ্রণী। এঁদের চিন্তা-চেতনায় বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে কেউ কেউ প্রভাবিত হন বলে সালাহ্উদ্দীন আহ্মদ মত প্রকাশ করেছেন। বলেছেন তিনি : ‘তার প্রমাণ আমরা পাই বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে শিখা গোষ্ঠীর আবির্ভাবের মধ্যে। ১৯২৬ সালে আবুল হুসেন (১৮৯৭-১৯৩৮), কাজী আবদুল ওদুদ (১৮৯৪-১৯৭০) ও কাজী মোতাহার হোসেন (১৮৯৭-১৯৮১) প্রমুখ … বাঙালি মুসলমান বুদ্ধিজীবীর উদ্যোগে ঢাকা শহরে মুসলিম সাহিত্য সমাজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। এর মূলমন্ত্র ছিল বুদ্ধির মুক্তি, বুদ্ধি ও যুক্তির আলোকে এবং আধুনিক কালের প্রয়োজনের তাগিদে ইসলামের পুনর্মূল্যায়ন এবং মুসলিম সমাজের সংস্কার করা ছিল এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু সে-সময়ের ঢাকার মুসলমান সমাজের কতিপয় প্রভাবশালী ধর্মান্ধ ব্যক্তির প্রবল প্রতিরোধের মুখে এই আন্দোলন বেশিদূর এগোতে পারেনি। কিন্তু এর রেশ একেবারে মিলিয়েও যায়নি। বেশ কিছু সংখ্যক মুসলিম বুদ্ধিজীবী এটিকে লালন করে এসেছেন এবং আমাদের সময়কালে বাঙালি মুসলিম রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নবজাগরণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।’ (‘মুসলিম ভাবজগৎ/ঐতিহ্য ও আধুনিকতা’, চতুর্থ আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ স্মারক বক্তৃতা, সমাজ-রূপান্তর অধ্যয়ন কেন্দ্র, ঢাকা, সেপ্টেম্বর ২০০৬; পৃ ১৯)। আলোচনার সূত্রে সালাহ্উদ্দীন আহ্মদ এই বুদ্ধির মুক্তি-আন্দোলনের তাৎপর্য ও এর উত্তর-প্রভাব সম্পর্কেও মন্তব্য করেছেন। তাতে দেশবিভাগ-পরবর্তী পূর্ববঙ্গ ভূখণ্ডে ভাষা-আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকারের সংগ্রাম এবং এর ধারাবাহিকতায় সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধ ও তার ফলে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত এই রকম : ‘এই ঐতিহাসিক ঘটনাবলির পটভূমি ছিল বাঙালির এই নবজাগরণ’ (ওই; পৃ ১৯)। প্রাজ্ঞ ইতিহাসবিদের এই মূল্যায়নে বুদ্ধির মুক্তি-আন্দোলন এক অভিনব ব্যঞ্জনা ও মাত্রা পায়।
বাংলাভাষী শিক্ষিত মুসলমান সম্প্রদায়ের মনের খবর শিখাগোষ্ঠীর লেখক-ভাবুকদের মাধ্যমে যতখানি ছড়িয়ে পড়তে পেরেছিল, তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব সামান্য নয়। এক-অর্থে সামাজিক-সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন বাংলার প্রগতিচিন্তার ধারাবাহিকতারই ফসল। বাঙালি বিদ্বৎসমাজ অজ্ঞতা কিংবা অনীহা কিংবা গুরুত্ব-অনুধাবনে অক্ষমতা, নাকি উন্নাসিকতার কারণে এক মহৎ মুক্তবুদ্ধির আন্দোলনের বিষয়ে নীরব, এ-বড়ো বেদনা ও আফসোসের কথা। এক্ষেত্রে বিরল ব্যতিক্রম মুক্তচিন্তার এক বিশিষ্ট লেখক ও সমাজভাবুক শিবনারায়ণ রায়। উনিশ শতকের নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে ডিরোজিও ও ‘ইয়ং বেঙ্গল’ নামে পরিচিত তাঁর দ্রোহী ছাত্রদের সঙ্গে ‘Sikha Movement’-কে মিলিয়ে দেখে কিছু খেদ মিশিয়ে মন্তব্য করেছেন : But while much has been written about Derozio and his Hindu School pupils who were known collectively as ÔYoung BengalÕ, the Sikha movement still waits for its historian. (A new Renaissance and Allied Essays, Calcutta, 1998; PP 82-83).
দুই
‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ বাঙালির, বিশেষ করে বাঙালি মুসলমান সম্প্রদায়ের, মুক্তবুদ্ধিচর্চার একটি স্মরণীয় প্রতিষ্ঠান।
১৯২৬-এর একেবারে গোড়ার দিকে (১৭ই, মতান্তরে ১৯শে জানুয়ারি) ঢাকায় ‘সাহিত্য সমাজে’র জন্ম। ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি যেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’ – এই বীজমন্ত্র নিয়ে ‘সাহিত্য সমাজে’র যাত্রা হয়েছিল শুরু। ১৯২৬ থেকে ১৯৩৮ – এর মাঝখানে এক বছর (১৯৩৭)
‘সাহিত্য সমাজে’র কোনো কার্যক্রম পরিচালিত হয়নি, সেই হিসেবে বারো বছর ছিল এই সংগঠনের আয়ুষ্কাল। অবশ্য শেষের কয়েক বছর ‘সাহিত্য সমাজে’র কার্যক্রম শিথিল ও অনিয়মিত হয়ে পড়ে নানা কারণে। কাজী আবদুল ওদুদ এই প্রতিষ্ঠানের জন্মের প্রেক্ষাপট ও তাৎপর্য সম্পর্কে তাঁর শাশ্বত বঙ্গ (কলকাতা, ১৩৫৮) বইয়ের ভ‚মিকায় বলেছেন : ‘১৩৩২ সালে – ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দের সূচনায় – ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিমণ্ডলে ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’ নামে একটি সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়, তার মূলমন্ত্র ছিল ‘বুদ্ধির মুক্তি’। কয়েকজন মুসলমান অধ্যাপকের উপরে ন্যস্ত হয়েছিল এর পরিচালনার ভার – শাশ্বত বঙ্গের লেখক তাঁদের অন্যতম। বুদ্ধির মুক্তি, অর্থাৎ বিচার-বুদ্ধিকে অন্ধ সংস্কার ও শাস্ত্রানুগত্য থেকে মুক্তি দান – বাংলার মুসলমান-সমাজে (হয়তো বা ভারতের মুসলমান-সমাজে) এ ছিল এক অভ‚তপূর্ব ব্যাপার। কিন্তু সেদিনে বিস্ময়কর হয়েছিল বাংলার শিক্ষিত মুসলিম তরুণের উপরে এর প্রভাব – একটি জিজ্ঞাসু ও সহৃদয়-গোষ্ঠীর সৃষ্টি সম্ভবপর হয়েছিল এর দ্বারা। দৃশ্যত এর প্রেরণা এসেছিল মুস্তফা কামালের উদ্যম থেকে, কিন্তু তারও চাইতে গূঢ়তর যোগ এর ছিল বাংলার বা ভারতের একালের জাগরণের সঙ্গে আর সেই সূত্রে মানুষের প্রায় সর্বকালের উদার জাগরণ-প্রয়াসের সঙ্গে।’
