বঙ্গবন্ধুর দুর্ধর্ষ খুনি রিসালদার মোসলেহ উদ্দিন পশ্চিম বাংলার বনগ্রামে আটক!

0
15
বঙ্গবন্ধুর দুর্ধর্ষ খুনি রিসালদার মোসলেহ উদ্দিন পশ্চিম বাংলার বনগ্রামে আটক!

প্রকাশিত : সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২০ ইং ।। ৭  বৈশাখ  ১৪২৭ বঙ্গাব্দ।  ২৫ শাবান ১৪৪১

বিক্রমপুর খবর : অনলাইন ডেস্ক : জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আরেক দুর্ধর্ষ খুনি রিসালদার মোসলেহ উদ্দিনকে আটক করার খবর পাওয়া গেছে।

একটি বিশেষ সূত্র জানায় গত সপ্তাহে পশ্চিম বাংলার চব্বিশ পরগনার বনগ্রাম থেকে তাকে আটক করা হয়েছে। গত চল্লিশ বছর যাবৎ তিনি সেখানেই বসবাস করতেন বলে জানা গেছে।

জানা যায় মোসলেহ উদ্দিন বনগ্রামে হিন্দু ডাক্তার হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন। এলাকাবাসীর কাছে ডাক্তার দত্ত নামে তিনি পরিচিত ছিলেন। হোমিওপ্যাথির চিকিৎসক হিসাবে তার বেশ সুনাম ছিলো। গাইঘাটার ঠাকুরনগর রেল স্টেশনের পাশে “ইউনানী ফার্মেসী” নামে তার একটা দোকান ছিল।

আরোও শোনা যায় মাজেদের মতো তিনিও এক হিন্দু মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন। তার সেই ঘরের সন্তানেরা সবাই হিন্দু।

ডাক্তারির পাশাপাশি তিনি নিয়মিত মন্দিরে পূজা অর্চনা করতেন।

সম্প্রতি ফাঁসি কার্যকর হওয়া আরেক খুনী ক্যাপ্টেন ( বরখাস্ত) মাজেদের সঙ্গেও তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। ধারণা করা হচ্ছে এই মাজেদই মোসলেম সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করেছেন।

বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার কয়েক বছর পর থেকে মোসলেম উদ্দিন ভারতে অবস্থান করছেন। এখান থেকেই তিনি কয়েকটি দেশেও যাতায়াত করতেন। এমনকি কয়েক বছর আগে তিনি বাংলাদেশেও এসেছিলেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর মোসলেম উদ্দিন তেহরান ও জেদ্দা দূতাবাসে দায়িত্ব পালন করেন।  তখন দেশে তিনি দুই-একবার আসেন বলেও জানা গেছে।  তবে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তিনি প্রথমে থাইল্যান্ড, পরে পাকিস্তানে চলে যান। এরপর জার্মানিতে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন।  কয়েক বছর পর যান ভারতে।  সেখানে উত্তর চব্বিশ পরগনার ঠাকুরনগর এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

এদিকে রোববার (১৯ এপ্রিল) রাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানা যায় ২০১৬ সালে মোসলেম উদ্দিন জার্মানিতে থাকার তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। এরপর আবদুল মাজেদ এবং মোসলেম উদ্দিনের ভারতে থাকার মোটামুটি নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়।  তখন এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে চিঠিও দেওয়া হয়।

রিসালদার মোসলেহ উদ্দিনের ছেলে সাজিদুল ইসলাম খান বর্তমানে নরসিংদীতে বসবাস করেন। তিনি বলেন, বহু বছর ধরে পরিবারের সঙ্গে তার বাবার কোনো ধরনের যোগাযোগ নেই।

জানা যায়, মোসলেহ উদ্দিনের পাঁচ ছেলে ও এক মেয়ের জাতীয় পরিচয়পত্রে সবকিছু ঠিক থাকলেও শুধু পিতার নাম বদল করা হয়েছে। মোসলেহ উদ্দিনের নামের জায়গায় লেখা হয়েছে রফিকুল ইসলাম খান।

