বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের মেয়েরা

0
12

প্রকাশিত : বুধবার,১৪ অক্টোবর ২০২০ইং ।। ২৯শে আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ (শরৎকাল)।। ২৭শে সফর,১৪৪২ হিজরী  বিক্রমপুর খবর : অনলাইন ডেস্ক :

বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের মেয়েরা

ভূমিকা
 

এ প্রবন্ধের দুটি পর্ব। প্রথম পর্বে আছে, বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসে উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে রেনেসাঁর অভিঘাতে বাংলার নারীচরিত্রে ক্রমশ ঘটে চলা জীবনবোধের পরিবর্তনের ধারাবিবরণী। দ্বিতীয় পর্বে, উত্তরসূরী রবীন্দ্রনাথের বিশ শতকের উপন্যাসে সেই পরিবর্তিত নারীচরিত্রেরা বদলে যাওয়া সমাজ ও জীবনের ওঠাপড়ায় ভাসতে ভাসতে কীভাবে খুঁজে নেবার চেষ্টা করছে নিজের পথ, গড়ে তুলতে চাইছে পূব-পশ্চিমের বিপরীতগামী জীবনদর্শনের মধ্যে একটা গ্রহণযোগ্য সেতুবন্ধ, তার ওপরে কিছু আলোকপাত করবার চেষ্টা করা হবে।

প্রথম পর্ব
বঙ্কিমচন্দ্র
 

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধকে আমাদের ইতিহাসে একটা ঝোড়ো যুগ বলে চিহ্নিত করা যায়। সাগরপার থেকে উড়ে আসা এক নতুন হাওয়ার ঝঞ্ঝায় তখন হাজারো বছরের ভারতীয় অচলায়তনে সাড়া জাগিয়ে বদলে দিচ্ছে এদেশের আর্থিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক মানচিত্রকে। আমূল বদলে যাচ্ছে আমাদের ভাবনাচিন্তা, জীবনধারণ ও জীবনদর্শনের মূল ধারণাগুলো।

গোটা সমাজটা যখন দিগ্বিদিকশূন্য হয়ে একটা নতুন, অচেনা পথে ছুটে চলেছে তার নিয়তিনির্দিষ্ট পরিণতির দিকে, সেই সময়টাতে তার যেমন দরকার ছিল দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্বের, তেমনই দরকার ছিল কিছু দূরদর্শী মানুষের, যাঁরা কিনা জাতির নিজস্ব ভাষায় এই বিপুল পরিবর্তনের একটা নৈর্ব্যক্তিক দলিল রেখে যাবেন ভবিষ্যতের জন্য। এই ডকুমেন্টেশনের জন্য প্রয়োজন ছিল নবপ্রজন্মের শক্তিশালী সাহিত্যিকের, নব্য সমাজব্যবস্থার এই ধারাবিবরণী রচনার জন্য যিনি গড়ে তুলতে পারবেন সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকের ভাষা ও সাহিত্যরীতি।

এই দায়িত্বটা পালন করতে যে ক’জন সে সময় এগিয়ে এসেছিলেন তাদের মধ্যে প্রধান ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র। শখের সাহিত্যিক তিনি কোনোদিনই ছিলেন না। লেখাটা তাঁর কাছে ছিল এক সামাজিক গুরুদায়িত্বপালন। এ প্রসঙ্গে ১২৯১ সালের ‘প্রচার’ পত্রিকাতে লেখকদের প্রতি বঙ্কিমচন্দ্রের উপদেশমালা স্মর্তব্য। যশ নয়, অর্থ নয়, দেশের বা মনুষ্যজাতির মঙ্গলসাধনের জন্যই কলম ধরার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি সেখানে। সে কাজটা সুষ্ঠুভাবে করতে গিয়ে, একটা সুপ্রাচীন সমাজের আমূল বদলের বহুমাত্রিক চরিত্রটির বিভিন্ন দিককে লিপিবদ্ধ করবার জন্য নতুন নতুন আঙ্গিক এবং ভাষারীতিও নিজেকেই গড়ে নিতে হয়েছিলো তাঁকে। ফলত সৃষ্টি হয়েছিল কমলাকান্ত থেকে কৃষ্ণচরিত্র, দুর্গেশনন্দিনী থেকে সীতারাম অবধি বিস্তৃত এক বহুবর্ণিল ও বহুমাত্রিক সাহিত্যসম্ভার।

১৮৬৫ থেকে ১৮৮৭ সাল–এই সময়টা, বলতে পারেন বাংলার নবজাগরণের তুঙ্গমুহূর্ত। সেই উত্তুঙ্গ সময়ের মধ্যে বসে চোদ্দোটা উপন্যাস লিখেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র। এখানেও, বলা যায়, বাংলা ভাষায় এই নতুন সাহিত্যরীতির জন্ম হয়েছিল যাঁদের কলমে তাঁদের মধ্যে তিনিই পুরোধা ছিলেন। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, এই উপন্যাসসম্ভারের মধ্যে দিয়ে, বিবিধ ঐতিহাসিক রঙ্গভূমির প্রেক্ষাপটকে ব্যবহার করে, সমসময়ের মানুষের ভাবজগতের বিবর্তনের রেকর্ড রেখে গিয়েছেন তিনি। দশম শতাব্দি থেকে শুরু করে ঊনবিংশ শতাব্দির মাঝামাঝি অবধি নানান কালখণ্ডের পটভূমিতে তাঁর কাহিনীবিন্যাস, অথচ তার চরিত্রদের মনোজগতের বিবর্তন কিন্তু নিপুণভাবে তুলে আনছিলো রেনেসাঁর অভিঘাতে টালমাটাল একটি জাতির পরিবর্তনশীল মনস্তত্ত্বের বিভিন্ন দিকের ছবি, যার মধ্যে প্রধান একটা জায়গা নিয়েছিলো, অগ্রসরমান আধুনিকতার স্পর্শে মেয়েদের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের দিকটা।

বক্তব্যটাকে উদাহরণ দিয়ে পরিষ্কার করতে চাইব। সেটাই এই নিবন্ধের মূল উদ্দেশ্যও বটে। এজন্য আমরা বেছে নেব তাঁর উপন্যাসসম্ভারের থেকে চারটে প্রধান কাজ—একেবারে শুরুতে লেখা দুর্গেশনন্দিনী, ঔপন্যাসিকজীবনের মাঝামাঝি লেখা বিষবৃক্ষ ও চন্দ্রশেখর এবং একেবারে শেষ উপন্যাস সীতারামকে।

রেনেসাঁর একটা প্রধান দিক ছিলো মেয়েদের জীবনদর্শনে এক আমূল পরিবর্তনের সূচনা; সমাজ ও সংসারে পুরুষের যৌনদাসী ও অন্তঃপুরের কর্মদাসী থেকে তার আত্মচেতনা সম্পন্ন ও দোষেগুণে মেশা পূর্ণ মানুষের ভূমিকায় উত্তরণ। এক বিচিত্র ও অননুকরণীয় ভঙ্গিতে এই উপন্যাসগুলির নারীচরিত্ররা সেই ক্রমপরিবর্তনের ধারাটিকে ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁদের জীবন, সিদ্ধান্ত ও ক্রমপরিণতির মাধ্যমে। মধ্যযুগীয় মূল্যবোধ ও জীবনদর্শনের ঘেরাটোপ থেকে ধীরে ধীরে বের হয়ে এসে চিনতে শিখেছেন নিজেদের শক্তিকে, পুরুষনির্ভর লতাজীবন ত্যাগ করে গড়তে শিখেছেন নিজস্ব জীবন, প্রয়োজনে পুরুষকে নিদারুণ শাস্তি দিয়ে অপমানের প্রতিশোধও নিতে শিখেছেন।

আসুন, আলাপ করা যাক সেই ক্রমবিবর্তনের উদাহরণগুলোর সঙ্গে।

|| দুর্গেশনন্দিনী ||

৯৯৭ খৃষ্টাব্দের বাংলার পটভূমিতে এই উপন্যাসের বিস্তার। প্রকাশিত হয় ১৮৬৫ সালের মার্চ মাসে। ইতিহাসের বীজ একটা যে রয়েছে এ উপন্যাসের মধ্যে, সে আমরা প্রায় সকলেই জানি। সেটা হল, গড় মান্দারণ জয় করে উড়িষ্যার পাঠানেরা জমিদার ও তাঁর মেয়েকে ধরে নিয়ে যায় ও তাদের উদ্ধার করতে গিয়ে বন্দী হন রাজপুত রাজপুত্র জগৎসিংহ।

কিন্তু উপন্যাসের পাতায় গল্প ছুটলো নিছক যুদ্ধক্ষেত্রের অস্ত্রের ঝনঝনাকে ছাপিয়ে তার কুশীলবদের অন্দরমহলে। রিয়েলিজমের গণ্ডিকে তুড়িতে উড়িয়ে দিয়ে লেখক যুদ্ধে আহত মরণোন্মুখ নায়ক জগৎসিংহকে নিয়ে ফেললেন তাঁর পাঠান শত্রু কতলু খাঁয়ের দুর্গের অন্দরমহলে। জগৎসিংহ বাঁচলে পাঠানের বেশি সুবিধে, কারণ তাঁর জীবনের বিনিময়ে তাঁর বাবা মানসিংহের সঙ্গে দরকষাকষিতে অনেকটা ভালো অবস্থানে থাকবে পাঠানেরা। কিন্তু সেজন্য তো বন্দিশালা ও একজন হেকিমের উপস্থিতিই যথেষ্ট ছিলো। কিন্তু তার বদলে, নৈর্ব্যক্তিক বাস্তবানুগতার পথ ছেড়ে গল্প এগোল লেখকের নিজস্ব আবেগসংশ্লিষ্ট বাস্তবতা বা ইমোশনাল রিয়েলিটির পথ ধরে। বন্দী বিধর্মী শত্রুর রোগশয্যায় সেবা করতে এলেন কতলু খাঁয়ের মেয়ে রূপসী আয়েষা। আয়েষার প্রেমিক, কতলু খাঁর সেনাপতি ওসমানের আনুগত্য ত্রিধারায় ভাগ হয়ে বইতে লাগল পরস্পরবিরোধী পথে। আয়েষার প্রতি তার প্রেমজ আনুগত্য, জগৎসিংহের জন্য অসহায় মানুষের প্রতি কর্তব্যজাত আনুগত্য (ও তার পাশাপাশি প্রেমে প্রতিদ্বন্দ্বীর জন্য শত্রুতা) এবং কতলু খাঁয়ের প্রতি তার রাজকর্তব্যজনিত আনুগত্য। ওদিকে উপন্যাসের নায়ক জগৎসিংহের আবেগও তখন দুই ধারায় বইছে। তার একটি ধারা গিয়েছে বাঞ্ছিতা তিলোত্তমার দিকে আর অন্য ধারাটি, মুগ্ধতা ও কৃতজ্ঞতার রসসিঞ্চিত হয়ে আয়েষার অভিমুখে বইছে। আর এইভাবেই বাস্তবের বিকৃতি ও অত্যুজ্জ্বল, ধাক্কা দেয়া নাটকীয়তার আশ্রয় নিয়ে ইমোশনাল রিয়েলিটির জটিলতাকে গল্পশরীরে বুনে দিয়ে সমসময়ে পশ্চিমা শিল্পমাধ্যমে সদ্য গজিয়ে ওঠা এক্সপ্রেশনিস্ট শিল্পরীতির একটা দেশীকরণের আভাস গড়ে উঠল এই উপন্যাসে।

কিন্তু পরস্পরবিরোধী আবেগের সেই ঘূর্ণিপাকে ব্যতিক্রম শুধু আয়েষা। অভিভাবকের স্থির করে দেয়া পুরুষের শয্যা ও রন্ধনশালার অংশীদার মধ্যযুগীয় নারীর বদলে তার চরিত্রে লেখক বুনে দিয়েছেন আধুনিক হয়ে উঠতে থাকা নারীর মানসিকতা। হৃদয়ের অধিকার সে কাকে দেবে সে ব্যাপারে সে নারী কারো মতামতের অপেক্ষা রাখে না। নিজের প্রিয় মানুষকে সে নিজেই নির্বাচন করবার ইচ্ছা ও শক্তি ধরে। ধর্ম, সমাজ, সংসারের যাবতীয় নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে জগৎসিংহকে ভালোবাসলো আয়েষা। আর তারপর, আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে প্রিয় পুরুষের সুখের জন্য তাকে তার বাঞ্ছিতার হাতে তুলেও দিলো হাসিমুখে। চরিত্রের এই দৃঢ়তা আর নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নেবার আকাঙ্ক্ষা ও ক্ষমতাই রেনেসাঁ-উত্তর নারীশক্তির চরিত্রচিহ্ন। নিজের শরীর, মন ও আত্মার ওপর কেবলমাত্র নিজের অধিকার দাবী ও ঘোষণা করে বিশ শতাব্দির যে নারীবাদী আন্দোলনের জন্ম, নিজের মন ও আত্মার প্রতি একমাত্র নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রমাণ হিসেবে জগৎসিংহকে ভালোবেসে-বসা আয়েষার মধ্যে যেন সেই আন্দোলনের প্রথম ছায়াশরীরটি দেখিয়ে দিলেন ভিশনারি সাহিত্যিক। পটভূমি ৯৯৭ সালের, কিন্তু দুর্গেশনন্দিনীর আয়েষা তাঁর প্রেমের ব্যাপারে তাই একেবারেই উনিশ শতকের রেনেসাঁর নিশানবাহিকা।