‘সমাজে’র উদ্দেশ্য ও ভাবসত্য সম্পর্কে সংগঠনের আরেক পুরোধা কাজী মোতাহার হোসেনের বক্তব্যও স্মরণযোগ্য : ‘আমরা চক্ষু বুজিয়া পরের কথা শুনিতে চাই না, বা শুনিয়াই মানিয়া লইতে চাই না। আমরা চাই চোখ মেলিয়া দেখিতে, সত্যকে জীবনে প্রকৃতভাবে অনুভব করিতে। আমরা কল্পনা ও ভক্তির মোহ আবরণে সত্যকে ঢাকিয়া রাখিতে চাই না। আমরা চাই জ্ঞান-শিখা দ্বারা অসার সংস্কারকে ভস্মীভূত করিতে এবং সনাতন সত্যকে কুহেলিকামুক্ত করিয়া ভাস্বর ও দীপ্তিমান করিতে। আমরা ইসলামের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করিতে চাই না – আমরা চাই বর্ত্তমান মুসলমান সমাজের বদ্ধ-কুসংস্কার এবং বহুকাল সঞ্চিত আবর্জ্জনা দূর করিতে। আমরা অতীতের মোহে ডুবিয়া থাকিয়া সুখের স্বপ্ন দেখিতে চাই না – আমরা চাই কর্ম্মস্রোতে ঝাঁপ দিয়া ইসলামের ভবিষ্যতকে মহিমামণ্ডিত করিতে। আমরা জীবনকে ‘ভোজের বাজী’ মনে করিয়া ঐহিক উন্নতিকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করিতে চাই না – আমরা চাই জগতের সমস্ত জাতির সহিত সম্পর্ক রাখিয়া জ্ঞানবান, বলবান ও ঐশ্বর্য্যবান হইয়া জীবনের পরিধি বর্দ্ধিত করিতে এবং তাহাকে পূর্ণভাবে আস্বাদ ও ভোগ করিতে। আমরা সমাজের মাথায় হাত বুলাইয়া তাহার মাতব্বর সাজিয়া ছড়ি ঘুরাইতে চাই না। আমরা চাই সমাজের চিন্তাধারাকে কুটিল ও পঙ্কিল পথ হইতে ফিরাইয়া, প্রেম ও সৌন্দর্য্যরে সহজ ও সত্যপথে চালিত করিয়া আমাদের দায়িত্ববোধের পরিচয় দিতে। এক কথায় আমরা বুদ্ধিকে মুক্ত রাখিয়া প্রশান্ত জ্ঞানদৃষ্টি দ্বারা বস্তুজগত ও ভাব-জগতের ব্যাপারাদি প্রত্যক্ষ করিতে ও করাইতে চাই।’ (শিখা, দ্বিতীয় বর্ষের কার্যবিবরণী; দ্বিতীয় বর্ষ : ১৯২৮/ ১৩৩৫)। এই বিবৃতিতে অঙ্গীকারের কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে : সত্যানুসন্ধান, সংস্কারমুক্তি, যুক্তিবাদ, জ্ঞানান্বেষণ, উদার-মুক্ত মন, ইহজাগতিকতা।
‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ সম্পর্কে ওই ‘সমাজে’র ও সম্প্রদায়ের বাইরের একজন সাহিত্যভাবুক, মোহিতলাল মজুমদার, কিভাবে এই সংগঠনটিকে দেখেছেন তার পরিচয় মেলে তাঁর বক্তব্যে : ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’কে
হিন্দু-মুসলমানের মিলনের একটি যোগ্য ও যথার্থ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন তিনি এবং এই ‘সমাজ’কে কোনো সম্প্রদায়বিশেষের সংগঠন না ভেবে একে আপামর বাঙালির এজমালি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। বলেছেন তিনি : ‘… ইহা যে সমগ্র বাঙ্গালী জাতির মিলিত সাধনার ক্ষেত্র, ইহা কখনও বিস্মৃত হইলে চলিবে না, বরং এই সাহিত্য সাধনার মধ্য দিয়াই সমগ্র জাতির হৃদয় একই স্পন্দনে স্পন্দিত হইয়া উঠিবে – দুই সম্প্রদায়ের দুই বিশিষ্ট ভাবধারা একত্র প্রবাহিত হইয়া একটি পুণ্য সঙ্গমের সৃষ্টি করিবে। সাহিত্যের মধ্য দিয়াই শ্রেষ্ঠ ভাবরাশির আদান প্রদান সূত্রে যে একটী আদর্শ ফুটিয়া উঠিবে তাহা দ্বারা এই জাতির পূর্ণ মনুষ্যত্ত্ব লাভের উপায় হইবে। তখন উভয়ে উভয়কে খাঁটি বাঙ্গালী বলিয়া চিনিবে, এবং পরস্পরের গৌরবে গৌরবান্বিত হইবে। এই উদার আদর্শের সন্ধান যাঁহারা ইতিমধ্যেই পাইয়াছেন, যাঁহাদের ভাবনা ও সাধনা এই উৎকৃষ্ট জ্ঞান ও প্রেমের মন্ত্রে দীক্ষিত হইয়াছে, সেই ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজে’র কর্ম্মিগণকে সমগ্র জাতির কল্যাণকামী, সত্যবান সাহিত্য সেবকরূপে আমি কি বলিয়া অন্তরের ধন্যবাদ জানাইব তাহা জানি না; কিন্তু ইহা জানি যে, আজ যাহা অঙ্কুরিত হইয়াছে একদিন তাহাই বিশাল পাদপরূপে ছায়া বিস্তার করিয়া আমাদের প্রাণের শ্রান্তি দূর করিবে – অদূরভবিষ্যতের সেই পরমা সিদ্ধি স্মরণ করিয়া আমি তাঁহাদিগকে আন্তরিক শ্রদ্ধাসহকারে নমস্কার করি।’ (শিখা, তৃতীয় বর্ষ : ১৯২৯-১৩৩৬)। মোহিতলাল মজুমদারের এই প্রত্যাশা ও ভবিষ্যৎ-ভাবনা একেবারে ব্যর্থ বা অসফল হয়েছে এ-কথা বলা যাবে না। এই প্রতিষ্ঠানের প্রভাব প্রথম পর্যায়ে ঢাকাকেন্দ্রিক শিক্ষক-ছাত্র-লেখক-বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, ধীরে ধীরে তা পূর্ববঙ্গের মফস্সলের কিছু সমাজমনস্ক লেখক-বুদ্ধিজীবীকেও আকৃষ্ট করে। আরো পরে এই সংগঠনের মুক্তবুদ্ধিচর্চার আদর্শ সীমিত ক্ষেত্রে হলেও কিছু পরিমাণে বাঙালিসমাজে ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘজীবী না হলেও ‘সাহিত্য সমাজ’ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালির মন-মনন-মানসে যে প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়, তা উত্তরকালের মানুষের কাছে এখনো প্রেরণার আদর্শ।
