ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের ইতিহাসে গোলরক্ষক হিসেবে কিংবদন্তি পূর্ণ দাস। ক্লাব শুরুর সময়ে শুধুমাত্র বাঙাল প্লেয়ার নেওয়ার ট্র্যাডিশন ভেঙে ১৯২৫ সালে প্রথম ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে যোগ দিয়েছিলেন পূর্ণ দাস। যার পরিবার ছিল খাস কলকাতার মানুষ। পরবর্তীতে পঞ্চপাণ্ডবের যুগে তিন কাঠির নিচে অতন্দ্র প্রহরী ছিলেন মনিলাল ঘটক। গোলরক্ষক হিসেবে ফুটবল বিশেষজ্ঞরা যাঁকে সবার সেরা বলে মানেন সেই সনৎ শেঠ ও লাল হলুদ জার্সির শেষ প্রহরী ছিলেন দুই বছর। সনৎ শেঠের পরবর্তী সময়ে দীর্ঘদিন খেলেছেন পিটার থঙ্গরাজ। ক্লাব তথা ভারতীয় ফুটবলে তিন কাঠির নিচে তার রাজকীয় বিচরণ গোটা রক্ষণভাগকে স্বস্তিতে রাখত। একজন অতিরিক্ত ডিফেন্ডারের ভূমিকাও তিনি পালন করতেন। তরুণ বসুর মতো বিস্ময়কর গোলরক্ষক খেলেছেন লাল-হলুদ জার্সি গায়ে। দীর্ঘদিন খেলেছেন ভারতীয় দলের অধিনায়ক ভাস্কর গাঙ্গুলী। পিটার থঙ্গরাজের মতো আন্তর্জাতিক আসরে ভাস্করও বিচরণ করেছেন একনাগাড়ে বেশ কয়েকটি বছর।
উপরে যাঁদের নামগুলো বললাম গোলরক্ষক হিসেবে তিনি তাঁদের সবাইকে একটা ব্যাপারে ছাপিয়ে গেছেন তা হলো লাল-হলুদ ক্লাবে খেলার ধারাবাহিকতা। একনাগাড়ে ১৮ বছর এই ক্লাবের গোলরক্ষক ছিলেন তিনি। তিনি মনি তালুকদার।
একশো বছরের ক্লাবের ইতিহাসে মণি তালুকদারের মতো এরকম একটানা ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে আর কেউ খেলেন নি। এটি একটি রেকর্ড। মধ্যে শারীরিক অসুস্থতার জন্য বেশ কিছু ম্যাচ খেলতে পারেননি, কিন্তু ক্লাব ছেড়ে অন্য কোনো ক্লাবে যান নি।
১৯১৯ সালে কলকাতায় আসেন মূলত ছবি আঁকা শিখতে। ইচ্ছে ছিল শান্তিনিকেতনে ভর্তি হওয়ার। কিন্তু সেখানে পড়া আর থাকা বাবদ যা অর্থের প্রয়োজন ছিল, সেটা ওনার পক্ষে বহন করা সম্ভব হয়ে ওঠে নি। শেষে ভর্তি হলেন গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুলে। থাকতে শুরু করেন কুমারটুলি অঞ্চলে। ছোট থেকেই খেলাধুলার প্রতি অদম্য উৎসাহ ছিলই। সেই সুবাদেই ময়দানে ঘোরাঘুরি। কুমারটুলি পার্কে সেই সময় নিয়মিত ফুটবল খেলা হতো, উনিও সেখানে খেলা শুরু করেন। ময়দানেই একদিন পরিচয় হয় নগেন কালির সাথে। তিনি তখন মোহনবাগানে খেলতেন। ১৯২০ সালে ইস্টবেঙ্গল ক্লাব স্থাপিত হলে নগেন কালী ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে চলে আসেন, সাথে নিয়ে আসেন মনি তালুকদারকে। খেলার পাশাপাশি ছবি আঁকা কিন্তু বন্ধ করেননি।গভর্নমেন্ট আর্টস স্কুল থেকে পাস করে আর্টিস্ট হিসেবে স্বীকৃতিও অর্জন করেন। কিন্তু খেলার দিকে গুরুত্ব বেশী দেওয়ার ফলে অন্য দিকে আর খুব একটা বেশী যান নি।
মনি তালুকদার ওনার দীর্ঘ খেলোয়াড়ি জীবনে ক্লাবের বহু ওঠাপড়া ঘটনার সাক্ষী । একদিকে যেমন উনি সাক্ষী ছিলেন একটা নতুন ক্লাব সৃষ্টি হওয়ার সময়কাল থেকেই, আবার সেই ক্লাবই মাত্র ৫ বছরেই প্রথম ডিভিশন ফুটবল লিগে খেলার যোগ্যতা অর্জন করার গৌরবেরও তিনি সাক্ষী ছিলেন। আবার ১৯২৮ সালের ক্লাবের বিপর্যয়ের যন্ত্রনায় তাকে কষ্ট পেতে হয়েছিল। সেই অন্ধকারময় বছরগুলোতে দাঁতে দাঁত চেপে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই। আবার সাফল্য ১৯৩১ সালে, সেখানেও সাক্ষী ছিলেন মনি তালুকদার। বহু স্মরণীয় ম্যাচ তিনি খেলেছিলেন। তাঁর মধ্যে বেশ কয়েকটি ছিল ব্রিটিশ ক্লাব গুলোর বিরুদ্ধে। তিনি পাঁচ বছর ভারতীয় দলের হয়ে গোলরক্ষকের দায়িত্ব সামলাম ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ম্যাচে I ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের প্রথম বার্মা সফরে তিনি ছিলেন ক্লাবের অধিনায়ক I চাকরি করতেন বি.