কিন্তু তবু, আয়েষা সম্পূর্ণ বন্ধনমুক্তা হতে পারেন নি। কাহিনীর একেবারে শেষে এসে, জগৎসিংহকে তিলোত্তমার হাতে তুলে দেবার পর মৃত্যুচিন্তা তাঁর মাথায় এসেছিলো বটে, কিন্তু নিজের অস্তিত্বকে নিজের হাতেই বিনাশ করবার মতো সাহস তখনও তাঁর ভেতরে গড়ে ওঠেনি। তার কারণ, লেখকের সমসময়ের রেনেসাঁর মধ্যে দিয়ে এগোতে থাকা বাঙালি-সমাজের মতোই তাঁর এক পা সামনের দিকে বাড়ানো থাকলেও অন্য পা তখনও প্রোথিত রয়ে গেছে অতীত যুগের বুকে। যন্ত্রণা সহাতেই নারীজন্মের সার্থকতা, অনিঃশেষ যন্ত্রণাতেও নিজেকে বিনষ্ট করবার অধিকার তার নেই, এই প্রাচীন সামাজিক বিধানকে শিরোধার্য করে নিজের অস্তিত্ব নিজে বিনষ্ট করবার অধিকারকে ত্যাগ করলেন আয়েষা। আর এই অধিকারত্যাগের মাধ্যমে, নিজের অস্তিত্বের ওপরে সমাজ ও পরিবারের অধিকারকে মেনে নিয়ে তাঁর হাতের বিষে ভরা আংটি স্থান পেল দুর্গপরিখার গভীর জলে।

|| বিষবৃক্ষ ||

কিন্তু দুর্গেশনন্দিনী প্রকাশের আট বছর পরে, ১৮৭৩-এ প্রকাশিত বিষবৃক্ষ উপন্যাসের কুন্দনন্দিনীর ক্ষেত্রে লেখক নারীকে সে অধিকার এবং ক্ষমতাও দিলেন। সেই সঙ্গে, এই উপন্যাসের নারীচরিত্রদের মধ্যে গড়ে উঠলো পুরুষের মতোই জীবনকে নিজের পথে উপভোগ করবার সুতীব্র ইচ্ছার এক উজ্জ্বল, অলজ্জ বহিঃপ্রকাশ। আধুনিক নারী হয়ে ওঠবার পথে আর এক ধাপ এগোল বঙ্কিম উপন্যাসের নারীচরিত্র।

অনাথিনী, বিধবা কুন্দনন্দিনীর প্রেমে উন্মাদ হয়ে লাজলজ্জা ও চরিত্র খুইয়েছিলো নগেন্দ্র। সতী, সচ্চরিত্রা ও প্রতিষ্ঠানকে সম্মান করা আর দশটা হিন্দু বিধবা নারীর মতো এই ঘটনায় একেবারেই ধরণী দ্বিধা হয়ে পাতালে তলিয়ে গেলো না কুন্দনন্দিনী। অথচ সে কিন্তু কুলটা নয়। সে সুশীলা, সুচরিত্রা, সুন্দরী, সর্বগুণের আধার। তবু, মধ্যযুগীয় হিন্দু সতীত্বের সংজ্ঞায় সচ্চরিত্রা বিধবার যে আত্মসুখবঞ্চনার ধর্ম, সেটিকে মানতে সে একেবারেই রাজি নয়। একান্তই আধুনিক এক মানসিকতার বশবর্তী হয়ে, নিজের সুখের উপকরণটি যখন তার হাতের কাছে আসে তখন, ন্যায়-অন্যায়, ধর্মাধর্ম, কোনো বিচারকেই সে তার সেই সুখটিকে হাত পেতে নেবার পথে বাধা হয়ে আসতে দেয় না। অতএব সূর্যমুখী যখন তার স্বামী নগেন্দ্রের সাথে কুন্দর বিবাহের প্রস্তাব দেয় তখন সূর্যমুখীর তীব্র যন্ত্রণাকে বুঝতে পেরেও, সে-বিয়ের থেকে নিজেকে পিছিয়ে নেবার কথা তার মনে আসে না। প্রেমিককে পাবার বিনিময়ে, যে সূর্যমুখী তার অনাথ অবস্থায় তাকে বুকে করে আশ্রয় দিয়েছিলো তার এতবড়ো সর্বনাশ করবার জন্যও পিছপা হয় না সে একেবারে। এরপর সূর্যমুখী যখন গৃহত্যাগ করল, তখন কুন্দনন্দিনী দুঃখ পেয়েছে বৈকি, কিন্তু বহিরঙ্গের সেই দুঃখের অন্তরালে তার দুঃখের আসল কারণটি ছিল তার প্রতি প্রেমিক তথা স্বামীর ক্রমবর্ধমান উপেক্ষা।

অন্যদিকে, সূর্যমুখীর চিরায়ত সংস্কারবদ্ধ সাধ্বী স্ত্রীর চরিত্রটির মধ্যেও কিন্তু ঘুমিয়েছিল স্বাধীনচেতা একটি আত্মসম্মানজ্ঞানযুক্তা নারীচরিত্র। সপত্নীকে মাথা পেতে মেনে নিয়ে নিজের ভালোবাসার মানুষকে ভাগ করে নেবার মতন ট্র্যাডিশনাল পদ্ধতিতে আস্থা রাখবার বদলে, বহুগামী স্বামীকে ত্যাগ করে সে বেছে নিয়েছিল গৃহত্যাগের মতো সাহসী একটি পদক্ষেপ। হয়ত শেষরক্ষা সে করতে পারেনি, হার তাকে মানতে হয়েছে, কিন্তু নিজের দায়িত্ব নিজের ‘পরে নিয়ে এই যে ঘর ছেড়ে পথে একা একা পা বাড়ানো, এর মধ্যে দিয়ে উত্তর-রেনেসাঁ বাঙালি মেয়েদের মধ্যে স্বাধীনচেতা ও আপোষ না করা স্পিরিটটির জেগে ওঠবার ইঙ্গিত দিয়ে গেলেন বঙ্কিমচন্দ্র।

নিজের ভালোবাসাকে সম্মান দিয়ে নিজের দেহমন, বর্তমান-ভবিষ্যৎ সমস্ত কিছু এক বিবাহিত পুরুষকে সমর্পণ করে, তাঁর প্রথমা স্ত্রীকে গৃহচ্যূত করে নগেন্দ্রর ঘরে এসে উঠলেও কুন্দনন্দিনী কিন্তু এক জায়গায় নিজের স্বাধীনতাকে অটুট রেখে দিয়েছিলো। আর সব কিছু প্রণয়ীর হাতে সমর্পণ করলেও নিজের অস্তিত্বের ওপর অধিকার সে কারো হাতে ছাড়ে নি। আর এইখানেই এই আধুনিকা আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল তার আট বছরের পূর্বসূরী আয়েষার থেকে। গৃহত্যাগিনী সূর্যমুখী ফিরে আসবার পরের দিনই বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করলো সে। পুরোনোকালের পলিগ্যামিস্ট সংস্কৃতির নারীদের মতন নিজের অধিকারের পুরুষকে কারো সঙ্গে ভাগ করে নিয়ে বেঁচে থাকতে সে রাজি নয়। আধুনিকা নারীর মতোই প্রেমিকের ভালোবাসার সঙ্গে সঙ্গে তার ওপরে অখণ্ড অধিকারের দাবীও সে করে। আর তা না মিটলে প্রেমিকের শুভাশুভ, দুঃখ-সুখের পরোয়া না করে নিজের অস্তিত্বকে নিজের হাতে ধ্বংস করবার মতো মানসিক শক্তিরও অধিকারিণী হয়ে উঠেছে সে।

একই মনস্তত্ত্বের প্রতিফলন ঘটেছে হীরার চরিত্রেও। হীরা নষ্টচরিত্র দেবেন্দ্রকে ভালোবেসেছিলো। তারপর একসময় তার কাছ থেকে সামান্য উৎসাহ পেতেই তার কাছে নিজের শরীর বিলিয়ে দিতে সে একমুহূর্ত দ্বিধা করে নি। আবার যখন সে দেখলো দেবেন্দ্র আসলে কুন্দনন্দিনীর প্রতি অনুরক্ত তখন প্রেমিকের হৃদয়ের ওপরে নিজের অধিকার বজায় রাখবার জন্য কুন্দনন্দিনীর জন্য বিষ জোগাড় করে এনে তাকে বিষ খেয়ে মরতে প্ররোচনা দিতেও তার বাধে নি।

তিনটি চরিত্র তিনরকম। সমাজের তিন বিভিন্ন স্তরে তাদের অবস্থান। অথচ কাঙ্ক্ষিত পুরুষটির ভালোবাসায় একচ্ছত্র অধিকার পাবার জন্য তাদের আকুতি অপরিসীম, তার প্রকাশও মোটেই ব্রীড়াকুন্ঠিত কিংবা পুরুষশাসিত সমাজের পুরুষের তৈরি নীতিবোধের বইতে লেখা অনুশাসনের অনুগামী নয়। নিজেদের অনুভুতির বহিঃপ্রকাশের ব্যকরণ তাঁরা নিজেরাই গড়ে নিচ্ছেন। সেখানে ক্লাসিক্যাল ন্যায়-অন্যায়, ধর্ম-অধর্মের জায়গা নিচ্ছে নিজের ইনসটিংকট ও অনুভূতিকে পরিপূর্ণ সম্মান দেয়া। তাতে প্রয়োজন হলে প্রতিদ্বন্দ্বীকে চরম শাস্তি দিতেও পিছপা নয় নতুন যুগের মেয়ে।

এইজন্যেই হীরা দেবেন্দ্রকে সরাসরি বলতে পারে, “আমি আপনার ভালোবাসার তুলনায় কলংককে তৃণজ্ঞান করি। কিন্তু আপনি ভালোবাসেন না, সেখানে কি সুখের জন্য কলংক কিনিব?——-কিন্তু যেদিন আপনি আমাকে ভালোবাসিবেন, সেইদিন আপনার দাসী হইয়া চরণসেবা করিব।”

এইজন্যেই সূর্যমুখী তার বিদায়ী চিঠিতে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে যায়, “আমার স্বামী কুন্দনন্দিনীর হইবেন ইহা চক্ষে দেখিতে পারিব না।” সূর্যমুখী জানত তার প্রতি নগেন্দ্র টান কত গভীর। বিচিত্রগামিনী এই নারীমনটি তাই নগেন্দ্রকে তার লালসা তৃপ্ত করবার উপকরণটি হাতে তুলে দিল বটে কিন্তু সেইসঙ্গে নিজে গৃহত্যাগ করে এমন মর্মান্তিক আঘাত করে গেল যাতে নগেন্দ্র ভোগের বস্তুটি হাতে পেয়েও সুখে ভোগ করতে না পেরে অন্তর্দাহে জর্জরিত হয়। জিয়ন্তে মেরে এমন ভয়ানক শাস্তি বোধ হয় মেয়েরাই দিতে পারে। সূর্যমুখী নিজের এই শক্তিকে চিনতে পেরেছিলো ও নিজের ভালোবাসার অবমাননার এহেন নির্দয় প্রতিশোধ নিতে পেরেছিল অক্লেশে। আর কুন্দনন্দিনীর অধিকারবোধের কথা খানিক আগেই বলেছি। তার পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন।

নিজের চাওয়াপাওয়া পূর্ণ না হলে সুতীব্র, সর্বধ্বংসী হতাশা ও অসাধারণ ধ্বংসক্ষমতায় এই মেয়েরা একই চিরন্তন প্রকৃতির রুদ্রাণীমুখটির প্রকাশ। এ কথা ঠিক যে সমাজের সর্বস্তরে মেয়েদের মনস্তত্ত্বে ঘটতে থাকা পরিবর্তনের কোনো বিশেষ বহিঃপ্রকাশ তখনও খুব বেশি করে ঘটেনি। কিন্তু ভিশনারি সাহিত্যিকের দৃষ্টিতে ঠিকই ধরা পড়েছিলো এহেন পরিবর্তনের সূচনাটি।

