মৃত্যুর চেয়ে মহীয়ান সৈয়দ আশরাফ ***********************

0
17

ড.নূহ-উল-আলম লেনিন।

প্রকাশিত:শনিবার,০৫জানুয়ারি ২০১৯ :: বিক্রমপুর খবর::

অনুজপ্রতীম সৈয়দ আশরাফ। তার অকাল মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হলো। সৈয়দ আশরাফ দেশ ও জনগণের সংকটকালে আওয়ামী লীগের হাল ধরেছিলেন। ১/১১-এর পর দলের সভাপতি শেখ হাসিনা তখন কারাগারে। দলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিলকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আড়ালে দেশি-বিদেশি একটি চক্র মাইনাস টু তত্ত্বের নামে শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে নির্বাসিত করার চক্রান্তে লিপ্ত। ‘সংস্কারের’ নামে দলের অভ্যন্তরেই চলছে দল ভাঙার আত্মঘাতী খেলা। শেখ হাসিনাকে গ্রেফতারের আগেই তৎকালীন সামরিক কর্তৃপক্ষ সৈয়দ আশরাফকে দেশত্যাগে বাধ্য করে। লন্ডনে যাওয়ার আগের রাতে আমার বাসায় বসে অঝোরে কেঁদেছিলেন আশরাফ। মৃদুভাষী আশরাফ কেবল বলেছেন, আমি একেবারে যাচ্ছি না। শীঘ্রই ফিরে আসব।

দলের সেই চরম দুর্দিনে লন্ডন থেকে আমাকে ফোন করলেন আশরাফ। বললেন, এটকু সবুর করুন আমি আসছি।

২০০৭ সালের আগস্ট মাসে আমি অস্ট্রেলিয়ার সিডনি গিয়েছিলাম। সেখানে আমার সাথে টেলিফোনে একাধিকবার কথা হয় বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ রেহানার। তিনি আমাকে শেখ হাসিনা মুক্তি পরিষদ গঠনের পরামর্শ দেন। আমি অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী আওয়ামী লীগের সকল উপদলের নেতাদের নিয়ে শেখ হাসিনা মুক্তি পরিষদ গঠন করি। শেখ রেহানা আমাকে সৈয়দ আশরাফের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। আমি সিডনি থেকে আশরাফের সঙ্গে কথা বলি।

কিছু দিন পর আশরাফ ফিরে আসেন। তিনি অফিসিয়াল কার্যনির্বাহী কমিটি ছাড়াও আমার বাসায় বসে ছোট্ট একটি কোর টিম গঠন করেন। আমরা দু’জন এক সাথে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেই।

আমরা দু’জন এবং আমাদের ছোট্ট টিমের অন্য সদস্যদের নিয়ে এমন কতগুলি কাজ আমরা করি যার ফলে দলের অভ্যন্তরে তথাকথিত সংস্কারবাদীদের কোণঠাসা করা সম্ভব হয়। দলের কর্মীদের মধ্যে আস্থা ফিরে আসে। মুক্ত শেখ হাসিনাকে ছাড়া আওয়ামী লীগ নির্বাচনে যাবে নাÑ এই সিদ্ধান্ত রূপায়নে আমরা জনমত গড়ে তুলি। আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটি এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়। ওয়ার্কিং কমিটিতে আগেই আশরাফ ও আমার ঠিক করা প্রস্তাব আমি উত্থাপন করতে চাইলে বাঁধার সম্মুখীন হই। আমাকে প্রস্তাব উপস্থাপনের অধিকার কে দিল, এই প্রশ্ন উত্থাপিত হলো। সভার সভাপতি সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী বললেন, তা’ হলে অন্য কার কি প্রস্তাব আছে বলুন। সবাই নিশ্চুপ। আশরাফ সাজেদা আপাকে বললেন, তাহলে লেনিন ভাইয়ের প্রস্তাবটি আমরা শুনি। সভার সভাপতি আমাকে প্রস্তাব পাঠের অনুমতি দিলেন। প্রকাশ্যে কেউই সেই প্রস্তাবের বিরোধিতা করার সাহস দেখায়নি। তোফায়েল আহমেদ বরং কিছু ইতিবাচক সংযোজনী দিলেন। প্রস্তাব পাশ হলো।