তিন
মূলত কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল হুসেন ও কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন ‘সাহিত্য সমাজে’র প্রধান ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্ব। পরের ধাপে নাম করতে হয় কাজী আনোয়ারুল কাদির, আবুল ফজল ও মোতাহের হোসেন চৌধুরীর। ছাত্রদের মধ্যে অগ্রণী ও সক্রিয় ভূমিকা ছিল [কবি] আবদুল কাদির, শামসুল হুদা ও আনোয়ার হোসেনের। অবশ্য উল্লেখ করতে হয় আবুল ফজলও তখন ছাত্রজীবন পার করেননি। ‘সাহিত্য সমাজে’র বিভিন্ন অধিবেশন ও অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন, সংগঠনের প্রতি অনুকূল-দৃষ্টি ও পৃষ্ঠপোষকতার মনোভাব ছিল, শিখা পত্রিকায় লেখা ছাপা হয়েছে এমন বিশিষ্টজনের মধ্যে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, কাজী নজরুল ইসলাম, মোহিতলাল মজুমদার, সৈয়দ এমদাদ আলী, স্যার এ. এফ. রহমান, সুরেন্দ্রনাথ মৈত্র, হাকিম হাবিবুর রহমান, আবদুর রহমান খাঁ, খানবাহাদুর তসদ্দুক আহমদ, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, রমেশচন্দ্র মজুমদার, সুশীলকুমার দে, কাজী আকরম হোসেন, বিপিনচন্দ্র পাল, হেমন্তকুমার সরকার, কালিকারঞ্জন কানুনগো, নলিনীকান্ত ভট্টশালী, মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক (ভোলা), আবুল মনসুর আহমদ, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, আকবরউদ্দীন, ফজিলাতুন নেসা, মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন, মোহাম্মদ বরকতুুল্লাহ্, সুফী মোতাহার হোসেন, [ওস্তাদ] মোহম্মদ হোসেন (খসরু), পরিমলকুমার ঘোষ, আশুতোষ ভট্টাচার্য এবং আরো কারো কারো কথা উল্লেখ করতে হয়। একটা বিষয় লক্ষ করার মতো, নামের আগে ‘মুসলিম’ শব্দটি থাকলেও সংগঠনে সাম্প্র্রদায়িক বিভাজন ছিল না – হিন্দু-মুসলমান উভয়েই এখানে স্বচ্ছন্দে অংশ নিয়েছেন। উদার মুক্তচিন্তার সঙ্গে সম্প্রদায়-সম্প্রীতির একটি আবহও গড়ে উঠেছিল সংগঠনের কর্মকাণ্ডে। আবুল হুসেন ‘সাহিত্য সমাজে’র ‘বার্ষিক বিবরণী’তে উল্লেখ করেন : ‘আপনাদের কেহ কেহ হয়ত মনে করবেন এ-সমাজের নাম ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ হওয়ায় হিন্দু সাহিত্যিকগণের কোন সম্পর্ক এতে নাই। কিন্তু এই বার্ষিক বিবরণ হতে আপনারা বুঝবেন যে এ-সমাজ কোন একটী বিশিষ্ট গণ্ডীর মধ্যে আবদ্ধ নয়। কিংবা এ কোন এক বিশেষ সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য গঠিত হয় নাই।
সাহিত্য-সৃষ্টি করাই এর উদ্দেশ্য; আর সেই সাহিত্যে মুসলমানের প্রাণ ও জীবন ফুটিয়ে তোলাই ইহার অন্যতম উদ্দেশ্য।’ (শিখা, প্রথম বর্ষ : চৈত্র ১৩৩৩/ ১৯২৭)। সংগঠনটি জন্মলগ্ন থেকেই হিন্দু ও মুসলমানের যৌথ সমর্থন, পৃষ্ঠপোষকতা ও মনোযোগ লাভ করেছে। আবুল হুসেন ওই প্রথম বর্ষেরই বিবরণের এক জায়গায় একটু রসিয়ে বলেছেন : ‘… আমাদের কয়েকজন নবীন সাহিত্যপ্রাণ বন্ধু মিলে গত বৎসর [১৯২৬] ১৯শে জানুয়ারী শ্রদ্ধাস্পদ মৌঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ সাহেবের পৌরোহিত্যে এই সাহিত্য সমাজের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার ১১ দিন পরে এই শিশু সমাজের জাতক্রিয়ার পৌরোহিত্য করেছিলেন একজন কুলীন ব্রাহ্মণ – আমাদের চুলপাকা নবীন গল্পনিপুণ শ্রদ্ধেয় চারু বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়।’ মোহিতলাল মজুমদারও সংগঠনের নামের আগে ‘মুসলিম’ শব্দটির ব্যবহার সমর্থন করেন (শিখা, তৃতীয় বর্ষ : ১৯২৯/ ১৩৩৬)। কিন্তু তাতেও শেষরক্ষা হয়নি। কেননা মুসলিম সম্প্রদায়ের দুঁদে সমাজপতি ও শাস্ত্রবাহকদের আস্থা ও সমর্থন অর্জন করতে পারেনি এই সংগঠন। ‘সাহিত্য সমাজে’র কোনো কোনো লেখকের ধর্ম ও সমাজ সম্পর্কিত বক্তব্যে রক্ষণশীল মুসলিম সমাজ ক্ষুব্ধ হয়, ফলে এ-বিষয়ে প্রতিক্রিয়া বিচার-সালিশ পর্যন্ত গড়ায়। এতে অভিযুক্ত আবুল হুসেনকে মুচলেকা দিয়ে নিষ্কৃতি পেতে হয়। কাজী আবদুল ওদুদও ছাড় পাননি – তাঁকেও বিরোধী পত্র-পত্রিকার আক্রমণের শিকার হতে হয়। কাজী মোতাহার হোসেন বা শামসুল হুদার কোনো কোনো বক্তব্যও সমালোচনার জন্ম দেয়। এই সামাজিক প্রতিক্রিয়া অনুদার দৃষ্টিভঙ্গি ও পশ্চাদপদ মানসতারই পরিচায়ক।
‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’কে নানা ধরনের