মেয়েদের জীবনবোধের এই আগ্রাসী অগ্রগতিকে ফুটিয়ে তোলবার জন্য যে চিরায়ত শাশ্বত নারীচরিত্রটিকে প্রেক্ষাপট হিসেবে ব্যবহার করেছেন বঙ্কিমচন্দ্র তিনি হলেন কমলমণি। রামায়ণের যুগ থেকে শুরু করে উনিশ শতক অবধি যেকোনো সময়ের ভারতীয় সামাজিক প্রেক্ষাপটে খাপ খেয়ে যাওয়া এই মেয়েটি এ-উপন্যাসে যেন অন্যান্য মেয়েদের পরিবর্তন মাপবার জন্য একটি ধ্রুব মানের মাপকাঠি। সচেতন পাঠক খেয়াল করে দেখবেন, কমলমণিকে কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র অন্য তিনজনের মতো অধিকারের ভাগাভাগির পরীক্ষায় একেবারেই ফেলেন নি। ফেললে হয়তো তারও শেষরক্ষা হত না। সেক্ষেত্রে এই ধ্রুব মাপকাঠিটি যেত হারিয়ে। ভয়ে ভয়ে তাকে একান্ত অনুরক্ত স্বামীর আদরের স্ত্রী বানিয়ে রেখে ক্লাসিক্যাল বাঙালি রমণী হয়ে থাকবার কাজটাকে অপেক্ষাকৃত সহজ করে নিয়েছেন।

তবে, এ-উপন্যাসেও কিন্তু জেগে ওঠা অপমানিতা নারী যে কী অপরিমেয় ধ্বংসক্ষমতা ধরে, তার পূর্ণ রূপ ফুটিয়ে তুলতে চাননি বঙ্কিমচন্দ্র। সূর্যমুখীকে ফিরিয়ে এনে, ক্লাসিকাল সুখী সংসারের পথের কাঁটা কুন্দনন্দিনীকে মেরে ফেলে এবং হীরা ও দেবেন্দ্রর মতো সুধীসমাজে একান্তই দুই বেমানানের প্রাণ নিয়ে পাপের পরাজয় ও পুণ্যের জয় ঘোষণা করে দিয়ে উপন্যাসে দাঁড়ি টানলেন তিনি। পরিবর্তনের তিক্ত বড়িটি সমসময়ের সুশীল সমাজকে গলঃধকরণ করাবার জন্য এই মিথ্যা মিষ্টত্বের আশ্রয় তাঁকে নিতে হয়েছে হয়তো। তাই হয়তো তেজের বশে গৃহত্যাগ করবার সাহস সূর্যমুখী ধরলেও অবশেষে ফের সে সেই স্বামীর ঘরেই ফিরে আসে সতীনের অস্তিত্বের অধিকারকে মেনে নিয়েই। নগেন্দ্রর সামান্য উৎসাহ দেখতেই ফের পা মেলে বসে যায় চুলে তেল দিতে। ক্লাসিক্যাল পুরোনো মূল্যবোধের বৃত্তেই ঘুরে ফিরে এসে শেষ হয়ে যায় স্বামীর বহুগামিত্বের বিরুদ্ধে তার ক্ষীণ প্রতিবাদ।

সূর্যমুখী, কুন্দনন্দিনী আর হীরা, বিষবৃক্ষের এই তিন কন্যা পা বাড়িয়ে দিয়েছে বিশ শতকের আগামি আধুনিকত্বের দিকে। অন্যের আগে নিজের সুখকে রাখা ও নিজের অস্তিত্বের অধিকারের ওপরে নিজের সুস্পষ্ট অধিকারের দাবী নিয়ে আধুনিকা হয়ে ফুটে উঠেছে ভালোয় মন্দয় মেশা স্বাধীনচেতা, ভবিষ্যতের এই তিন নারীচরিত্র।

|| চন্দ্রশেখর ||

কুন্দনন্দিনীর চার বছর পরে সৃষ্টি হল শৈবলিনী। আশ্চর্য এই মেয়েটির ভালোবাসা হয়েছিল তার নিজের জ্ঞাতির সঙ্গে। ইনসেস্টুয়াস এই সম্পর্ক পরিণতিবিহীন হবার আশংকায় জ্ঞাতিপুত্র ও প্রেমিক প্রতাপ তাকে নিয়ে গেল ডুবে মরতে। কিন্তু মেয়েটি, যাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতো পৃথিবীতে, তাকে মৃত্যুর পথে এগিয়ে দিয়ে নিজে বেঁচে ফিরেছিলো অক্লেশে। বিবেক তাকে কোনো তাড়না করেনি। তাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন মহাপণ্ডিত চন্দ্রশেখর, কিন্তু শৈবলিনীর মনের খোরাক জোটাতে পারেনি তাঁর শুষ্ক পুঁথির পাতা। শৈবলিনী কিন্তু চারুলতার মতো শিক্ষিত মধ্যবিত্তের বৈদগ্ধ-আবৃত সূক্ষ্ম পরকিয়ায় এর প্রতিকার খোঁজেনি। তার বদলে সমাজ, সংসার, সামাজিক সত্য, ন্যায়–এই সবকিছুর ঊর্ধ্বে আপন ভালোবাসার সত্য ও তাড়না তাকে এরপর চালিয়ে নিয়ে গিয়েছিল দয়িতমিলনের এক আশাহীন আলোহীন বন্ধুর পথে। সে পথে চলতে গিয়ে সে অবলীলায় খেলা করেছে চন্দ্রশেখরের মতো চরিত্রবলযুক্ত জ্ঞানী মানুষ থেকে শুরু করে লরেন্স ফস্টারের মতো রূপলোভী শ্বেতাঙ্গকে নিয়ে। তাদের অবলম্বন করে বেয়ে উঠে উঠে সে বারংবার তাদের পরিত্যাগ করে তার সর্বনেশে ভালোবাসার সন্ধানে গিয়েছে, আর বারংবার ভালোবাসার মানুষটিকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে সমাজ-সংসার-ভাগ্য সবকিছুকে নিষ্করুণ পরিহাস করে উন্মাদ নিয়তির চরিত্র নিয়েছে সে নিজে। কাহিনীর শেষে এসে দেখি, সেই অনিবার্য নিয়তিরূপিণী মেয়েটি অবশেষে তার শিকারকে, তার একান্ত ভালোবাসার জন প্রতাপকে চূড়ান্ত উত্তেজিত করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে সক্ষম হয়েছে।

এই গল্পে বঙ্কিমচন্দ্রের নায়িকা সাধারণ সামাজিক যৌক্তিকতার সীমা ছাড়িয়ে অন্ধ প্রকৃতির আসনটি দখল করে বসেছে। ইন্সটিংক্‌টের প্রবল তাড়নায় সে কেবল যেকোনো মূল্যে এগিয়ে যেতে চায় তার ভালোবাসার মানুষের কাছে, আর তারপর কোনো গভীরতর ও আদিমতর ইন্সটিংক্‌টের তাড়নায় নিজেকেই তার সেই দয়িতের মৃত্যুর কারণ করে তোলে, বারবার। কাহিনীর প্রথম পর্বে দেখেছিলাম, প্রতাপকে মরতে দিয়ে কত অক্লেশে শৈবলিনী ফিরে এসেছিল। কাহিনীর শেষপর্বে এসে দেখছি, শৈবলিনীকে যখন ঘরে নিয়ে চলেছেন চন্দ্রশেখর, সেই মুহূর্তটিতেও ভালোবাসার শেষ বিষচুম্বনটি সে দিয়ে গেল প্রতাপের আত্মায়। মুহূর্তের জন্য উন্মত্ততার খোলশ ছেড়ে বের হয়ে এল তার চেতনা, তারপর নিষ্করুণ গলায় জানিয়ে দিল তাকে ভালোবাসবার অমোঘ দণ্ডটি—“আমি সুখী হইব না। তুমি থাকিতে আমার সুখ নাই–”

এরপর প্রতাপ সজ্ঞানে নিজের মৃত্যুদণ্ড দেয়, এক অসম যুদ্ধে নিজেকে বলি হিসেবে প্রদান করে। চন্দ্রশেখরের শুষ্ক পাণ্ডিত্যের সংসারে শৈবলিনী নিজে বেঁচে থাকবে হয়ত, কিন্তু তার প্রতাপকে সে নিজে না পেলে অন্য নারীর হাতেও তুলে দিতে পারবে না। এজন্য প্রতাপকে বলি দিতেও তার বিন্দুমাত্র দ্বিধা হয় নি।

অন্ধপ্রকৃতির মূর্তরূপ হিসেবে গড়ে তোলা এই অসাধারণ নারীচরিত্রটি কেবল বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসেই নয়, সাহিত্যের বিস্তৃত আঙিনাতেও বিরল। কাহিনীটি সাহিত্যরচনারীতি ও বিষয়নির্বাচনের দিক থেকে অতি আধুনিক ও দুঃসাহসী হলেও এই নারীচরিত্রটি কিন্তু কালনির্ভর নন। সভ্যতার ইতিহাসে বিভিন্ন কালপর্বে এই সর্বনাশিনীরা এসেছেন। তার প্রমাণ রয়ে গেছে গ্রিক ট্র্যাজেডির পাতা থেকে শুরু করে তিষ্যারক্ষিতার গল্প কিংবা রাজতরঙ্গিণীর রানি দেদ্দার কাহিনীতে।

|| সীতারাম ||

এবারে শ্রীর কথা। বঙ্কিমচন্দ্রের শেষ উপন্যাস সীতারাম প্রকাশিত হয় ১৮৮৬-৮৭ নাগাদ। এ উপন্যাসের নায়ক হিন্দুকুলপ্রদীপ মুসলমানত্রাস সীতারামের ধর্মপত্নী ছিলেন শ্রী। জ্যোতিষীর নিদানে তাঁকে প্রিয়জনের প্রাণহন্ত্রী দুর্ভাগিনী এই বদনাম দিয়ে স্বামীকুল থেকে বিতাড়ন করা হয়েছিলো। যুবতী হবার পর এক বিচিত্র পরিস্থিতিতে সেই স্বামীর মুখোমুখি হয়ে তিনি সরাসরি ঘোষণা করেন, “আমি তোমার বিবাহিতা স্ত্রী, তোমার সর্বস্বের অধিকারিণী–আমি শুধু তোমার দয়া লইব কেন?”

তবু সীতারাম তাকে ফিরে গ্রহণ করলেন না। পুর্ণযুবতী রূপসী শ্রীকে দেখে ক্ষণিকের মোহে একবার তাকে ফিরে নেবার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সেই সাক্ষাৎকারের ঠিক আগে মুসলমানের সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালীন শ্রীর বীরাঙ্গনামূর্তিটি পুরুষটিকে কামনাতুর করে তুলেছিল এই একদাপরিত্যক্ত স্ত্রীর প্রতি। সে প্রস্তাবের মধ্যে তাই তাৎক্ষণিক কামনার মোহ থাকলেও প্রকৃত ভালোবাসার আকুতি ছিলো না। সীতারামের ঘরে তখন আরও দুই স্ত্রী।

শ্রী রাজি হন নি সীতারামের প্রস্তাবে। অতএব শ্রী বিদায় হলেন, আর সীতারাম, কামনাতাড়িত আর দশটি পুরুষের মতনই চতুর্দিক তোলপাড় করে খুঁজতে শুরু করলেন প্রার্থিত কামনার বস্তুটিকে। কামনাচরিতার্থের বাসনা ছাড়াও শ্রীকে ফিরিয়ে আনবার জন্য আরও একটা মোটিভেশন কাজ করছিল সীতারামের মনে। এটা অবশ্য নিতান্তই মানবিক চাতুরির লক্ষণ। সেটা হলো নিজের ক্ষমতাবৃদ্ধির লড়াইতে শ্রীর সদ্য দেখা ক্যারিসমাকে ব্যবহার করা।

বহু খুঁজেপেতেও শ্রীকে উদ্ধার করতে না পেরে সীতারাম আবার ফিরে গেলেন নিজের জীবনবৃত্তে। রজোগুণসমৃদ্ধ পুরুষ তিনি। জীবনকে উপভোগ করতে জানেন। তুচ্ছ একটা স্মৃতি নিয়ে আঁকড়ে পড়ে থাকা তাঁর শোভা দেয় না। কিন্তু প্রকৃতির বিচিত্র লীলায়, তাঁর অবচেতনে এই অদেখা নারীটির প্রতি কামনা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠে এক বিস্ফোরণমুহূর্তের অপেক্ষায় ছিল।