মোসলেহ উদ্দিন ’৭৫-এ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর নরসিংদী জেলার শিবপুরের দত্তেরগাঁও এলাকায় বাড়ি করে স্থায়ীভাবে বসবাস করছিলেন। ’৯৬ সালের আগ পর্যন্ত কোনো সরকারই মোসলেহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে তদন্তের উদ্যোগ নেয়নি। এমনকি বিএনপি সরকারের সময় তার বাড়িতে সার্বক্ষণিক পুলিশি নিরাপত্তা থাকতো। ’৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার তদন্ত শুরু হলে তার বাড়িসহ বেশকিছু সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা হয়। একপর্যায়ে খুনি রিসালদার মোসলেহ উদ্দিন পালিয়ে যান। তার পরিবারের সদস্যরাও দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েন। অনেকেই নিরাপদ স্থানে গা ঢাকা দেন।

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আসামিদের কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার কয়েক বছর পর তাদের জন্য পরিস্থিতি কিছুটা অনুকূলে আসে। এ সুযোগে মোসলেহ উদ্দিনের পরিবারের সদস্যরা ফের নরসিংদী এলাকায় ফিরে আসেন। কিন্তু এবার মোসলেহ উদ্দিনের ৫ ছেলে ও এক মেয়ের সবাই কৌশলে পিতার নাম বদলে নিতে সক্ষম হন। জাতীয় পরিচয়পত্র থেকে শুরু করে সরকারি সব ধরনের কাগজপত্রে তাদের পিতার নাম হয়ে যায় রফিকুল ইসলাম খান।

নতুন পরিচয়ে তারা সমাজের মূল ধারায় মিশে যান খুব সহজে। চাকরি ও ব্যবসা- বাণিজ্য শুরু করেন নতুন করে। মোসলেহ উদ্দিনের বড় ছেলে সাজিদুল ইসলাম খান নরসিংদী শহরের টাউন হল মোড়ে হোটেল ব্যবসা করছেন। দ্বিতীয় পুত্র শফিকুল ইসলাম খান চাকরি নেন জেনারেল ফার্সাসিটিক্যালস কোম্পানিতে।

তৃতীয় ছেলে মাহমুদুল ইসলাম খান সিনিয়র আরএসম পদে চাকরি পান অ্যালকো ফার্মাসিটিক্যালসে। চতুর্থ পুত্র মজিদুল ইসলাম খান পরিবারিক সম্পত্তি দেখাশোনা করেন এবং পঞ্চম পুত্র মহিদুল ইসলাম খান নদী কনস্ট্রাকশন লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন উঁচু পদে। মোসলেম উদ্দিনের একমাত্র মেয়ে সানাজ খানের বিয়ে হয় নরসিংদীতেই। তার স্বামী আবদুল মান্নান ভূঁইয়া এখন দক্ষিণ কারারচর মৌলভী তোফাজ্জল হোসেন উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক।

জাতির পিতার খুনিদের মধ্যে ছয়জন দীর্ঘদিন পলাতক ছিলেন। তারা হলে- মেজর (বরখাস্ত) শরিফুল হক ডালিম, লে. কর্নেল (বরখাস্ত) নূর চৌধুরী, লে. কর্নেল (বরখাস্ত) খন্দকার আবদুর রশিদ, লে. কর্নেল (অব.) এ এম রাশেদ চৌধুরী, ক্যাপ্টেন (অব.) আবদুল মাজেদ ও রিসালদার মোসলেম উদ্দিন। ২০০৯ সালে পলাতক এই ৬ জনের বিষয়ে ইন্টারপোল রেড নোটিশ জারি করে। এর মধ্যে আবদুল মাজেদের ফাঁসি ১২ এপ্রিল রাতে কার্যকর করা হয়েছে। ৭ এপ্রিল গণমাধ্যমকে মাজেদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

ছবি- ১৯৭৫ সালের খুনি মোসলেম। দ্বিতীয় ছবিতে এখনকার ডাঃ দত্তরূপি মোসলেম উদ্দিন।

একটি উত্তর দিন

দয়া করে আপনার কমেন্টস লিখুন
দয়া করে আপনার নাম লিখুন