বিরোধিতা-প্রতিবন্ধকতা ও নিন্দা-সমালোচনার মুখোমুখিও হতে হয়। মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ ও তাঁর পরিচালিত দৈনিক আজাদ এবং সাপ্তাহিক ও মাসিক মোহাম্মদীর ভূমিকা ছিল আক্রমণাত্মক। ঢাকার নবাববাড়ি ও বলিয়াদির জমিদার – এঁরাও প্রসন্ন ছিলেন না। শুধু যে ঢাকা শহরে প্রভাবশালী সমাজপতি, আলেম সমাজ ও কতিপয় শিক্ষিত জনই এই প্রতিষ্ঠানের বিরোধী ছিলেন তা নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকার বিদ্বৎকুলের একাংশও ‘সাহিত্য সমাজ’কে মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে পারেননি – সে-প্রমাণও মেলে। যেমন, কেউ কেউ ‘সমাজে’র সভায় উপস্থিত থাকার কথা দিয়েও পরে অপারগতা প্রকাশ করেন। অনেকেই আবার সভার আমন্ত্রণ গ্রহণে দ্বিধান্বিত ছিলেন। অপরপক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের বা আবাসিক হলের কোনো কক্ষ বা মিলনায়তন ব্যবহারের অনুমতি প্রদানেও ব্যক্তিবিশেষ বা কর্তৃপক্ষের অনীহা বা গড়িমসির দৃষ্টান্ত আছে।
বুদ্ধির মুক্তি-আন্দোলনের সঙ্গে একসময় যাঁরা জড়িত ছিলেন, তাঁদের কেউ কেউ বরাবর এই চেতনার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেননি – উত্তরকালে পাকিস্তান-আন্দোলন এবং দ্বিজাতি-তত্ত্বের রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক ধারা প্রবল হলে তাতে প্রভাবিত হয়ে তাঁরা মুক্তবুদ্ধির চেতনা থেকে – প্রগতির বলয় থেকে বেরিয়ে আসেন বা দূরে সরে যান – একধরনের আদর্শিক স্খলন ঘটে তাঁদের। অন্য কারণেও কেউ কেউ ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। তবুও এই আন্দোলন একেবারে ব্যর্থ বা অসফল হয়নি – হয়নি যে সে-সাক্ষ্য কাজী আবদুল ওদুদের মতো দিয়েছেন কাজী মোতাহার হোসেনও : ‘যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে আমরা এক গোঁড়া, শাস্ত্রাচারে আবদ্ধ, প্রগতি-বিমুখ সমাজের সঙ্গে লড়েছিলাম তা যে অনেকখানি সার্থক হয়েছে – আজকের প্রগতিশীল বাংলাদেশের সমাজ দেখে তা বলা যায়। কিন্তু সে-দিন, যে-কথা আমরা বলেছিলাম সে-কথা সে-দিন বলা খুবই কঠিন ছিল। কিন্তু আমাদের চেতনার মধ্যে সততা থাকাতে এবং অবস্থা পরিবর্তনের দিকে বৃহত্তর সমাজের আগ্রহ যে আছে সে-বিশ্বাস থাকাতে আমরা ঐ ধরনের বৈপ্লবিক চিন্তায় ঝাঁপ দিয়ে পড়তে দ্বিধা করিনি।’ (কাজী মোতাহার হোসেন : নির্বাচিত প্রবন্ধ, প্রথম খণ্ড; ঢাকা, জুন ১৯৭৬; পৃ [৬])।
চার
বুদ্ধির মুক্তি-আন্দোলনের সংগঠন ছিল ‘মুসলিম সাহিত্য
সমাজ’ – শিখা এই সংগঠনের মুখপত্রের নাম – বাঙালি মুসলমানের জাগরণে ‘সাহিত্য সমাজে’র ভূমিকা স্বীকৃত ও স্মরণীয়। তাই এই সংগঠন, তার মুখপত্র শিখা ও বাঙালি মুসলমানের উজ্জীবনের আখ্যান একসূত্রে গ্রথিত।
‘মুসলিম সাহিত্য সমাজে’র বার্ষিক মুখপত্র শিখা প্রকাশিত হয় ‘সাহিত্য সমাজ’ প্রতিষ্ঠার পরের বছর (১৩৩৩/ ১৯২৭)। ‘সাহিত্য সমাজে’র নিয়মিত অধিবেশন বা বার্ষিক সম্মিলনে পঠিত ও পঠিত বলে গণ্য নির্বাচিত রচনাই শিখাতে প্রকাশিত হতো। সেইসঙ্গে সভাপতির অভিভাষণ, বার্ষিক কার্যবিবরণী, সংগঠনের নিয়মাবলি, চিঠিপত্র, বার্ষিক সম্মিলনের কর্মসূচি, কখনো গ্রন্থ ও পত্রিকার বিজ্ঞাপনও পত্রিকায় শামিল হয়েছে। শিখার প্রকাশ ছিল অনিয়মিত, সংগঠনের আয়ুষ্কাল বারো বছর হলেও পত্রিকার মাত্র পাঁচটি খণ্ড প্রকাশিত হয়, আবার পত্রিকার কলেবরও সব-সংখ্যার সমান ছিল না। ফলে ‘সাহিত্য সমাজে’র বার্ষিক বা সাধারণ অধিবেশন উপলক্ষে লিখিত অনেক প্রবন্ধই স্থানাভাবে এই সংগঠনের সহমর্মী ও মতাদর্শের সমর্থক পত্রিকা সওগাত, জাগরণ এমনকি ভারতবর্ষ বা প্রবাসীতেও প্রকাশিত হয়।
শিখার প্রথম বার্ষিক সংখ্যার সম্পাদক ছিলেন আবুল হুসেন আর আবদুল কাদের [কাদির] প্রকাশক। পত্রিকাটি ছাপা হয় ঢাকার সাত রওজার ইসলামিয়া প্রেসে। ঢাকা ও কলকাতায় পত্রিকার পরিবেশক ছিল মজিদিয়া লাইব্রেরি। ‘প্রকাশকের নিবেদন’-এ বলা হয় : ‘… এই ‘সমাজে’র মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে ‘চিন্তা-চর্চ্চা করা’। … আজ এক বৎসর চিন্তা-চর্চ্চার ফলে আমরা এই ‘শিখা’ প্রকাশ করতে সমর্থ হয়েছি। ‘শিখা’র প্রধান উদ্দেশ্য বর্ত্তমান মুসলমান সমাজের জীবন ও চিন্তাধারার গতির পরিবর্ত্তন-সাধন।’ দ্বিতীয় (১৩৩৫/ ১৯২৮) ও তৃতীয় বর্ষের (১৩৩৬/ ১৯২৯) শিখা সম্পাদনা করেন কাজী মোতাহার হোসেন। পত্রিকার চতুর্থ (১৩৩৭/ ১৯৩০) ও পঞ্চম সংখ্যার (১৩৩৮/ ১৯৩১) সম্পাদনার ভার পান যথাক্রমে মোহাম্মদ আবদুর রশীদ ও আবুল ফজল। দ্বিতীয় সংখ্যা থেকে প্রকাশক হিসেবে নাম মুদ্রিত হয় সৈয়দ ইমামুল হোসেনের – তিনি ছিলেন আবুল হুসেনের অনুজ ও ঢাকার মডার্ণ লাইব্রেরীর ম্যানেজার। প্রথম, দ্বিতীয় ও চতুর্থ সংখ্যার মূল্য আট আনা এবং তৃতীয় সংখ্যা এক টাকা ও পঞ্চম সংখ্যার মূল্য ছিল বারো আনা। পত্রিকাটি বরাবর একই মুদ্রণযন্ত্র থেকে ছাপা হয়নি। ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর কার্যক্রম ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত পরিচালিত হলেও পঞ্চম বার্ষিক সংখ্যার পর পত্রিকার আর কোনো সংখ্যা প্রকাশ পায়নি। আবুল ফজল তাঁর এক প্রবন্ধে (‘বুদ্ধির মুক্তি’) জানিয়েছেন : ‘… সাধারণত বার্ষিক সম্মেলনে পঠিত রচনাগুলি দিয়েই ‘শিখা’র কলেবর ভর্তি করা হ’ত। সম্পাদক হিসেবে যাঁর নামই মুদ্রিত হউক না কেন আসলে সম্পাদনা করতেন কর্মবীর আবুল হোসেন [হুসেন] সাহেব। বেশিরভাগ খরচও বহন করতেন তিনি। ‘শিখা’র টাইটেল পৃষ্ঠায় একটি ক্ষুদ্র রেখা-চিত্র ছিল, শুনেছি তাও এঁকেছিলেন আবুল হোসেন [হুসেন] সাহেব। একটি খোলা কোরাণশরীফ … মানববুদ্ধির আলোর স্পর্শে কোরাণের বাণী প্রদীপ্ত হয়ে উঠেছে, এ-ছিল রেখাচিত্রটির মর্ম। কিন্তু এর একটা কদর্থ বের করতে বিরুদ্ধবাদীদের বেগ পেতে হয়নি। তাঁরা এর অর্থ রটালেন মুসলিম সাহিত্য-সমাজের সমর্থকরা কোরাণকে পুড়িয়ে ফেলে শুধু মানববুদ্ধিকেই দাঁড় করাতে চাচ্ছে। বলা বাহুল্য গোড়া থেকেই গোঁড়ারা মুসলিম সাহিত্য-সমাজের বিরোধী ছিল।’ (সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জীবন, চট্টগ্রাম, ১৯৬৫; পৃ ২৫৯)।