ওদিকে স্বামীর ঘর করতে না পেরে স্বামীর ওপর অধিকার অন্যের হাতে ছেড়ে দিতে বাধ্য হলেও শ্রী কিন্তু আয়েষার মতন সেই না-পাওয়াকে নতশিরে মেনে নেন নি, সূর্যমুখীর মতো উদ্দেশ্যবিহীনভাবে ঘর ছেড়ে ভিখারিণীও হন নি, অথবা কুন্দনন্দিনীর মতন আত্মঘাতীও হন নি। শৈবলিনীর মতো অন্ধ ইন্সটিঙ্কটের বশবর্তী হয়ে উন্মাদ হয়ে প্রিয়নিধনের রাস্তাও খোঁজেন নি বারংবার। যুক্তি-বুদ্ধির সোজা পথ ধরে এগিয়ে গিয়েছেন সামনের দিকে। নিজের অধিকার থেকে বঞ্চিত হলে সুতীব্র আবেগসর্বস্ব যে-সমস্ত প্রতিক্রিয়ায় অভ্যস্ত ছিলেন আগের উপন্যাসগুলির নায়িকারা, শ্রী চললেন তার বিপরীত পথে।

তাঁর দেখা আমরা ফের যখন পেলাম তখন উড়িষ্যার বৈতরণী নদীর ধারে দাঁড়িয়ে পরিব্রাজিকা শ্রী সে-নদী পার হবার উদ্যোগ করছেন। অকারণ দুঃখের উচ্ছসিত বহিঃপ্রকাশ নেই, পতিহারা সতীর অসহায়তা কিংবা জীবনবিমুখতার কোনো চিহ্নই নেই তাঁর আচার আচরণে। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ যেন কেবলই আর একটি দুঃখের স্মৃতি, কিন্তু ‘পতিহারা এ জীবন আর রাখিয়া কী করিব’ মার্কা উনিশ শতকীয় নাটুকেপনার কোনো চিহ্নই নেই তাঁর মধ্যে। পতিবিচ্ছেদের ওপারেও যে একটা জীবন আছে, সেটাকে অনুভব করতে শিখেছেন শ্রী। ঔপন্যাসিক-জীবনের একেবারে শেষপ্রান্তে এসে নিজের সৃষ্ট নারীচরিত্রকে এইবার হিন্দু বিবাহের কট্টর ক্যাথলিসিজমের শিকল ছিঁড়ে তার বাইরেও জীবনকে অন্যভাবে উপভোগ করবার মন্ত্র শেখাতে পেরেছেন বঙ্কিমচন্দ্র। আগামীদিনের সমাজের প্রগতিশীল নারীচরিত্রের এই নির্যাসটুকুকে তুলে এনে শ্রীর চরিত্রে আরোপ করে তাকে উত্তর আধুনিক মানসিকতা দিয়েছেন তিনি। বিষবৃক্ষের নারীচরিত্রকে যদি বঙ্কিমচন্দ্রের সৃষ্ট আধুনিক নারীচরিত্রের দ্বিতীয় প্রজন্ম বলে ধরি তাহলে তার দীর্ঘ চোদ্দ বছর পরের এই লেখায় এইভাবেই সৃষ্টি হল তার পরবর্তী প্রজন্মের উত্তর রেনেসাঁ মানসিকতার নারীচরিত্র, বাস্তবে যাঁদের আবির্ভাব দেখবার জন্য এ দেশের সমাজকে তখনও অপেক্ষা করতে হবে আরও বহুকাল।

ফিরে আসি গল্পে। আধ্যাত্মিক জগতে নিজে দীর্ঘ এক আনন্দময় জীবন কাটিয়ে শ্রী আবার ফিরে এলেন সীতারামের জীবনে, এক সর্বনাশিনী মহাসাধ্বীর রূপ ধরে। আপাতদৃষ্টিতে স্বামীর মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী সেই পরিণতবুদ্ধি নারী এইবারে সীতারামের সুখী ও সমৃদ্ধ জীবনকে এক বিচিত্র পথে ছারখার করে দেবার জন্য তাঁর নেমেসিস হয়ে আবির্ভূত হয়েছেন। দেশের ও দশের মঙ্গল তাঁর কাছে তুচ্ছ। ধীরে ধীরে, সর্বজনশ্রদ্ধেয়, সুখী, সংসারী মানুষটির মহত্ত্বের খোলশ ছাড়িয়ে তাঁর ভেতরের সুপ্ত কামনাকে ফের জাগিয়ে তুললেন তিনি, আর তারপর ট্যান্টালাসের কাপের মতো সর্বক্ষণ তাঁর সান্নিধ্যে থেকেও নিজেকে অধরা রেখে রেখে, তিলে তিলে এক কর্তব্যজ্ঞানরহিত, চরিত্রবলহীন ইতরজীবের সমতুল্যে বদলে দিলেন তাঁকে। সীতারামের আত্মা ধ্বংস হলো প্রথমে। তারপর একে একে স্বপ্নের মতো ভেঙেচুরে গুঁড়িয়ে গেল তাঁর রাজত্ব, সম্মান ও পরিবার।

প্রকৃতিকে অবজ্ঞা করলে সে বড় ভয়ংকরভাবে তার প্রতিশোধ নেয়। আজকের উন্নতির চূড়ায় থাকা সভ্যতা, তার সামান্য অঙ্গুলিহেলনে কাল বদলে যায় প্রাণহীন মরুভূমিতে। মানুষের ইতিহাসে বারে বারে আমরা তার উদাহরণ দেখেছি। অবজ্ঞায় অপমানিত প্রকৃতির মতোই নিষ্করুণভাবে শ্রী-ও সীতারামের ওপর তাঁর প্রতিশোধ নিলেন সেই একইভাবে, আর তারপর যেমন এক ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হয়েছিলেন, তেমনভাবেই ফের সীতারামের জীবন থেকে হারিয়ে গিয়ে ফিরে গেলেন নিজের তৈরি করা আপন জীবনবৃত্তে। আর, এই উত্তর আধুনিক চরিত্রসৃজনটির মধ্যে দিয়েই সম্পূর্ণ হলো বঙ্কিমসৃষ্ট নারীচরিত্রদের বিবর্তন।

ওপরের উপন্যাসগুলোর নারীচরিত্রদের আরো একটা উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তারা কেউ কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন জীবনের পরিচিত নারীচরিত্র নন। রোজকার আটপৌরে বাস্তবতার সুপরিচিত গন্ধ মাখানো নেই তাঁদের কারো শরীরেই। বিষবৃক্ষ বাদে বাকি তিনটে উপন্যাসের ঘটনাকাল স্থাপিত হয়েছে দূর অতীতে। বিষবৃক্ষের সূর্যমুখী বা কুন্দনন্দিনীকেও বঙ্কিমচন্দ্রের সমসময়ের কোনো সুধী পাঠক হলফ করে পাশের বাড়ির বউ-ঝি টি বলে দাবি করবেন না। এঁরা সকলেই সমসময়ে অ-তুলনীয়া। কেন? ব্যাপারটা কিঞ্চিৎ প্রণিধানযোগ্য।

যে সময়ে বঙ্কিমচন্দ্র এই উপন্যাসগুলি লিখছেন উনিশ শতকের সেই দ্বিতীয়ার্ধে, বাঙালির অন্তঃপুরের দরজা তখনও সেভাবে সমাজের উঠোনের দিকে হাট করে খুলে যায়নি। চিকের আড়াল থেকে মাঝে মাঝে পরপুরুষমহলে অন্তঃপুরিকাদের আনাগোনা শুরু হলেও সেটা তখনো ব্যতিক্রম, সাধারণ নিয়ম নয়। অথচ আগামি অবশ্যম্ভাবী পরিবর্তনের লক্ষণগুলো সে সময়েই তার সমাজশরীরে ফুটে উঠতে শুরু করেছে। মেয়েরা আরো বেশি সংখ্যায় পড়াশোনা শিখছেন। ব্রতকথা ও গুরুজনস্থানীয়ার উপদেশ বাদেও যে শেখবার আরো কিছু উপকরণ ছড়িয়ে রয়েছে বাইরের দুনিয়াটাতে সেই বিষয়ে ক্রমশই আরো বেশি করে সচেতন হয়ে উঠছেন তাঁরা। শহরবাসী স্বামীর সংসার সামলানোর প্রয়োজনে পুরোনো পরিবারতন্ত্রের গণ্ডি ছাড়িয়ে স্ত্রীরা এসে উঠছেন স্বামীর শহরের বাসায়। সে সংখ্যা ক্রমশই বেড়ে চলেছে তখন। নিউক্লিয়ার পরিবারের নিভৃতে নারীপুরুষের মধ্যে সম্পর্কের নতুন রসায়ন সৃষ্টির সে কাজ এগিয়ে চলেছে প্রভূত সমালোচনাকে অগ্রাহ্য করে। তার ওপর, বৃটিশ প্রভুদের দৈনন্দিন জীবনের সংস্পর্শে আসা, ও পশ্চিমী সাহিত্য-দর্শনের স্পর্শ পাওয়া বাঙালি পুরুষ স্ত্রীকে তাঁর পরিবারের একটি সন্তান উৎপাদক যন্ত্রাংশের বাইরে এনে নিজের বান্ধবী ও প্রেমিকার রূপেও দেখতে চাইছেন।

পুরুষশাসিত সমাজ, এই পরিবর্তনের মুখোমুখি হবার জন্য শাসনের পাশাপাশি ছাপাখানাকেও একটা বড় হাতিয়ার করে ব্যবহার করতে শুরু করেছে তখন। অজস্র প্রবন্ধ ও পুস্তিকাতে, ব্যঙ্গ রচনায় তখন চলেছে নব্য সমাজব্যবস্থায় মেয়েরা যাতে তাদের পরিচিত ভূমিকা ছেড়ে একেবারে ভেসে না যায় সেটা নিশ্চিত করবার চেষ্টা। মিস বিনো বিবি, বিধবাবিবাহ নাটক, বঙ্গগৃহ, মেজো বৌ, সুলোচনা, গৃহলক্ষ্মী ইত্যাদি অসংখ্য সাহিত্যকীর্তির নাম করা যায় এ প্রসঙ্গে। ক্রয়ক্ষমতা তখনও পুরোপুরি পুরুষের হাতে থাকা ও আসন্ন পরিবর্তনের পদধ্বনি শুনে পুরুষসমাজের এক ক্ষীণ নিরাপত্তাহীনতার বোধে ভোগা এই দুই কারণে সেসব বইয়ের বাজারও তখন বেশ ভালো।

এহেন পরিস্থিতিতে, রেনেসাঁ-উত্তর সমাজ ও সংসারে পুরুষের পোষ্য জীবের থেকে আত্মচেতনা সম্পন্ন ও দোষেগুণে মেশা পূর্ণ মানুষের ভূমিকায় মেয়েদের উত্তরণের গল্প শোনাতে বসেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র। তাতে সমসময়ের পরিচিত সাংসারিক পরিবেশ থেকে চেনা মেয়েদের বেছে নিতে গেলে একটা শক্ত বাধা আসা স্বাভাবিক ছিল। সেক্ষেত্রে লেখাগুলির গ্রহণীয়তা আঘাত পেতে পারত। শৈবলিনী যদি ১৮৭৫ সালে ‘বাগবাজারের সওদাগরি হৌসের কেরাণি বিপিনবাবুর কনিষ্ঠ কন্যা’ হতেন ও মেয়েস্কুলে পড়া শেষ করে তারপর আপন জ্ঞাতির সঙ্গে প্রেম করে আউটরাম ঘাটে ডুব দিয়ে মরতে যেতেন তাহলে দেশ জুড়ে যে ছিছিক্কারের বন্যা বইতো তার ধাক্কা সামলে চন্দ্রশেখর উপন্যাস হয়তো উঠে দাঁড়াতে পারত না সেই মুহূর্তের সমাজে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে মৃত অতীতের নিরাপদ আশ্রয়ে (অথবা নাগরিক সভ্যতার থেকে দূরে গোবিন্দপুর নামের কোনো অজ্ঞাতকুলশীল দিকশূন্যপুরে) রঙ্গমঞ্চটি খাটিয়ে দৈনন্দিন ডালভাতের রিয়েলিজম থেকে একটু দূরে সরে দাঁড়িয়ে এ ধরনের চরিত্রগুলো তৈরি করাটাই একজন বুদ্ধিমান লেখকের উপযুক্ত কাজ। বঙ্কিমচন্দ্র সেই কাজটাই নিপুণভাবে করেছেন এই লেখাগুলোতে। তাঁর নারীচরিত্রগুলি তাই অতীতের আবরণে ভবিষ্যতের আধুনিক মেয়ের দল, যারা নিজের অধিকার বুঝে নিতে একবিন্দু কুন্ঠিত হয় না। শিক্ষায়-দীক্ষায়, আচারে, ব্যভিচারে যারা সর্বদাই পুরুষের সঙ্গে সমান অধিকার দাবী করে চলে। একই সঙ্গে প্রতিটি লেখায় রয়েছে আধুনিক হয়ে ওঠা বঙ্গসমাজের প্রতি তাঁর সাবধানবাণী। মেয়েদের নিয়ে পুরুষের পুতুলখেলার দিন শেষ হয়েছে। নিজেদের অভাবনীয় শক্তি সম্পর্কে সচেতন ও প্রয়োজনে তা প্রয়োগে অকুন্ঠ নতুন যুগের যে মেয়েরা আসছে তারা আর পুরুষের হেলাফেলার খেলার সামগ্রী হয়ে বাঁচবে না। প্রয়োজনে শস্ত্রধারিণী হয়ে রুখে দাঁড়াতেও পারে সে। তাকে সাবধানে মানুষ করতে হবে এবং উপযুক্ত সম্মান দিয়ে চলতে হবে, নইলে ঘরে ঘরে বিষবৃক্ষের অংকুরোদ্‌গম হবে, বলশালী মহান পুরুষও কুঠারাহত মহীরুহের মতো ছিন্নমূল হয়ে লুটিয়ে পড়বেন কোমল দুটি হাতের বজ্রকঠিন আঘাতে। একটা উদাহরণ দিয়ে এ প্রসঙ্গে ইতি টানবো। শৈবলিনীর যে ছবিটা বঙ্কিমচন্দ্র এঁকেছেন সেখানে দেখছি তার বড়ো হয়ে ওঠবার কালে পারিবারিক ট্র্যাডিশনাল বিধিনিষেধ বা শিক্ষাদীক্ষার বাধা ততটা ছিল না। কারণ, তা যদি থাকতো তাহলে জ্ঞাতিপুত্রের সঙ্গে প্রেমটা এভাবে তৈরি হয় উঠতে পারতো না। বিবাহিত জীবনেও উদাসীন স্বামীর সঙ্গে এক নিউক্লিয়ার পরিবারে বাস করায় তার সামাজিক জীবনধারণের সঠিক শিক্ষা হয় নি। মনস্তত্ত্বের ভাষায়, প্রবৃত্তি দমনকারী যে সুপার ইগো গড়ে ওঠে ছোটবেলা থেকে আরোপিত বিবিধ সামাজিক ও পারিবারিক বিধিনিষেধ ও মূল্যবোধের শিক্ষায়, সেই সুপার ইগো গড়ে তোলবার কোনো সুযোগ আসেনি তার জীবনে। ফলত প্রবৃত্তির দাস হয়ে সে একাধিক জীবনে সর্বনাশ ডেকে আনল। সমাজ সচেতন সতর্ক বঙ্কিমচন্দ্র এ উপন্যাসগুলিতে এহেন বিভিন্ন সাবধানবাণী দিয়ে গিয়েছেন তখনও গড়ে উঠতে থাকা এক নব্যবঙ্গীয় সমাজকে।