জি.প্রেসে I অফিস লিগে বি.জি. প্রেসকে ছয়বার চ্যাম্পিয়ন ও করেন I ফুটবলের পাশাপাশি তিনি ক্রিকেট, টেনিস এবং হকিতেও পারদর্শী ছিলেন I ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত তিনি ইস্টবেঙ্গলের হয়ে হকি ও খেলেছিলেন I
নিজের যোগ্যতায় এতোগুলো বছর একটানা খেলেছেন, অসম্ভব শারীরিক সক্ষমতা ছিলো। খুব প্রাণবন্ত ছিলেন, আর ক্লাবকে খুব ভালোবাসতেন। এই বিষয়ে সূর্য চক্রবর্তীর কথায় একটা মজার ঘটনা জানা যায়। ১৯৩১ সালে ইস্টবেঙ্গল ক্লাব কলকাতা লীগে পুনরায় প্রথম বিভাগে ওঠার পর, সূর্য চক্রবর্তী নিজের চেষ্টায় বিভিন্ন জায়গা থেকে ভালো প্লেয়ার সংগ্রহ করে মজবুত দল তৈরি করতে থাকেন। এই সময় মোহনবাগান ক্লাবে খেলার জন্য মণি তালুকদারের কাছে প্রস্তাব আসে। অবশ্যই তিনি তাদের মুখের উপর “না” বলে দেন। পরবর্তীতে সূর্য বাবু বিষয়টি নিয়ে জিজ্ঞেস করলে, মনিবাবু বলেন, “ওগো আস্পর্ধা দেখসো, আমারে কিনা কয় ওগো দলে খেলতে। আরে আমি ঢাকার ছেলে, ওগো দলে গেলে আমার নরকেও স্থান নাই। মা বাবারে মুখ দেখাইমু কেমন কইরা। একদম তারাইয়া দিসি”।
মনি তালুকদারের সমসাময়িক খেলোয়াড়দের লেখার থেকে জানা যায়, উনি একটা সময় বলেছিলেন, সবচেয়ে বেশি কষ্ট উনি পেয়েছিলেন ১৯২৮ সালে। সেবছর একসাথে ৫ জন প্লেয়ার রেলের দলে চলে যাওয়ায় টিম এমনিতেই দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তার উপর লীগের খেলা শুরু হতে না হতেই মনি তালুকদার ভয়ঙ্কর কলেরা রোগের কবলে পড়লেন। মাসাধিক কাল যমে মানুষে টানাটানির পর কিছুটা হলেও সুস্থ হয়ে উঠলেন। কিন্তু শারীরিক ভাবে এতটাই দুর্বল হয়ে পড়লেন যে মাঠে নেমে খেলার শক্তি থাকলো না। সেই বছর মনি তালুকদারই ছিলেন ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের একমাত্র নির্ভরযোগ্য গোলকিপার। তার খেলতে না পারাটাও টিমের উপর বিরাট প্রভাব পরে।
ওঁর অনুপস্থিতে সেবছর কম করে হলেও ৮ জন গোলকিপার পরিবর্তন করা হয়। কিন্তু কেউই কোনোরূপ ভরসা দিতে পারে নি টিমকে। একে তো প্রথম টিমের বেশ কয়েকজন প্লেয়ার নেই, তাঁর উপর গোলকিপারের সমস্যা। লীগের খেলায় চূড়ান্ত খারাপ ফল করে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবকে নেমে যেতে হলো দ্বিতীয় ডিভিশনে। শোনা যায় লীগের শেষের দিকের ম্যাচ গুলিতে মনি তালুকদার নাকি তাঁর ওই অসক্ত শরীর নিয়ে মাঠে আসতেন আর টিমের এই অবস্থা দেখে মাঠে নামার জন্য জেদ করতেন। তাঁর শরীরের এই অবস্থা দেখে যখন সবাই তাকে বারণ করতেন, তখন তাঁর দুই চোখে বেয়ে অশ্রু ধারা গড়িয়ে পড়তো।
এতটাই ক্লাবকে ভালোবাসা, এতটাই ক্লাবের প্রতি আবেগ, এখন আর দেখা যায় না। তখন ক্লাবে খেললে কোনো টাকা পাওয়া যেতো না, পাওয়া যেত না কোনো সুযোগ সুবিধা। কিন্তু তা সত্ত্বেও নিজেদের সব কিছু তারা উজাড় করে দিতেন ক্লাবের জন্য। কারণ তখন ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে খেলতে পারাটাই ছিলো একটা গৌরবের, এক সম্মানের ব্যপার।