সমাজ-সাহিত্য-শিক্ষা-ধর্ম-ললিতকলা-ইতিহাস-অর্থনীতি-রাজনীতি – নানা বিষয়ের প্রবন্ধ-আলোচনা-সমীক্ষণ এবং এর বাইরে ‘সাহিত্য সমাজে’র বার্ষিক বিবরণী ও সম্মিলনের সভাপতিদের অভিভাষণও শিখা পত্রিকায় ছাপা হতো। খুবই ব্যতিক্রম হিসেবে পত্রিকায় দুটি গান ও একটি কবিতাও প্রকাশিত হয়। গান দুটি কাজী নজরুল ইসলামের (‘আসিলে কে গো অতিথি উড়ায়ে নিশান সোনালি’ এবং ‘চল্ চল্ চল্ / ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল’)। প্রথম গানটি ‘খোশ আমদেদ’ ও পরেরটি ‘নতুনের গান’ শিরোনামে মুদ্রিত। দুটি গানই ‘সাহিত্য সমাজে’র অধিবেশনে নজরুলের কণ্ঠে গীত হয়। একটি অভ্যর্থনাসংগীত বা আবাহন সংগীত, আরেকটি উদ্দীপনামূলক জাগরণগীতি – যা গান হিসেবে বিশিষ্ট ও নজরুলের জনপ্রিয় রচনার স্বীকৃতি পায়। বলাই বাহুল্য নজরুল গানে, আবৃত্তিতে ও কথায় আসর মাতিয়ে তুলেছিলেন। ‘আবাহন’ শিরোনামে পঁচিশ স্তবকের দীর্ঘ কবিতার অপরিচিত রচয়িতার নাম মুনশী হাবিবউল্লা, এঁর পরিচয় উল্লেখ করা হয় মুন্সিগঞ্জের মোক্তার হিসেবে।
শিখার নিয়মিত ও প্রধান লেখক ছিলেন মূলত তিনজন – কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল হুসেন ও কাজী মোতাহার হোসেন। এঁদের যে-বিতর্কিত লেখাগুলো নিয়ে প্রবল সামাজিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, সেগুলো ‘সমাজে’ পঠিত হলেও তার প্রায় সবই অন্যত্র প্রকাশ পায়। আবদুল ওদুদের ‘সম্মোহিত মুসলমান’, মোতাহার হোসেনের ‘আনন্দ ও মুসলমান-গৃহ’, আবুল হুসেনের ‘নিষেধের বিড়ম্বনা’ বা আবুল ফজলের ‘বাহাই ধর্ম্ম’ জাতীয় উত্তেজক বক্তব্যের রচনা শিখায় অনুপস্থিত। পাঁচ সংখ্যায় ওদুদের চারটি প্রবন্ধ প্রকাশ পায়, এর মধ্যে তিনটিই সাহিত্য-সম্পর্কিত, একটির বিষয় শুধু ‘বাংলার জাগরণ’। তবে ওদুদের ভবিষ্যতের দুটি বড়ো কাজের সূচনা এখানে হয়েছিল – প্রথমত দুই খণ্ডে কবি গ্যেটে এবং দ্বিতীয়ত বাংলার নবজাগৃতি সম্পর্কে বই রচনা। আবুল হুসেন লিখেছেন
শিক্ষা-আইন-রাজনীতি ও মুসলিম মনীষী নিয়ে। এঁদের মধ্যে মোতাহার হোসেনের রচনার বিষয়-বৈচিত্র্য লক্ষণীয় –
ধর্ম-সমাজ-শিক্ষা-দর্শন নানা দিকে তাঁর মন ও লেখনী ধাবিত হয়েছে। তাঁর পাঁচটি প্রবন্ধের মধ্যে অন্তত তিনটি – ‘ধর্ম ও সমাজ’, ‘ধর্ম ও শিক্ষা’ এবং ‘নাস্তিকের ধর্ম’তে নতুন চিন্তা ও সেইসঙ্গে বিতর্ক সৃষ্টির উপকরণও রয়েছে।
শিখাগোষ্ঠীর অন্যান্য কুশীলব যাঁরা, যেমন – কাজী আনোয়ারুল কাদির, আবুল ফজল, মোতাহের হোসেন চৌধুরী, আবদুল কাদের [কাদির], শামসুল হুদা, মোহাম্মদ আবদুর রশীদ, আনোয়ার হোসেন, রকীবউদ্দীন আহমদ, কমরুদ্দীন আহমদ, কামাল উদ্দীন – তাঁদের লেখাও ছাপা হয় শিখায়। আনোয়ারুল কাদির ‘সাহিত্য সমাজে’র গুরুত্বপূর্ণ সমাজভাবুক, তাঁর চিন্তা-চেতনার পরিচয় মিলবে তাঁর একমাত্র প্রবন্ধের বই আমাদের দুঃখতে। ‘সাহিত্য সমাজে’ তিনি বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ পাঠ করেন, তার মধ্যে দুটি শিখায় প্রকাশিত হয়। একটি ইংরেজি সাহিত্য বিষয়ে, অপরটির শিরোনাম (‘বাঙালী মুসলমানের সামাজিক গলদ’) থেকেই বিষয়ের গুরুত্ব ও গভীরতা সম্পর্কে ধারণা করা যায়। আবুল ফজলের একটি মাত্র প্রবন্ধেই তাঁর চিন্তার ঘনত্ব ও প্রকাশের স্বচ্ছতার পরিচয় মেলে। শিখাগোঠীর সংস্কৃতিচিন্তক মোতাহের হোসেন চৌধুরীর বিশেষ প্রয়াস ছিল কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভের, ফলে তাঁর মননচর্চার প্রকৃত বিকাশ কিছু বিলম্বিত হয়। শিখার প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হলেও নিজেকে প্রস্তুত করে প্রকাশিত হতে আরো কিছু সময় লেগেছে তাঁর। মূলত কবি হিসেবেই আবদুল কাদেরের [কাদির] খ্যাতি ও পরিচিতি। তবে মননসাহিত্যের চর্চাতেও তাঁর মনোযোগ লক্ষ করা যায় প্রাবন্ধিক, সমালোচক, ছান্দসিক, সম্পাদক, সাময়িকপত্রসেবী হিসেবে। কিন্তু বুদ্ধির মুক্তি-আন্দোলনের চেতনা তিনি অন্তরে ধারণ করলেও তা সেইভাবে তাঁর সৃজনশীল সৃষ্টিকর্ম বা মননশীল গদ্যরচনায় আসেনি। প্রথম বর্ষের শিখায় প্রকাশিত তাঁর ‘বাংলার লোকসঙ্গীত’ শীর্ষক প্রবন্ধে বৃহৎ বঙ্গের পটভ‚মিতে বাংলার লোকজ সাহিত্যের ঐতিহাসিক পরম্পরায় এর মানবিক, দার্শনিক ও শৈল্পিক রূপের পরিচয় ও তাৎপর্যের প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। ‘সাহিত্য সমাজ’ প্রতিষ্ঠার অন্যতম অগ্রণী আবদুল কাদির উত্তরকালে শিখাগোষ্ঠীর দুই প্রধান নায়ক আবুল হুসেন ও কাজী আবদুল ওদুদ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। বাংলা একাডেমিতে ওদুদের স্মৃতিবার্ষিক সভায় পঠিত কাদিরের প্রবন্ধ প্রথমে একাডেমির পত্রিকায় এবং পরে তা কাজী আবদুল ওদুদ নামে একাডেমি থেকেই গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় (১৩৮৩)। আবদুল কাদিরের সম্পাদনায় প্রকাশ পায় আবুল হুসেনের দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ এবং প্রকাশিত-অপ্রকাশিত রচনার সংগ্রহ আবুল হুসেনের রচনাবলী। (প্রথম খণ্ড, ঢাকা, ১৩৭৫)।