দ্বিতীয় পর্ব
রবীন্দ্রনাথ
 

উনিশ শতকের লেখকের কাছে জীবনের সংজ্ঞা ছিল কামনা ও অপূর্ণতা, মিলন ও বিরহ, মৃত্যু ও জন্ম–ইত্যাদি কিছু ঘটনা ও অনুভূতির একটি স্রোতমাত্র। জীবন নামের ধারাটা তাই তাঁদের দৃষ্টিতে গিয়ে মিলত মিলনের মধুরতায় অথবা মৃত্যুর সমাধিক্ষেত্রে। বিশ শতকের গোড়ায় জীবনকে নিয়ে সেই সরল ধারণা ক্রমশ বদলাতে শুরু করে। দৃষ্টির আড়ালে যে গভীর গোপন মনের রসায়ন নীরবে সেই বহিরঙ্গের স্রোতের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে চলে, মগ্নচৈতন্যের সেই লুকোনো কারখানার সন্ধানে নেমেছেন মনস্তাত্ত্বিক, সমাজতাত্ত্বিক থেকে শুরু করে সৃজনশীল সাহিত্যিকরাও। সেখানে অন্ধ প্রবৃত্তির দল ক্রমাগত একে অন্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে চলে, আঘাত করে, আঘাত পায়, আর সেই আদিম সংগ্রামের ক্রমাগত মন্থনের মধ্যে দিয়ে বহিরঙ্গের চেতনার দৃষ্টির আড়ালে সৃষ্টির একটা প্রক্রিয়া চলতে থাকে। মগ্নচৈতন্যের সেই নতুন দুনিয়াটা তখন ধীরে ধীরে প্রকাশ পেয়ে চলেছে সৃষ্টিশীল রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যে। বঙ্কিমী সমাজের তুলনায় উন্মুক্ততর একটি সমাজের মানুষ হিসেবে রবীন্দ্রনাথ প্রাচ্যের (এবং প্রতীচ্যেরও) মেয়েদের আরো কাছে থেকে অনেক বেশি অভিনিবেশ সহকারে পর্যবেক্ষণ করবার সুযোগ পেয়েছিলেন। ফলত এই নতুন জগতটিকে ভালোভাবে অনুধাবন করবার উপায়টাও তাঁর ছিল।

পরিবর্তিত জীবনবোধের এই শতাব্দিতে সদ্য ঘর ছেড়ে বাইরের জগতের সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠা বাংলার মেয়েরা কীভাবে দুঃখে-সুখে, আনন্দে-বেদনায়, আঘাতে-আনন্দে, মিলনে-ট্র্যাজেডিতে উথালপাথাল হতে হতে নিজেদের জন্য একটা সুষ্ঠু পথ খুঁজে নিতে চাইছিল সেটিকে আমরা এবার তাঁর ছটি প্রধান উপন্যাসের নারীচরিত্রদের অবলম্বন করে দেখবার চেষ্টা করব।

|| চোখের বালি ||

বঙ্কিমচন্দ্রের সীতারাম উপন্যাস লেখবার মাত্রই দেড় দশক পরে ১৯০২ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন তাঁর ‘চোখের বালি’ উপন্যাসে হাত দিলেন, সামাজিক পরিস্থিতি ততদিনে অনেকটাই পালটে গিয়েছে। রবীন্দ্রনাথের নিজের কথায়, “শয়তানের হাতে বিষবৃক্ষের চাষ তখনো হত, এখনো হয়, তবে কিনা তার ক্ষেত্র আলাদা—-এখনকার ছবি খুব স্পষ্ট, সাজসজ্জায় অলংকারে তাকে আচ্ছন্ন করলে তাকে ঝাপসা করে দেওয়া হয়, তার আধুনিক স্বভাব নষ্ট হয়। গল্পের আবদার যখন এড়াতে পারলুম না তখন নামতে হোল মনের সংসারের সেই কারখানা-ঘরে যেখানে আগুনের জ্বলুনি হাতুড়ির পিটুনি থেকে দৃঢ় ধাতুর মূর্তি জেগে ওঠে—-”

একমাত্র ছেলে মহেন্দ্রকে আগ্রাসী স্নেহের অধিকারবোধে আঁকড়ে রেখেছিলেন রাজলক্ষ্মী। তার ব্যক্তিত্ত্বের বিকাশ ঘটিয়ে পূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠবার সুযোগ তিনি দেন নি কখনো। একদিন সেই অধিকারবোধের দেয়ালে এসে যৌবনাস্ত্রের ঘায়ে অবহেলায় ফাটল ধরিয়ে দিল পুত্রবধু আশা। অধিকারের পুরুষসন্তানটি, প্রতিদ্বন্দ্বিনী যুবতীর কাছে খোওয়া যেতে, তীব্র ঈর্ষায় তাকে দূরে ঠেলে দিয়ে সংসারের স্বাভাবিক নিরাপত্তা বলয়ে যে কালছিদ্রটি তৈরি করে দিলেন রাজলক্ষ্মী সেই পথে চির অপরিণত করে রাখা মহেন্দ্রের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা প্রবৃত্তির পশুটা প্রথম সুযোগেই দাঁত নখ বের করে বের হয়ে এসেছিলো।

এই সময়টিতে বিধবা বিনোদিনী তার শরীর ও মনের একরাশ অপূর্ণ ক্ষিদে নিয়ে এসে উঠল মহেন্দ্রর বাড়িতে। এ মেয়ে ভাগ্যকে মেনে নিয়ে নিজের প্রবৃত্তিকে মেরে ফেলতে শেখেনি। নিজের পুরুষসঙ্গকামনাকে পাপ বলে দমন করে নিজের সঙ্গে অসততা করল না বিনোদিনী। পশ্চিমী জীবনদর্শনের প্রভাব তখন এ দেশে আধুনিকতার যে একটা সংজ্ঞা গড়ে তুলছিলো, তার সূত্র মেনে সটান এগিয়ে এলো সে তার কামনার বস্তুটিকে ছিনিয়ে নিতে। ব্যক্তি হিসেবে মহেন্দ্র তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। আশার কাছে এসে তার প্রথম নজর যায় আশার বিছানাটির দিকে। ওই বিছানায় এই মেয়েটির অকুন্ঠ অধিকারটি হয়ে ওঠে তার একান্ত কামনার বস্তু। এই শোবার ঘরটি যে তার হতে পারত কিন্তু হয় নি এটাই তার লোভ ও হিংসার কারণ। এর পক্ষে বারংবার সে তার অলজ্জ যুক্তি সাজিয়েছে–আমি দেবী নই। আমি কী জড়পদার্থ? আমি কি মানুষ নই? আমি কি মেয়েমানুষ নই? ভাগ্যের হাতে নিজেকে ছেড়ে দিয়ে মানুষ হিসেবে বা নারী হিসেবে তার যা পাওনাগণ্ডা সেসব বুঝে না পেয়েই মুখ বুঁজে জীবনটা কাটানোকেই ধর্ম বলে মেনে নেয়াটা এদেশের চিরায়ত সংস্কৃতি। তাকে অস্বীকার করে, পশ্চিমী সংস্কৃতির এগিয়ে এসে অধিকার ছিনিয়ে নেয়ার আধুনিকতাকে সোল্লাসে এবং বিনাপ্রশ্নে বরণ করল বিনোদিনী। তার সুতীব্র ফেমিনিনিটিকে রোখবার মতো মানসিক ক্ষমতা ছিল না প্রথমে মায়ের কোলের, ও তারপর বউয়ের আঁচলধরা বালকপুরুষ মহেন্দ্রর। নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে বিনোদিনী একসময় রাজলক্ষ্মীর প্রকৃত পরিচয়ও প্রকাশ করে দিয়েছে—“ফাঁদ আমিও কতক জানিয়া ও না জানিয়া পাতিয়াছি, ফাঁদ তুমিও কতকটা জানিয়া ও না জানিয়া পাতিয়াছ। আমাদের জাতের ধর্ম এইরূপ—আমরা মায়াবিনী।” আধুনিকতা শব্দটির অর্থ সে সময় হয়ে উঠেছিলো পশ্চিম থেকে আমদানি করা জীবনবোধকে বিনাপ্রশ্নে অনুকরণ। প্রাচ্যপ্রতীচ্যের এই যে সাংস্কৃতিক তলোয়ারবাজি, রবীন্দ্রনাথকেও তা বারংবার উদ্‌ব্যস্ত করেছে। পশ্চিমী জীবনদর্শনের অক্লান্ত, অশান্ত জীবনচাঞ্চল্য তাঁর প্রাচ্যসুলভ শান্ত ও ধীর জীবনদর্শনকে যে ক্রমাগত আঘাত করে, সে কথা তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন প্রমথ চৌধুরীকে ১৮৯১ সাল লেখা একটি চিঠিতে।

এই দুইয়ের ঘাতপ্রত্যাঘাতে আধুনিকতার যে সংজ্ঞাটি রবীন্দ্রনাথের মনে গড়ে উঠেছিলো তার বহিঃপ্রকাশ ঘটল চোখের বালিতেই, বিনোদিনীর মহেন্দ্রবিজয় সমাপ্ত হবার পর। তার সংসারকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিয়ে, প্রতিদ্বন্দ্বী আশা ও রাজলক্ষ্মীকে চূড়ান্ত পর্যূদস্ত করবার পর দেখা গেল, সে যুদ্ধের যে ট্রোফি মহেন্দ্র, তার প্রতি বিনোদিনীর আর কোনো আগ্রহ বাকি নেই। মহেন্দ্রর পাশাপাশি বিহারীর আনুগত্যও সে জয় করেছিল বহুবিধ ছলে। তরলচরিত্র মহেন্দ্রর জন্য শুধুমাত্র নারীসুলভ যৌন আকর্ষণই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু কঠোর, নীতিবান পুরুষ বিহারীকে দখল করবার জন্য তাকে আরো নানাবিধ রূপ ধরতে হয়েছে। আদর্শ, করুণা, সখীত্ব ও নারীত্ব এই সবগুলি অস্ত্র তূণ থেকে বের করে তবেই সে বিহারীকে আকর্ষণ করতে পেরেছিল নিজের দিকে। এটি করতে গিয়ে বিনোদিনীর প্রকৃত আকর্ষণ গড়ে উঠেছিল বিহারীর দিকেই। বিহারী সেই ধরনের নীতিবান পুরুষ যে একটি মেয়েকে জীবনে গ্রহণ করলে তাকে উপযুক্ত সম্মান ও নিশ্চয়তা দিতে পারে। ভোগে ও ভালোবাসায় তফাত সম্পর্কে সচেতনতাটা তার চরিত্রের মধ্যেই গাঁথা রয়েছে।