অত:পর বহুমুখী কাজ। গোপন ও প্রকাশ্য। আশরাফ ও আমি পরস্পরের পরিপূরক হয়ে যে সব কাজ করেছি সঙ্গত কারণেই তা প্রকাশ্যে বলা যাবে না। রাজনীতিতে এমন অনেক কাজ আছে যা’ চিরদিন আড়ালেই থেকে যায়। সব সত্য কখনোই প্রকাশ করা সম্ভব হয় না। এমন সব স্পর্শকাতর কাজে আমাদের যুক্ত হতে হয়েছে, যা’ আশরাফ বা আমি কোনো দিনই কারো কাছে প্রকাশ করিনি, করতে পারবও না। আশরাফ মৃদুভাষী ও চাপা স্বভাবের। কোনো অবস্থাতেই তার মুখ থেকে ‘প্রকাশযোগ্য’ নয়Ñ এমন কথা কেউ বার করতে পারত না।

অসমসাহসী ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন নেত্রী শেখ হাসিনা এবং তার বিশ্বস্ত ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ছিল বলেই ১/১১-এর সংকট মোকাবিলা করে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় যাওয়া সম্ভব হয়েছে।

ঐ সংকটকালে অনেকই আছেন, যারা যে কাজ করেন নি, সে কাজের কৃতিত্ব দাবি করে গল্প করে বেরাতেন। আশরাফ আমাকে বলতেন, লেনিন ভাই বলতে দেন। আমরা বরং উপভোগ করতাম। আশরাফ আমাকে শেখ হাসিনার মুক্তির দাবিতে মিছিল মিটিং বা কোর্টে যেতে নিষেধ করেছিলেন। আরও কয়েকজনকে প্রকাশ্য তৎপরতা থেকে আমরা বিরত রেখেছিলাম। কেন আমি শেখ হাসিনার মুক্তির দাবিতে মিছিলে যাই না কোর্টে যাই নাÑ অনেকের কাছেই এই প্রশ্নের সম্মুখিন হতে হয়েছে আমাকে। আমরা আসলে গোয়েন্দাদের চোখ এড়াতেই লো প্রোফাইলে থাকতাম।

পর্দার আড়ালে লন্ডনে বসে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ রেহানাসহ অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। কারো ভূমিকাকেই আমি খাটো করে দেখছি না। কিন্তু ১/১১-এর সময় মাথার ওপরে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানকে রেখে সৈয়দ আশরাফদের নেতৃত্বে আমরা যে সব কাজ করেছি কোনো দিনই তা সর্বাংশে প্রকাশ করা সম্ভব হবে না। ইতিহাসের অনেক অধ্যায় থাকে, অনেক ঘটনা থাকেÑ যা’ কোনো দিনই প্রকাশ হয় না।

বিরলপ্রজ সৈয়দ আশরাফ ছিলেন আমার একান্ত সুহৃদ। তার মতো পরিশীলিত মনের অধিকারী, প্রচুর পড়াশোনা জানা-শোনা বিজ্ঞানমনস্ক আধুনিক মানুষ এখন দুর্লভ। সৎ, নির্লোভ ও আত্মপ্রচারবিমুখ এই সংস্কৃতিবান মানুষটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেতৃত্বের একটা ‘নতুন মান’-এর নজির স্থাপন করেছিলেন। দোষে-গুণে মানুষ ছিলেন তিনি। সাংগঠনিক তৎপরতায় সীমাবদ্ধতা ছিল বটে। তবে দলের প্রতি তার ভালোবাসা, নেত্রীর প্রতি আনুগত্য ও বিশ্বস্ততা ছিল প্রশ্নাতীত।

বর্তমান দুবৃত্তায়িত রাজনীতির পচনশীলতার মধ্যে সৈয়দ আশরাফ ছিলেন প্রকৃতই একজন খাঁটি দেশপ্রাণ বিশুদ্ধমানুষ। ক্ষমতার দম্ভ, দুর্নীতির মালিন্য, আত্মপ্রচার ও অতিকথনের দোষ তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। সৈয়দ আশরাফ মহৎ মানবিক গুণের অধিকারী একজন প্রাগ্রসর জাতীয় নেতার রোল মডেল হয়ে উঠতে পারতেন।জীবন তাকে সে সুযোগ দিল না। মৃত্যু তাকে আমাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিল। তবু মৃত্যুই শেষ কথা নয়।মৃত্যুর চেয়ে আশরাফ মহীয়ান। তার অক্ষয় স্মৃতির প্রতি নমিত শ্রদ্ধা। আশরাফ চিরজীবী হোন।

একটি উত্তর দিন

দয়া করে আপনার কমেন্টস লিখুন
দয়া করে আপনার নাম লিখুন