শামসুল হুদার লেখায় মুক্তবুদ্ধির ছাপ অস্পষ্ট নয়। তাঁর দুটি লেখা শিখায় ছাপা হয় – এর মধ্যে ‘কুসংস্কারের একটা দিক’-এর কথা বিশেষভাবে বলতে হয়। আর্থিক ও কৃষি-সমস্যা বিষয়ে আনোয়ার হোসেনের প্রবন্ধের উল্লেখও এখানে করা প্রয়োজন। একেবারেই পরিচিত নন, এমন কয়েকজনের রচনা বিষয়-বৈচিত্র্য ও বক্তব্য-গুণে পাঠকের মনোযোগ কাড়ে – যেমন : আবদুস সালাম খাঁ-র ‘নাট্যাভিনয় ও মুসলমান’, আবদুর রশীদের ‘আমাদের নবজাগরণ ও শরিয়ত’, সৈয়দ আবদুল ওয়াহেদের ‘বাংলার পীর পূজা’, রকীবউদ্দীন আহমদের ‘বাঙ্গালী মুসলমানের আর্থিক সমস্যা’, এ. কে. আহমদ খাঁ-র ‘বৈদেশিক বাণিজ্য ও বাংলার কৃষক’, কামাল উদ্দীনের ‘সভ্যতার উত্তরাধিকার’, আলী নূরের ‘ভারতের আদর্শ’, নাজির উদ্দীন আহমদের ‘স্বাধীন ভারতের দাস’, মোসলেম উদ্দীন খাঁ-র ‘মিলন-সৌধ’। তবে কিছু গুরুত্বহীন লঘু রচনাও যে শিখায় স্থান পেয়েছে, সে-কথা কবুল না-করে উপায় নেই।
পাঁচ
‘সাহিত্য সমাজ’ ও শিখা পত্রিকার সঙ্গে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের নারীরই প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ যোগ ছিল। ‘সমাজে’র অধিবেশন-অনুষ্ঠানে প্রবন্ধপাঠ ও তার মুক্ত আলোচনা, কবিতাপাঠ ও আবৃত্তির পাশাপাশি প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানেই সংগীত পরিবেশিত হতো। ভাবতে আশ্চর্যই লাগে, ‘সমাজে’র অধিবেশন-অনুষ্ঠানে অনেকসময় হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের নারীরা শুধু উপস্থিতই থাকতেন না, অংশও নিতেন – বিশেষ করে প্রবন্ধপাঠ ও
সংগীত-পরিবেশনে। নানা বিষয়ে ‘সাহিত্য সমাজে’র বিভিন্ন অধিবেশনে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ফজিলাতুন নেসা, ফাতেমা খানম, বেগম শামস্-উন্-নাহার, সুজাতা রায়, করুণাকণা গুপ্তা। সাহিত্য সমাজের দ্বিতীয় বার্ষিক অধিবেশন উপলক্ষে প্রবন্ধ লিখেছিলেন ফাতেমা খাতুন ও খুরশীদ জাহাঁ বেগম – স্থানাভাবে তা শিখায় পত্রস্থ না হয়ে অন্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ফজিলাতুন নেসার বিলাতগমন উপলক্ষে ‘সাহিত্য সমাজে’র পক্ষ থেকে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়। ঊষাতারা ভট্টাচার্য, সরমা বসু, যূথিকা রায়, চিত্রা চ্যাটার্জি, রমা নাগ, প্রতিভা সোমের পাশাপাশি জিয়াউন্নাহার, শ’উন্-নাহার ও কাজী মোতাহার হোসেনের কন্যারাও ‘সাহিত্য সমাজে’ গান গেয়েছেন। ‘সাহিত্য সমাজে’র ষষ্ঠ বর্ষের বার্ষিক অধিবেশন হয়েছিল দু’দিন ধরে, ২৫ ও ২৬শে মার্চ ১৯৩২। ওই অধিবেশনের বিবরণী থেকে জানা যায় : ‘উভয় দিনেই প্রচুর সঙ্গীতালাপেরও ব্যবস্থা করা হোয়েছিল। দ্বিতীয় দিনে অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন সাহেবের কন্যাদ্বয়া একটী ঐক্যতান সঙ্গীতালাপে সভাস্থ জনমণ্ডলীকে মোহিত কোরেছিল।’ আজ থেকে প্রায় একশ বছর আগে কোনো প্রকাশ্য সভায় মুসলমান নারীর অংশগ্রহণ অকল্পনীয় মনে হলেও ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজে’র উদ্যোগে তা সম্ভব হয়েছিল। অন্দরে আবদ্ধ নারীর মুক্তি ও জাগরণে এই সংগঠনের চিন্তা ও প্রয়াস কালের নিরিখে যথেষ্টই অগ্রগামী ছিল বলে শনাক্ত করা যায়।
এখানে একটি প্রশ্ন মনে বারবার জাগে, কেন রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে ‘সাহিত্য সমাজে’র যোগাযোগ স্থাপিত হয়নি! তাঁকে কখনো আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে কি না সে-নিয়েও সংশয় আছে। কেননা, চিঠির জবাব দেওয়ার সৌজন্য বরাবরই রোকেয়ার ছিল। এছাড়া ‘সাহিত্য সমাজে’র দুই কর্ণধার কাজী আবদুল ওদুদ ও আবুল হুসেন রোকেয়ার বিশেষ গুণগ্রাহী ছিলেন। ওদুদ রোকেয়া সম্পর্কে প্রবন্ধ লিখেছেন, নানা রচনায় তাঁর বিষয়ে সপ্রশংস মন্তব্য করেছেন। রোকেয়ার একাধিক বইয়ের আলোচনা লিখেছেন আবুল হুসেন। সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুলের একসময়ের সম্পাদক এবং রোকেয়ার ঘনিষ্ঠ সুহৃদ ও শুভাকাঙ্ক্ষী খানবাহাদুর তসদ্দুক আহমদ ছিলেন ‘সাহিত্য সমাজে’র প্রথম বার্ষিক সম্মিলনের সভাপতি। এর পরেও রোকেয়া এই ‘সমাজে’র সঙ্গে সম্পর্কহীন থাকেন কীভাবে! অথচ তাঁর কালে এবং আগে ও পরেও বাঙালি মুসলিম নারীদের মধ্যে রোকেয়ার চেয়ে মুক্তবুদ্ধির মানবী আর কে ছিলেন?