রবীন্দ্রভাবনায় আধুনিক নারী তাই একদিকে ইন্সটিঙ্কটের তীব্রতায় প্রয়োজনে সব সুন্দরকে ধ্বংস করে নিজের আকাঙ্ক্ষার বস্তুকে ছিনিয়ে নেবার প্রিডেটরি আধুনিকতার প্রতিভূ, আবার অন্যদিকে নিজের জীবন গড়বার জন্য সে আশ্রয় চায় সেই পুরুষের কাছে, যে তাকে তার উপযুক্ত সম্মান, শান্তি আর নিরাপত্তা দিতে পারবে। তেমন পুরুষকে চিনে নিতে ও একবার চিনতে পারলে বাকি সব তুচ্ছ করে তার কাছে গিয়ে আত্মসমর্পণ করতেও সে একই রকম নিঃসংকোচ। এটাই স্বাভাবিক। মেয়েরা সন্তানধারণ ও পালন করে একটা জাতির ধারাবাহিকতাকে বজায় রাখে। সেজন্য সংসারজীবনে নিরাপত্তার সন্ধান তার প্রকৃতিদত্ত প্রবৃত্তি, তার প্রজাতিগত সারভাইভাল ইনসটিংকট। মেয়েদের আধুনিকতার সংজ্ঞা তৈরি করতে গিয়ে তাই রবীন্দ্রনাথ তার সঙ্গী বা মেটিং পার্টনার নির্বাচনপদ্ধতিতে পশ্চিমী আধুনিকতার অ্যাগ্রেসিভ ও প্রয়োজনে নীতিহীন প্রবৃত্তির পাশপাশি নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতার অনুসন্ধানটিকেও জুড়ে দিয়েছেন। এই আপাত বৈপরিত্যের কারণটা ব্যাখ্যা করা হয়েছে মনস্তত্ত্বের বিবিধ গবেষণায়। কিন্তু সে অনেক বিস্তৃত আলোচনার ক্ষেত্র।

|| চতুরঙ্গ ||

‘চোখের বালি’র ১৩ বছর পরে লেখা চতুরঙ্গের ননীবালা কিন্তু এক আশ্চর্য বৈপরীত্যে উজ্জ্বল হয়ে থাকে। আধুনিকা সে হয়ে উঠতে পারেনি। এক অভাগা দুশ্চরিত্রের প্রেমকে স্বীকার করে নিয়ে সে সতীত্বের চিরকালের আদর্শে স্থিত থেকে এক সুন্দর ও কাম্য পুরুষের সঙ্গে উজ্জ্বল ভবিষ্যতকে অস্বীকার করে আত্মঘাতিনী হয়েছিল। মহৎ সাহিত্যের লক্ষণ এই। ঈশ্বরের মতোই সাহিত্যিক এখানে তাঁর নিজের আদর্শকে চরিত্রের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে তাদের নিজের মতন বাড়তে ও পরিণতি পেতে দেন। ননীবালাকেও তিনি নিজের পথে চলতে বাধা দেননি কোনো।

কিন্তু এই চতুরঙ্গের দামিনীই আবার গড়ে উঠেছিল সেই রাবীন্দ্রিক আধুনিকতার সংজ্ঞা মেনেই। কিন্তু বিনোদিনীর তুলনায় সে নারীচেতনা বহুগুণে উদ্বর্তিত। স্বামীসুখ দামিনী পায়নি। অপ্রার্থিত অধ্যাত্মবাদের ভূত হয়ে লীলানন্দস্বামী যখন তার দুনিয়ায় এসে চেপে বসে তার মুখ ফিরিয়ে দিতে চাইলেন মর্ত্যলোক থেকে দেহাতীত অমর্ত্যলোকের দিকে তখন সে দাঁতনখ বের করে লড়াই করেছিল সেই প্রবৃত্তিবিরোধী চেষ্টার সঙ্গে। তারপর তার জীবনে শচীশ এলো। সে অতি দূরের মানুষ। আকাশের রামধনুটির মতো। তার দিকে আকৃষ্ট হল দামিনী। শচীশকে আকর্ষণ করবার মতো ইন্টেলেকচুয়াল ক্ষমতা তার নেই। তাই গুহার ভেতরে রাতের অন্ধকারে চক্ষুকর্ণহীন এক আদিম ক্ষুধার্ত জন্তুর মতোই সে মূর্তিমান ক্ষিদের পুঞ্জ হয়ে শচীশের শরীরকে আশ্রয় করতে চেয়েছিল। আকাশের রামধনুকে মাটিতে নামিয়ে আনতে চেয়েছিল শরীরী আকর্ষণের জোরে। তাতে কাজ হয়নি। ব্যর্থতার ধাক্কাটা কিছুদিনের মধ্যে সামলে উঠে ফের একবার ফাঁদ পাতল দামিনী। তুলনায় অতি সাধারণ শ্রীবিলাসের সঙ্গে নৈকট্যের অভিনয় করে সে শচীশের মনে ঈর্ষা জাগাতে চাইল। এইবারে ফল হল। দুর্বল হয়ে পড়ল শচীশ। আবার একই সঙ্গে নিজের দুর্বলতাকে লক্ষ্য করে নিজেকে ঘিরে একটা ঔদাসীন্যের প্রাচীর গড়ে তোলবার চেষ্টা করছিল সে। কিন্তু দামিনীর নিরন্তর আঘাতে একসময় সে পাঁচিল পড়ল ভেঙে। পরাজয় স্বীকার করল শচীশ। দামিনীকে এসে মিনতি করে বলল তাদের ছেড়ে সে যেন কোথাও না চলে যায়।

পুরুষটিকে জয় করা সম্পূর্ণ হবার পর কিছুদিন তাকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিল দামিনী। অবশেষে একটা স্থির সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছেছিলো তার চেতনাঃ একে নিয়ে সাংসারিক রসের পথে চলার কোনো উপায় নেই। এ মানুষকে অকুন্ঠ শ্রদ্ধা করা যায়, কিন্তু নারীপুরুষের ঐহিক ভালোবাসার সুর সেখানে তেমনভাবে বাজে না। এইবারে মীরাবাঈয়ের কৃষ্ণপ্রেমের পথে বইল শচীশের প্রতি দামিনীর ভালোবাসা। নীরবে সব দুঃখ সয়ে তার দেখভাল করা, ভাবোন্মাদ মানুষটিকে বহু কষ্ট সহ্য করে দুটি খাওয়াতে চেষ্টা করা এই সবকিছুর মধ্যে দিয়েই সেই প্রেমের উপাসনা করল দামিনী। তার মধ্যেকার সেই গুহার অন্ধকারে জেগে ওঠা জন্তুটা তখন পোষ মেনেছে।

ঠিক এই মুহূর্তটিতে, শচীশের তুলনায় অতি সাধারণ শ্রীবিলাস যখন নিজের সামাজিক নিরাপত্তাকে তোয়াক্কা না করে আশ্রয়হীন দামিনীকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়, দামিনী খুশিমনেই তা গ্রহণ করেছিলো। আকাশের রামধনু শচীশের প্রতি তার যে গভীর ভালোবাসা, তার পাশাপাশি একই সঙ্গে মাটির পৃথিবীর একজন নির্ভরযোগ্য বাস্তব পুরুষের সঙ্গে দাম্পত্য ভালোবাসা গড়ে তোলবার পরিকল্পনায় তার কোনো সংকোচ ছিল না। নিজের মনোজগতে এই যে পার্সোনাল স্পেস তৈরি করে নেয়া, যেখানে একই সঙ্গে দুটি পুরুষের প্রতি দুই আলাদা ধরনের আনুগত্য ও ভালোবাসার সহাবস্থান ঘটানো সম্ভব, এইখানটিতেই লুকিয়ে আছে তেরো বছর আগে সৃষ্ট নিতান্তই ইন্সটিঙ্কট নিয়ন্ত্রিত নারীচরিত্র বিনোদিনীর সঙ্গে তার পরবর্তী প্রজন্মের আধুনিকা দামিনীর পার্থক্যটি। বহিরঙ্গে তাদের আচরণে মোটা দাগের মিল কিছু হয়ত পাওয়া যাবে, কিন্তু অন্তরঙ্গে তাদের জীবনবোধে অনেকটাই তফাৎ। দামিনীর এই স্বাধীনচেতা দ্বিচারিত্ব রবীন্দ্রনাথকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল কি? নাহলে গুহায় শচীশের আসঙ্গকামনা করতে গিয়ে বুকে যে লাথিটি খেয়েছিল দামিনী, তার ব্যথা ফিরে এসে বিবাহিত জীবনের শুরুতেই তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেবে কেন? নিছক দৈবের খেলা এ নয়। দৈব এখানে লেখক স্বয়ং। তিনি অন্যের মনস্তত্ত্ব নিয়ে অনেক গবেষণা করেছেন, তাঁর নিজের পুরুষমনস্তত্ত্বটির কথা কে বলতে পারে?

|| ঘরে বাইরে ||

এই একই বছরে আর একটি এক্সপেরিমেন্ট করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সর্বহারা, ক্ষুধার্ত দুই বিধবা, দামিনী অথবা বিনোদিনী জীবনের কোনো স্বাদই প্রথমে পায়নি। প্রবৃত্তির নিবৃত্তিই তাদের জন্য সনাতন ভারতীয় জীবনদর্শনের একমাত্র বিধান ছিল। দুটি ভিন্ন ভিন্ন উপন্যাসে জীবনকে উপভোগ করবার প্রলোভন ও সুযোগের মধ্যে ঠেলে দিয়ে তাদের প্রতিক্রিয়াগুলো দেখবার পর সেই প্রলোভনের পরীক্ষাটা রবীন্দ্রনাথ এবারে করলেন এক সুখী, তৃপ্ত ও উচ্চশিক্ষিতা মহিলাকে নিয়ে। তিনি বিমলা। বুদ্ধিমান, অর্থবান, বিবেকবান ও প্রেমময় পুরুষ নিখিলেশের স্ত্রী। জীবনে আর কিছুই তাঁর পাবার বাকি বলে মনে হত না। স্বামী-সোহাগিনী ছিলেন বিমলা। কিন্তু সে ভালোবাসার একমাত্র গ্রাহক হিসেবে তাঁর যে মনোপলি, সেটা নিখিলেশের পছন্দ ছিল না। সেলফ ডিটারমিনেশনের ক্ষমতা হাতে পেলে এই খাঁচার পাখি বিমলার পতিপ্রেম কতটা বজায় থাকে তা পরীক্ষা করে দেখবার ইচ্ছে হয়েছিল নিখিলেশের। সেজন্য বিমলাকে খানিকটা তার ইচ্ছের বিরুদ্ধেই অন্দরমহলের পতিনির্ভর নিরাপত্তা থেকে বাইরে টেনে এনে বৃহত্তর জগতের স্বাধীনতার আস্বাদ দিতে চেয়েছিলেন নিখিলেশ। অন্দরমহলের মৃদু আলোর আবডাল পেরিয়ে বাইরে এসেই বিমলার চোখ ধাঁধিয়ে গেল প্রবল পুরুষ সন্দীপের বর্ণচ্ছটায়। সন্দীপ একেবারেই নিখিলেশের অ্যান্টিথিসিস। আধুনিক পশ্চিমী পুরুষের মতোই বাইরের বৈদগ্ধ্যের পাতলা আবরণটির ভেতরে তার ধন-নারী-ক্ষমতার কামনা প্রবল। ছলে বলে কৌশলে এই তিনটির সঞ্চয় বাড়ানোই তার মোক্ষ। প্রাচ্যসুলভ দার্শনিক মনুষ্যত্বের পথে নিখিলেশের মতো এগিয়ে যাওয়া হয়ে ওঠেনি তার। অনভিজ্ঞ বিমলাকে সে ভাসিয়ে নিয়ে গেল নিজের ক্যারিসমা আর তীব্র যৌন আবেদনের শক্তিতে।