একটা বিষয় লক্ষ্যনীয়, ইস্টবেঙ্গল ক্লাব কিন্তু বিপর্যয়ের অন্ধকার সরিয়ে সাফল্যের আলো ফিরিয়ে আনতে এক অভাবনীয় প্রচেষ্টা করেছিল, আর তার ফল ও তারা লাভ করেছিল। বিষয়টা একটু বিস্তারিত ভাবে বলি। ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে কুড়ির দশকের মাঝামাঝি অসাধারণ কিছু খেলোয়াড় খেলতে আসে। যারা একটা পরিবারের মতো হয়ে উঠেছিল। আর তাঁদের সবসময়ের অভিভাবক ছিলেন ক্লাবের সেক্রেটারি শ্রদ্ধেয় বনোয়ারীলাল রায় মহাশয়। কুড়ির দশকের শেষের দিকে কিছু প্লেয়ার চলে গেলেও সেই পরিবার কিন্তু ভেঙে যায় নি। বনোয়ারীবাবু জানতেন তাঁদের নিয়েই একদিন সাফল্য আসবেই। ১৯২৮ সালে কলকাতা লিগে বিপর্যয়ের পর একটা সময় ঠিক হয়েছিল, যে, ক্লাবের ফুটবল বিভাগটা বন্ধ করে দেওয়া হবে। কিন্তু সেই চলে যাওয়া প্লেয়ারদের কথায় ক্লাব প্রশাসকরা ভরসা পান। আর সেই প্লেয়ার-প্রশাসক পরিবারের উপর ভিত্তি করেই ইস্টবেঙ্গল ক্লাব আবার ঘুরে দাঁড়াতে সমর্থ হয়। ১৯২৯,১৯৩০, আর ১৯৩১ সালে অধিনায়ক ছিলেন মোনা মৌলিক। পরবর্তীতে তিনি খেলা ছেড়ে দিলেও ক্লাব প্রশাসকরা তাঁকে ১৯৩২ থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত ক্লাবের ফুটবল সেক্রেটারি করে দেন। কারণ, সাফল্য আনতে দরকার সেই বৃহৎ পরিবারের, সেই টিমওয়ার্কের। আবার ক্লাবের বিপর্যয় মেনে নিতে না পেরে, চলে যাওয়া কয়েকজন প্লেয়ার এক এক করে ফিরেও আসেন। শুধু তাই নয় সবাই মিলিত ভাবে হাতে হাত ধরে নতুন প্লেয়ার এনে ক্লাবকে আবার স্বস্থানে উন্নিত করেন। ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের এটাই স্বকীয়তা। যা অন্য কোনো ক্লাবের থেকে ঊর্ধে। এই ক্লাবে প্লেয়ার আর প্রশাসকদের মধ্যে ছিল না কোনো বিভেদ, ছিলো না কোনো দূরত্ব।
১৯৩৮ সাল, মনি তালুকদারের জীবনের আরেক বেদনাদায়ক বছর। সেই বছরের শেষ দিকে ধরা পরে ওঁর শরীরে ক্যান্সারের উপস্থিতি। আর যা একপ্রকার শেষ পর্যায়ে। জীবনের অন্তিম সময়ে, হাসপাতালে শুয়ে সূর্য চক্রবর্তীর হাত ধরে বলেন,”হ্যা রে সূর্য, ঈশ্বর এটা কি করলো রে, আমারে আর কয়েকটা বছর বাঁচাইয়া রাখতে পারলো না, আমি আরো কয়েকটা বছর দলের হইয়া খেইলতে পারতাম”।
ক্লাবের প্রতি কতটা ভালোবাসা থাকলে একজন খেলোয়াড় এমন কথা বলতে পারেন। খেলায় সময় বেশি দিতে হয়, তাই বিয়ে করার কথা কোনোদিনই ভাবেন নি। বাড়ির লোকেদের বলতেন আমার সংসার হলো আমার মাঠ। কিন্তু সেই খেলার আরো সুযোগ নিয়তি তাঁকে আর দিলো না। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে, ১৭ই মে ১৯৩৯ সালে মনি তালুকদার আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেলেন। মারা যাওয়ার সময় তাঁর পিতা-মাতা জীবিত ছিলেন I
মনি তালুকদার আজও আছেন ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের ইতিহাসের পাতায় পাতায়, আছেন হাজার হাজার হৃদয়ের ভিড়ে, আছেন কোটি কোটি সমর্থকদের স্মৃতির মণিকোঠায়, প্রকৃত অর্থে ইস্টবেঙ্গলের প্রাণের প্রদীপ হয়ে।
জীবনের শেষ সময়ও ইস্টবেঙ্গলের জার্সি গায়ে দুর্গ রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী ছিলেন মনি তালুকদার।
তথ্য সূত্রঃ parijat maitro
সম্পাদনা: নাছির উদ্দিন আহমেদ জুয়েল
কিউরেটর
বিক্রমপুর জাদুঘর