ছয়
নামের আগে ‘মুসলিম’ শব্দ যুক্ত হলেও এই প্রতিষ্ঠানটি চিন্তা-চেতনা ও বক্তব্য-আচরণে ছিল উদার ও অসাম্প্রদায়িক। সব সম্প্রদায়ের মানুষের জন্যেই এই সংগঠনের দরজা ছিল উন্মুক্ত। ‘সাহিত্য সমাজে’ তাই অমুসলিম সাহিত্যসেবী, শিক্ষাবিদ ও সংগীতশিল্পীরা সাদরে আমন্ত্রিত ও গৃহীত হতেন। শিখা পত্রিকার
লেখক-তালিকায় পাওয়া যায় এঁদের নাম : মোহিতলাল মজুমদার, কে. সি. মুখার্জি, সুরেন্দ্রনাথ মৈত্র, কালিকারঞ্জন কানুনগো, উমেশচন্দ্র ভট্টাচার্য্য। নানা সময়ে ‘সাহিত্য সমাজে’র অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন চারু বন্দ্যোপাধ্যায়, রমেশচন্দ্র মজুমদার, উমেশচন্দ্র ভট্টাচার্য্য, সুরেন্দ্রনাথ মৈত্র। হেমন্তকুমার সরকার ও আশুতোষ ভট্টাচার্য প্রবন্ধ এবং শ্রীশচন্দ্র দাস কবিতা পাঠ করেন। বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় অংশ নেন জননেতা বিপিনচন্দ্র পাল, সুশীলকুমার দে, নলিনীকান্ত ভট্টশালী। সংগীত পরিবেশন করেন অর্ধেন্দুভ‚ষণ মুখোপাধ্যায়, বীরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলী, যোগেশ চক্রবর্তী, কুলচন্দ্র সেন ও আরো কেউ কেউ। পরিমলকুমার ঘোষ, জ্ঞানেন্দ্রনাথ চৌধুরী, জে. সি. ঘোষ প্রমুখ
শিক্ষাবিদ-লেখক-সাহিত্যবোদ্ধা এই ‘সাহিত্য সমাজে’র সঙ্গে কোনো-না-কোনো ভাবে যুক্ত ছিলেন।
‘মুসলিম সাহিত্য সমাজে’র দশম বার্ষিক অধিবেশনে (৩১শে জুলাই ১৯৩৬) মূল সভাপতি ছিলেন কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। শরৎচন্দ্রের সভাপতির অভিভাষণটি বিষয়-বক্তব্যে ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি
হিন্দু-মুসলমানের বিবাদ-বিরোধ-ব্যবধানের পরিপ্রেক্ষিতে এই দুই প্রতিবেশী সম্প্রদায়ের সম্প্রীতি ও মিলন কামনা করেন। ‘সাহিত্য সমাজে’র বারো বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্ববহ, তাৎপর্যমণ্ডিত ও উদ্দীপনাপূর্ণ উপস্থিতি ছিল শরৎচন্দ্র ও নজরুলের।
সাত
দুটি হত্যাকাণ্ড ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’কে বিচলিত করেছিল। আততায়ীর প্রথম শিকার ছিলেন স্বামী শ্রদ্ধানন্দ, দ্বিতীয়জন বাংলা প্রদেশের পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল মি. লোম্যান। ‘স্বদেশপ্রেমিক স্বজাতিবৎসল মানবহিতৈষী স্বামী শ্রদ্ধানন্দজীর নৃশংস হত্যার মর্ম্মান্তিক সংবাদে’ ‘সাহিত্য সমাজে’র প্রথম বার্ষিক অধিবেশনের ২৭শে ফেব্রæয়ারি ১৯২৭ তারিখের কার্যক্রম ‘স্থগিত’ করা হয়। এই সিদ্ধান্তের মূলে ছিল সাম্প্রদায়িক ঐক্য ও
সম্প্রীতি-রক্ষা এবং সহিংসতার বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ। অপর ঘটনায় স্বরাজকামী বিপ্লবী দলের হাত ছিল,
তা-সত্ত্বেও লোম্যানের হত্যাকাণ্ডে ‘সাহিত্য সমাজ’ পঞ্চম বর্ষের প্রথম সভায় (৩১শে আগস্ট ১৯৩০) দ্বিতীয় প্রস্তাবে ‘নিন্দা ও দুঃখ’ প্রকাশ করা হয়, শুধু তাই নয়, এই ‘দ্বিতীয় প্রস্তাব সকলে দণ্ডায়মান হইয়া সমর্থন করেন’। (মুসলিম সাহিত্য সমাজ : সভার সংক্ষিপ্ত কার্যবিবরণী : সম্পাদনা – আবুল আহসান চৌধুরী, ঢাকা, জানুয়ারি ২০১৫; পৃ ৯৭)। এই দৃষ্টান্ত ‘সাহিত্য সমাজে’র রাজভক্তির প্রবণতা ও দেশের সহিংস রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের প্রতি অনাস্থার পরিচয় প্রকাশ করে। আবার এই আনুগত্যের ভূমিকা সংগঠনকে সরকারের চোখে সন্দেহমুক্ত রাখার কৌশলও হতে পারে। বিপিনচন্দ্র পাল, হেমন্তকুমার সরকারের মতো জাতীয়তাবাদী ও শ্রমিক আন্দোলনের রাজনীতিকেরা ‘সাহিত্য সমাজে’র অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন ও সমাদৃত হচ্ছেন, আবার ইংরেজ রাজকর্মচারী সশস্ত্র বিপ্লবীদের হাতে নিহত হলে গভীর শোকজ্ঞাপন – এ একধরনের ভারসাম্যের নীতি বলে বিবেচিত হতে পারে। ‘সাহিত্য সমাজে’র কারো কোনো স্পষ্ট রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মতামত তেমনভাবে প্রতিফলিত হয়নি। তবে কাজী আবদুল ওদুদ অনুরক্ত ছিলেন মহাত্মা গান্ধীর। রাজনীতির তাত্তি¡ক দর্শন সম্পর্কে আবদুল কাদিরের আগ্রহ ও পড়াশোনা ছিল, তা সক্রিয় রাজনীতি কিংবা ওই বিষয়ে চর্চায় তাঁকে আকৃষ্ট করেনি। একমাত্র শিখাগোষ্ঠীর আবুল হুসেন রাজনীতি-বীক্ষণ ও বিশ্লেষণে কমবেশি উৎসাহ বোধ করেছেন। আবুল ফজলের মন-মনন ও রচনায় রাজনীতি বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রতি আগ্রহ ও অনুরাগ লক্ষ করা যায়, অবশ্য তা ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ বিলুপ্তির বেশ পরের কথা।
আট