সনাতনপন্থী পাঠক গল্পের এইখানটাতে এসেই হাঁ হাঁ করে উঠে বলবেন, বেশি স্বাধীনচিত্ত হবার ফল এমনটাই হয়। কৈশোরে ঘরে বাইরে সিনেমাটা দেখতে গিয়ে নৈহাটি সিনেমা হলে আমি এই মন্তব্য নিজের কানে শুনেওছি। কিন্তু বাস্তবে কিন্তু তা ঠিক ঘটে নি। বিমলা, নিজের অনভিজ্ঞতা ও অজ্ঞতার ফলে আগে ছিল গার্হস্থ্যতন্ত্রের বশ, আর সেই একই কারণে সন্দীপের সামনে এসে সে-প্রবৃত্তির বশ হওয়া থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারল না। প্রবল পুরুষকে জয় করবার মধ্যে নারীপ্রবৃত্তি যে চিরন্তন তৃপ্তি পায়, সন্দীপের তার কাছে আত্মসমর্পণের অভিনয়ে ভুলে সে সেই তৃপ্তি পেতে আরম্ভ করল। সুখের সে তীব্রতার ঝাঁঝ, গার্হস্থ্যসুখের দীপশিখাটির পাশে বিলিতি বিজলি আলোর মতোই চোখ ধাঁধানো। সে ঝাঁঝের চোটে সন্দীপের স্বরূপটা কিছু কিছু বুঝতে শুরু করবার পরেও কিন্তু সে বারংবার তার কথায় ফের ভুলেছে।

কিন্তু উত্তেজনার প্রাথমিক ধাক্কাটা কেটে যেতে মেয়েদের দ্বিতীয় এবং প্রবলতর প্রবৃত্তিটা এসে তার চোখ খুলে দিল। সেখানে শান্তি ও নিরাপত্তা, পুরুষজয়ের উত্তেজনার থেকে বেশি প্রয়োজনীয়। এইখানটায় এসে মোহভঙ্গ হল বিমলার। এ পরীক্ষার মুখোমুখি হতেই সন্দীপের চরিত্রের খড়-মাটি বের হয়ে তার সামনে চলে এল। তীব্র যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে সে বুঝতে পারল, সন্দীপ তাকে চায়নি, তার রূপ আর রূপো এই দুটিতেই কেবল তার প্রয়োজন। অন্যদিকে, চোখ ধাঁধানো ঔজ্জ্বল্যের নেপথ্যে দাঁড়িয়ে থাকা নিখিলেশ তার সমস্ত বিচলন ক্ষমা করে আজও তাকে সেই কাঙ্ক্ষিত সম্মান, শান্তি ও নিরাপত্তা দেবার জন্য প্রস্তুত। বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে অতএব আবার সে মুখ ঘোরাল তার স্বামীর দিকে।

অথচ এ গল্পেও আবার এই শেষমুহূর্তটিতে এসে নিদারুণ দৈবের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন লেখক স্বয়ং। হঠাৎ এক অপ্রত্যাশিত দাঙ্গায় স্বেচ্ছায় এগিয়ে গিয়ে নিখিলেশ মাথায় গুরুতর আঘাত নিয়ে জীবন্মৃত হয়ে ফিরল বিমলার কাছে। প্রতিদানহীন সুদীর্ঘ সেবায় অথবা বৈধব্যে নিখিলেশের প্রতি বিমলার অবিচারের প্রায়শ্চিত্তের বিধান দিয়ে রবীন্দ্রনাথ নিজেও সম্ভবত শান্তি পেলেন। লেখক দ্বিচারিণী নারীর সৃষ্টি করতে পারেন হয়তো সৃষ্টিকর্মের প্রয়োজনে, কিন্তু তাঁর পজেসিভ পুরুষসত্ত্বা দ্বিচারিণী নারীকে ক্ষমা করতে পারে না। রবীন্দ্রনাথ তো নিখিলেশের মতোই শিক্ষিত, ধীরস্থির, বিবেকবান, উদার একজন জমিদারই ছিলেন!

|| যোগাযোগ ||

১৯২৯ সালে লেখা যোগাযোগ এক আশ্চর্য বাস্তবানুগ কাহিনী। এখানে তিনটি পুরুষ মিলে একটি নারীচরিত্রকে ঘিরে থাকে। একজন দর্শন-মেধা-মননের উচ্চতম চূড়ায় বসা বিপ্রদাস, বোন কুমুদিনীর প্রতি তার সুগভীর স্নেহ, সে চায় কুমুদিনী সম্মানের সঙ্গে বাঁচুক, তার জন্য প্রথাগত জীবন যদি সে যাপন করতে না চায় বা না পায় তবে তা-ই সই। দ্বিতীয়জন এক সাধারণ মধ্যবিত্ত কিছুটা স্ত্রৈণ চরিত্র নবীন। ভ্রাতৃবধূ কুমুদিনীকে সে দেবীজ্ঞানে পুজোই করে প্রায়। কীসে তার একটুকু সুখ হয় সে ব্যবস্থা করতে যদৃচ্ছ মিথ্যাচরণ করতেও তার বাধে না। আর তৃতীয়জন হলেন প্রবল প্রতাপান্বিত সেলফ মেড ব্যবসায়ী মধুসূদন, কুমুদিনীর স্বামী। কুমুদিনীকে তিনি গভীরভাবে কামনা করেন, তাকে সোনার খাঁচায় পুরে তার দেহ-মন-আত্মাকে নিঃশষে আত্মসাৎ করে ফেলতে চান প্রবল পৌরুষের তাড়নায়।

কিন্তু প্রশ্ন হোল, কুমুদিনী কী চায়। কুমুদিনী চরিত্রটি বড়ই বাস্তবানুগ। আজ একুশ শতকে এসেও আধুনিক ভারতীয় মহিলা বলতে আমরা যেমনটা বুঝি তারই একটি আদর্শ প্রোটোটাইপ বলা যায় তাকে। একদিকে শিক্ষাদীক্ষায় সে যথেষ্ট অগ্রসর ও প্রগতিমনস্ক, আবার অন্যদিকে তার একটা পা প্রোথিত রয়ে গেছে সনাতন ভারতীয় সংস্কারের ভূমিতে। (এটা আজকের আধুনিকার মডেল বলে যদি মানতে না চান তাহলে টেলিভিশনের বিজ্ঞাপনের মেয়েদের দিকে চেয়ে দেখবেন একটুখানি। তাঁরা গবেষণাগারের কম্পিউটার চালিয়ে বাড়ি ফিরেই কমপ্লানের গেলাস নিয়ে সন্তানকে তাড়া করেন কিংবা হৃদয় রক্ষক তেলে স্বামীর জন্য মাছ ভাজতে বসে যান।) বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে সে এসেছিল স্বামীকে তার সব শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা উজাড় করে দেবে বলেই। কিন্তু মধুসূদনের ব্যবহার তাকে প্রতিপদে আহত ও বিমুখ করে তুলেছিল স্বামীর প্রতি। ওদিকে আবার সনাতনধর্মের দাবীতে স্বামীর প্রতি সরাসরি বিদ্রোহিনী হবার সাধও তার ছিল না। ফলে এক উদাসীন আত্মসমর্পণের রাস্তায় হাঁটল কুমুদিনী। যন্ত্রের মতো স্বামী সহবাস, বাড়ির চাকরবাকরের কাজকর্ম করা, এইসব নিয়েই চলল তার জীবন। সেখানে হৃদয়ের কোনো স্পর্শমাত্র ছিল না।

ওদিকে মধুসূদন মানুষটি রুক্ষ, অসংস্কৃত হলেও তাঁর কিছু গুণও ছিল। উদ্যমী, পেশাক্ষেত্রে দূরদর্শী ও সৎ এই মানুষটির কুমুদিনীর প্রতি দুর্ব্যবহারের প্রধান উৎস ছিল তাঁর পিতৃবংশ ও শ্বশুরবংশের প্রাচীন শত্রুতা। কেবলমাত্র সেইজন্যই বিপ্রদাসের বংশের ওপর চূড়ান্ত বিজয়ের ট্রোফি হিসেবে অপেক্ষাকৃত নিম্নবর্ণীয় হয়েও তার বোনকে বিয়ে করে ঘরে এনে তুলেছিলেন তিনি চূড়ান্ত বৈভবের নির্লজ্জ প্রদর্শনী দেখিয়ে। কিন্তু বিয়ের পর থেকে কুমুদিনীকে তিনি আস্তে আস্তে একেবারেই নিজের ঢঙ-এ ভালোও বাসতে শুরু করেছিলেন। নিরাপত্তা ও প্রভূত সামাজিক সম্মানের বিনিময়ে শুধু মধুসূদন চেয়েছিলেন কুমুদিনীর নিঃশর্ত বশ্যতা। কুমুদিনী তা দিতে অস্বীকার করেছিলো। ঘর ছেড়ে চলে গিয়েছিলো সে তার দাদার কাছে। বিনিময়ে ব্যভিচারের পথে প্রতিশোধ নিতে চাইলেন মধুসূদন। রজোগুণসম্পন্ন পুরুষ তিনি। বিবাহের বাইরে একটিদুটি নারীতে আসক্তি তাঁর নিতান্তই সমাজস্বীকৃত।

কুমুদিনীকে বড় সাংঘাতিকভাবে বেজেছিল মধুসূদনের এই ব্যভিচারের সংবাদ। যাকে সে নিজে অবিমিশ্র ঘৃণা করে বলে ভেবে তার ঘর ছেড়ে চলে এসেছে, সেই মানুষটিও, অন্য স্ত্রীলোকে অনুরক্ত হয়েছে শুনে সম্ভবত তার নারীসুলভ অধিকারবোধে কোথাও সুতীব্র ঘা লেগে থাকবে। কিন্তু এরপরে যখন জানা গেল কুমুদিনী সন্তানসম্ভবা হয়েছে মধুসূদনের ঔরসে, তখন নামমাত্র প্রতিবাদ করেই কিন্তু সে ফিরে গেল স্বামীর আশ্রয়ে। শিক্ষাদীক্ষা, সংস্কৃতি, স্বাধীনচিত্ততা, স্বামীর চরিত্রদোষ, প্রিয়তম দাদার গুরুতর অসুস্থতা এইসব কিছুই আর তার সেই ঐহিক নিরাপত্তার আশ্রয়টিতে ফিরে যাবার পথে বাধা হোল না। তার নিজের ভেতরে কোনো গভীর দুঃখ থাকলেও তার বাহ্যিক প্রকাশ ঘটল না কোনো।

কেন এই আশ্চর্য আত্মবলি বেছে নিল কুমুদিনী? আসলে, উপযুক্ত পুরুষকে যেকোনো মূল্যে জয় করা, সংসারজীবনে নিরাপত্তার আশ্রয় খোঁজা, এইসব যাবতীয় নারীসুলভ প্রবৃত্তির চালিকাশক্তি যে গভীরতর প্রবৃত্তি, তা হল বংশবিস্তার। যেকোনো জীবিত প্রাণীর বেঁচে থাকবার এইটাই মূল প্রবৃত্তি বা বেসিক ইনসটিঙ্কট। এর জন্যেই নারীজীব প্রবৃত্তিতাড়িত হয়ে উপযুক্ত মেটিং পার্টনার ছিনিয়ে নিতে চায় নিজের জন্য, তার সন্তানকে নিরাপদ ও স্থিতিশীল আশ্রয় এবং যত্ন দিয়ে টিঁকিয়ে রাখতে পারবে যে পুরুষ তার সঙ্গেই ঘর বাঁধতে সে বেশি আগ্রহী থাকে। সন্তান উৎপাদনের উদ্দেশ্যটাই যখন কুমুদিনীর পূরণ হয়ে গেল তখন আর সংস্কৃতি, ভালোবাসা ইত্যাদি কোনো গৌণ মোটিভেশন তার আর দরকার রইল না। সে ফিরে গেল মধুসূদনের ঘরে। তাকে সে যেটুকু চিনেছে তাতে এই অসংস্কৃত পুরুষ তাকে ক্রমাগত দলিত মথিত করে ভোগ করে চলবে তার গোটা যৌবনকালটাই, কিন্তু বিনিময়ে ভালোবাসাও দেবে নিজের মোটাদাগের রাস্তায়, আর, সবচেয়ে বড় কথা তার হবু সন্তানকে সে যে নিরাপত্তাটি দিতে পারবে তা তার আদর্শবাদী দাদার পক্ষে দেয়া সম্ভব নয়।