‘মুসলিম সাহিত্য সমাজে’র ভাবধারা প্রকাশিত হয় এর মুখপত্র শিখার মাধ্যমে – ‘সমাজে’র পরিচিতির মূলেও এই পত্রিকার অবদান সামান্য নয়। বিভিন্ন জনের রচনায় শিখার উল্লেখ মেলে, তাতে এই পত্রিকার তাৎপর্য ও গুরুত্বের কথা প্রকাশিত। নানা পত্র-পত্রিকায় শিখার আলোচনা প্রকাশ পায় – নওরোজ পত্রিকায় প্রথম বার্ষিক সংখ্যার বিজ্ঞাপনে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার মন্তব্য উদ্ধৃত হয়। ‘বিজ্ঞাপনে’ উল্লেখ করা হয় : ‘ইহাতে মুসলমান সমাজের নবজাগরণ ও নবসাধনার ইঙ্গিত স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে।’ মানসী ও মর্ম্মবাণী এই পত্রিকা সম্পর্কে মন্তব্য করে : ‘এইরূপ পত্রিকার দ্বারা শুধু যে মুসলমান সমাজ উপকৃত হইবে তাহা নয়; হিন্দু-মুসলমান মিলনের সহায়তা-কল্পেও পত্রিকাখানির প্রয়োজনীয়তা আছে। প্রবন্ধগুলি সুচিন্তিত ও সুলিখিত। মুসলমানগণ এবিষয়ে অবহিত হইলে শুধু সমাজের নয়, হিন্দু-মুসলমান অধ্যুষিত বাংলা দেশেরও উপকার করিতে পারিবেন।’ সওগাত মাসিকপত্রে বলা হয় : ‘… ‘শিখা’র নবীন সাধকগণ যে জ্ঞানের শিখা জ্বালিয়াছেন, সমাজের কুসংস্কার, ভণ্ডামী ও গলদের প্রতি যে খড়্গাঘাত করিয়াছেন, তাহাতে সমাজ-জীবনে জাগরণ-চাঞ্চল্যের অনুভূতি সঞ্চারিত হউক, ইহা আমরা সমস্ত অন্তর দিয়া কামনা করি।’ সওগাত একইসঙ্গে এও বলেছে যে, শিখা-পাঠে ‘আশান্বিত’ ও ‘উপকৃত’ হওয়ার পাশাপাশি ‘আনন্দের সহিত শিক্ষাও লাভ’ সম্ভব হয়েছে। যুগের আলোর অভিমতও অত্যন্ত স্পষ্ট : ‘… “শিখা”র পরিচালকগণ মুস্লিম সমাজের আসল রোগটা ধরিতে পারিয়াছেন এবং তাহাতে উচিৎ ঔষধ প্রদান করিতে সক্ষম হইয়াছেন। … “শিখা” অসত্য ও অন্যায়ের ধ্বংসকারী জ্বলন্ত পাবকের লেলিহান শিখা, তরুণ সাধকমণ্ডলীর সাহিত্য-সাধনার পবিত্র হোমশিখা। সোনার বাংলা এই “শিখা”র আলোকে ভাস্বর হইয়া উঠুক।’ শিখার সমীক্ষায় খাদেম পত্রিকার বক্তব্যও উল্লেখের যোগ্য : ‘… প্রত্যেক রচনার বুকেই জীবন-স্পন্দনের পরিচয় পাওয়া যায়।… “শিখা”য় প্রকাশিত রচনাগুলির মধ্যে গতানুগতিকতার প্রতি আসক্তি ও পুরাতনের মোহের প্রভাব যে ইহার লেখকগণ কাটাইয়া উঠিতে পারিয়াছেন, ইহাতে সন্দেহ নাই। এই গুণেই “শিখা” একখানি উপভোগ্য জিনিস হইয়াছে।’ ইংরেজি-দৈনিক The Bengalee-ও ‘সাহিত্য সমাজ’ ও শিখা পত্রিকার বিশেষ প্রশংসা করতে দ্বিধা করেনি – পত্রিকার ভাষ্য ছিল এইরকম : ‘We must say at the outset that we have seldom come across so many readable and thought-provoking articles in one volume so compendious and yet priced so little. We recommend this publication for a place on the table of every educated Bengalee gentleman worth name, be he a Hindu or Moslem. Although the writers have attempted in these articles to present the muslim outlook on the subjects dealt with, the amount of research made, erudition displayed and method of treatment adopted, make the contributions well worth perusal of every lover of Bengali literature. … We offer our heartiest congratulations to the Ômuslim literary societyÕ as the pioneers in a
Neo-Muslim movement who have nothing but courage and manliness as their watchword and emancipation of intellect as their literary ideal. (নওরোজ, মাসিক, কলকাতা, ভাদ্র ১৩৩৪;
পৃ ‘বিজ্ঞাপন’-৭)। প্রশংসার পাশাপাশি এই পত্রিকার কিছু বিরূপ সমালোচনাও হয়েছিল। ডা. মোহাম্মদ আবুল কাসেম ‘মুস্লিম সাময়িকপত্রের ইতিহাস’ নামে এক সম্পূরক প্রবন্ধে পত্রিকাটির অতি সংক্ষিপ্ত পরিচিতিতে উল্লেখ করেন : ‘শিখা – ঢাকা হইতে প্রকাশিত হয়। যে কয়সংখ্যা পত্রিকা বাহির হইয়াছিল, তাহার প্রবন্ধগুলি উচ্চাঙ্গের হইয়াছিল। কিন্তু এক শ্রেণীর পাঠক-সমাজ পত্রিকাখানির তীব্র সমালোচনা করিয়াছিলেন। পক্ষান্তরে ইহাতে ধর্ম্মভাব-বিবর্জ্জিত ও ইস্লামের অল্প-অধিক বিরুদ্ধাচরণ থাকায় অনেকে ইহা গ্রহণ করিতে রাজী ছিলেন না।’ (মাসিক মোহাম্মদী, কলকাতা, আশি^ন ১৩৩৯; পৃ ৮৬২)।
নয়
‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’, শিখা পত্রিকা ও বাঙালি মুসলমানের জাগরণ – পরস্পর সম্পর্কিত। ‘সাহিত্য সমাজে’র চিন্তা-চেতনা ও ভাব-ভাবনাকে ধারণ করেছে শিখা পত্রিকা, ‘সমাজে’ পঠিত রচনা ও কার্যক্রমের প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেই বিবেচনায় এই পত্রিকা বাঙালি মুসলমানের বুদ্ধির মুক্তি-আন্দোলনের মুখপত্র শুধু নয়, সাংস্কৃতিক ইতিহাসের মূল্যবান দলিলও বটে।
শিখা পত্রিকার নামে ‘সাহিত্য সমাজে’র দল পরিচিতি পেয়েছে ‘শিখাগোষ্ঠী’ নামেও। শিবনারায়ণ রায় এই মুক্তবুদ্ধির আন্দোলনকে পত্রিকার নাম ধরে ‘Sikha Movement’ আখ্যা দিয়েছেন। বহুকাল আগেই বিলুপ্ত হয়েছে ‘সাহিত্য সমাজ’, এর অসাধারণ কর্মকৃতির পরিচয় জানার মুখ্য ও মূল উৎস এই পত্রিকা।
কালের আবর্তনে পূর্ববঙ্গের বাঙালি মুসলমানের নবজাগরণের প্রতিষ্ঠান ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ এ-বছর (২০২৫) শতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে উপনীত, মুখপত্র শিখাও একে অনুসরণ করে চলেছে। একশো বছরে এই ভূখণ্ডের মানুষ মুক্তবুদ্ধির চর্চা ও অনুশীলনে কতদূর এগোলো – সেই সমীক্ষার কাল আগতপ্রায়।
সৌজন্য – কালি ও কলম
নিউজটি শেয়ার করুন .. ..
‘‘আমাদের বিক্রমপুর– আমাদের খবর।
আমাদের সাথেই থাকুন– বিক্রমপুর আপনার সাথেই থাকবে!’’
Login করুন : https://www.bikrampurkhobor.com
আমাদের পেইজ এ লাইক দিন শেয়ার করুন।
জাস্ট এখানে ক্লিক করুন। https://www.facebook.com/BikrampurKhobor
email – bikrampurkhobor@gmail.com














