পুরুষমানুষ চির রোমান্টিক। তার আড়ালে থেকেই হোক আর প্রকাশ্যে বের হয়ে এসে হাল ধরেই হোক, সংসারটাকে সোজা রাস্তায় চালিয়ে নিতে হয় মেয়েদেরই। যৌবনের প্রাথমিক উচ্ছ্বাসটুকু কেটে গেলে তাই যখন একটি মেয়ে মা হয়, তারপর থেকে অকারণ হৃদয়মনস্কতা আর তার সাজেও না, আসেও না। রোমান্টিকতার বলিদান হয় প্র্যাকটিক্যালিটির পূজাবেদিতে। তাতে স্বামী বেচারা হয়তো একটু হতাশ হন, কখনো কখনো নিজেদের দুর্বলতার ফলস্বরূপ ঘটে যাওয়া পরকিয়ার কারণ হিসেবে তুলেও ধরেন ঘরনীর উদাসীন প্র্যাকটিক্যালিটিকে, কিন্তু ওতেই সংসারটা সঠিকভাবে চলে, সন্তানরা মানুষ হয়, বেঁচেবর্তে থাকে, প্রকৃতির উদ্দেশ্যটাও পুরো হয়। কুমুদিনী অতএব সেই বাস্তবকে মাথায় তুলে নিয়ে আদর্শবাদী বিপ্রদাসকে ছেড়ে রুক্ষ, অসংস্কৃত কিন্তু তার প্রতি টানমায়াযুক্ত মধুসূদনের ঘর করতেই ফিরে গেল। এমন দশায় বহু গর্ভবতী মেয়েই তাই যায়। আজও। শিক্ষিত হলেও। ব্যতিক্রম আছে। কিন্তু তা ব্যতিক্রমই। নিয়মকেই প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করে তা।

|| শেষের কবিতা ||

একই বছরে সৃষ্ট শেষের কবিতার লাবণ্য অবশ্য কুমুর তুলনায় বহুগুণে সৌভাগ্যবতী ছিল। কারণ বেছে নেবার সুযোগ পেয়েছিল সে। চিররোমান্টিক অমিতকে সে ভালোবেসেছিলো। সে ভালোবাসায় কোনো খাদ ছিল না। কিন্তু ইন্টেলেক্টের পূজাবেদিতে তাকে চিরপ্রেমিকের স্থান দিলেও প্রত্যহের ম্লানস্পর্শটি দেবার জন্য সে বেছে নিয়েছিল মাটির অনেক কাছাকাছি মানুষ শোভনলালকে। শোভনলাল তাকে চেয়েছিল একেবারেই মর্ত্যের মানুষীর মতন করে। তার রোম্যান্টিক সূক্ষ্মমূর্তির পুজো করবার বদলে নিতান্তই বাস্তব মানুষীটিকে নিয়েই ছিল তার ঘর বাঁধবার স্বপ্ন। অমিত অন্যদিকে লাবণ্যকে বিবাহিত জীবনে ঘরনীর বদলে প্রেমিকা হিসেবেই চিরনবীনা করে দেখতে চেয়েছিলো। স্বপ্ন হিসেবে সেটি ভারি সুন্দর বটে, কিন্তু দৈনন্দিন ভাতকাপড়ের হিসেবের দিনযাপনের রূঢ় আঘাত সে রূপের ফানুসটিকে যে দুদিনেই মাটিতে আছড়ে ফেলবে সেটি বুঝতে নারীসুলভ বুদ্ধিতে বিশেষ সমস্যা হয় নি লাবণ্যর। সে ধারণা তার আরও দৃঢ় হয়েছিল, তাকে পাবার পর বাগদত্তা কেটি মিত্তিরের প্রতি অমিতের নিঃসীম অবজ্ঞার প্রদর্শনীতে। অমিত এক স্বর্গীয় বালক যেন। নানা আইডিয়া আর আইডিয়ালের খেলনা নিয়ে তার সতত রোম্যান্টিক খেলা। সে খেলায় আজকের যে পুতুলটিকে সে প্রাণের চেয়ে প্রিয় বলে ঘোষণা করে সে পুতুল কালকে মূল্যহীন। তার ভালোবাসায় স্বর্গীয় সুষমা থাকলেও ঐহিক নিরাপত্তার অভাব রয়েছে সেখানে। আরও একটা জিনিস লাবণ্যের কাছে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল অমিতের ব্যবহারে। সে আসলে তার প্রেমিকাকে চায় নিজের হৃদয়ে জমে থাকা ভাবতুষারকে গলিয়ে সৃষ্টির অমৃতধারা করে বের করে আনবার জন্য প্রয়োজনীয় উষ্ণতার জোগানদার হিসেবে। মানুষী প্রেমিকায় তার কাজ নেই কোনো।

অতএব লাবণ্য শোভনলালের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তাকেই স্বামীপদে বসাল। সে তাকে ভালোবাসার পাশাপাশি নিরাপত্তা দেবে অনেকখানি। সে প্রেমিকা থেকে বদলে গিয়ে বাস্তব দুনিয়ার ঘরনী হয়ে গেলেও আশাহত হবেনা এই পুরুষ। দেবী হিসেবে তাকে সে পুজো করে যেতে চাইবে না আজীবন। নিতান্তই মানবী হিসেবেই আশ্রয় দিয়ে রাখবে চিরকাল। তার জন্য হয়তো নিজের রোমান্টিক সত্ত্বাটুকুকে বলি দিতে হবে তাকে কিন্তু তাতে লাবণ্যর খেদ নেই কোনো।

‘শূন্যরে করিব পূর্ণ’–সন্তানের জন্মদাত্রী নারী হিসেবে এই ব্রতটি তাকে উদযাপন করতেই হবে প্রকৃতির নির্দেশে। সেই সন্তানকে সুস্থভাবে পালনের কাজে যে সুদৃঢ় সংসারের ভিতটা চাই সেটা রোমান্টিক অমিতের চেয়ে অনেক নির্ভরযোগ্য ভাবে দিতে পারবে বাস্তববাদী ও খাটিয়ে ছেলে শোভনলাল।

অন্যদিকে অমিতের রোমান্টিক ভালোবাসার আদরটুকুকেও লাবণ্য হারাতে চায়নি। রোজকার থোড়বড়িখাড়ার জীবনে সে যতই মূল্যহীন হোক না কেন, ইন্টেলেকচুয়াল জীবনে “এর স্বাদ গভীর—গভীর—”

অতএব হৃদয়ে জমে থাকা রোমান্সের শেষবিন্দুটুকুও তাকে উৎসর্গ করে দিয়ে, মননের পূজাবেদিতে তাকে প্রেমের ঈশ্বরের আসনটি দিয়ে তারপর সুস্থসবল পার্থিব আদরের ঝুলিটি নিয়ে সে চলল স্ত্রী হয়ে শোভনলালের ঘরে। শেষের কবিতার শেষের লাইনগুলোতে তাই তার সেই স্বর্গীয় দ্বিচারিতার অলজ্জ ঘোষণা হোল এই লাইনগুলোতে—

মোর পাত্র রিক্ত হয় নাই,
শূন্যেরে করিব পূর্ণ, এই ব্রত বহিব সদাই।
—–
—–
যে আমারে দেখিবারে পায়
অসীম ক্ষমায়
ভালোমন্দ মিলায়ে সকলি,
এবার পূজায় তারি আপনারে দিতে চাই বলি।
তোমারে যা দিয়েছিনু তার
পেয়েছ নিঃশেষ অধিকার।

একসময় চতুরঙ্গের দামিনীও এই মনোজগতে নিজস্ব একটা প্রাইভেট স্পেস তৈরির চেষ্টা করেছিলো, যেখানে স্বামীর পাশাপাশি অন্যরকমের একটি ভালোবাসারও স্থান হতে পারে যাতে বহুগামিতার ক্লেদ নেই। কিন্তু তার সে চেষ্টা পুরো সার্থক হয়নি। সে প্রচেষ্টা কাউকেই সুখ দিতে পারেনি ভালোভাবে। ব্যর্থ একটা পরীক্ষার মতোই কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি সে চেষ্টায়। বিশ শতকের তিনের দশকের লাবণ্য কিন্তু সেই পরীক্ষায় সম্পূর্ণ সফল হোল। স্বামী এবং দ্বিতীয় কোনো মানুষকে মনের ভেতরে স্থান দিয়েও শুচি ও একনিষ্ঠ থাকবার সমাজস্বীকৃত পথটি সে খুঁজে পেল। সে নিজে আনন্দ পেল, অন্যেরাও সুখ পেল। বঞ্চিত হোল না কেউ।

|| চার অধ্যায় ||

লাবণ্যর একেবারে বিপরীত পথে হেঁটেছিল চার অধ্যায়ের এলা। স্বদেশপ্রেমের আদর্শবাদ তাকে ঘর ছেড়ে পথে বের করে এনেছিল। পুরুষের ওপর নিজের রূপযৌবনের মোহিনী শক্তির ক্ষমতার ব্যাপারে খুব পরিষ্কার ধারণা ছিল তার। অথচ প্রকৃতি কেন যে মেয়েদের এই মোহিনী শক্তিটা দিয়ে পাঠান তা ইনস্টিংক্টের গভীরে তার অজানা না থাকলেও সচেতন বোধি ও মননে সে তাকে জোরগলায় অস্বীকার করবার দুঃসাহস দেখিয়েছিল। শুধু পরোক্ষ অস্বীকার নয়, প্রত্যক্ষভাবে সেই মোহিনী শক্তিকে সে প্রয়োগ করা শুরু করেছিলো সম্পূর্ণ অন্য কাজে। বিপ্লবী ছেলেদের দলে একটা আকর্ষণের বিন্দু তৈরি করে রাখতে তার রূপকে বিনাদ্বিধায় কাজে লাগিয়েছিলো তাদের প্রিয় এলাদি। অতীনকে একবার স্টিমারে দেখে এলার ভালো লেগেছিল। সে ভালো লাগা একেবারেই প্রাকৃতিক আকর্ষণ। ভৌগোলিক পৌত্তলিকতা সঞ্জাত দেশভক্তি নামের কৃত্রিম আবেগের সঙ্গে তার কোনো সম্বন্ধ নেই। এইবারে দ্বিতীয় গুরুতর পাপটি করল এলা। প্রকৃতিনির্দিষ্ট সত্য যে নারীপুরুষের ভালোবাসা সেই ভালোবাসাকে সে চিনতে অস্বীকার করল, তার বিরুদ্ধে নেয়া দেশভক্তির প্রতিজ্ঞার দায়ে। অতীনের কাছে থাকবার জন্য সে তাকে ভালোবাসার টোপ দিয়ে টেনে আনল বিপ্লবীদের দলে। যে আশ্চর্য সৌভাগ্য সকল সাধনার অতীত, সেই ভালোবাসা দৈবের অযাচিত দান হয়ে এলালতার সামনে এলেও তাকে সে গ্রহণ করতে পারল না, দেশ নামের এক কৃত্রিম ভৌগোলিক গণ্ডির সঙ্গে নিজের বাগদানের মিথ্যেটার নিদারুণ চাপে। নিজেকে সে বোঝালো অতীনকে বশ করতে হবে দেশের কাজের জন্য।

অতীন কিন্তু দেশের জন্য নয়, এলাকে একেবারে খাঁটি ভালোবেসেই এসে ভিড়েছিল তার দলে। তার জন্য সে নিজের জীবন ছাড়ল, জীবিকা ছাড়ল, অথচ সে-সর্বনাশের বদলে যা সে দাবি করতে পারত তার কিছুই তার মিলল না। এ কথা বলে সে উপন্যাসের পরের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলেছিল এলার দিকে।

প্রকৃতির বিরোধিতা করার শাস্তি এলালতার শুরু হতে দেরি হয় নি। বিপ্লবীদের দলে ভিড়ে অতীন যতই তাড়া খাওয়া পলাতক জন্তুর মতো ধাপে ধাপে এগিয়ে গিয়েছে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে, এলার হৃদয়ের ওপর থেকে মেকি আদর্শের আবরণগুলোও ততই খসে পড়েছে একে একে। বের হয়ে এসেছে সেই চিরন্তন নারী যে প্রিয়তম পুরুষের কাছে একটু নিভৃত আদর, একটি নিরালা সুখের সংসার চায়। সুতীব্র অনুশোচনায় সে অতীনের (ও ফলত তার নিজের) সর্বনাশের জন্য বারবার নিজেকে দায়ী করবার পাশাপাশি কখনো কখনো অতীনকেও অভিযুক্ত করতে শুরু করেছে এই বলে যে কেন সে এলার সব কথা শুনেছিলো, কেন সে নিজের মতো আলাদা করে কোনো সিদ্ধান্ত নেয় নি।

কিন্তু ততদিনে নিয়তি তার শেষ হাসি হেসেছে। যে সর্বনাশা মিথ্যে পথকে সত্য, ধর্ম ও আদর্শ ভেবে নিজের ভালোবাসার সঙ্গে গভীর তঞ্চকতা করেছিলো এলালতা, সেদিন সেই পথই কালসর্প হয়ে তাকে দংশন করতে উদ্যত হয়েছে। ফিরে আসবার আর কোনো রাস্তা নেই তার সামনে। কাহিনীর শেষদৃশ্যে তাই দেখা যাচ্ছে, যার কাছে একটা পরিপূর্ণ জীবন পেতে পারত মেয়েটি তার কাছেই আকুল মৃত্যুভিক্ষায়, নিজের লজ্জাবস্ত্র ছিঁড়ে দিয়ে তুলে ধরছে নগ্ন বুক। আর অন্ধকার সেই মরণবাসরের আবহে ঘনিষ্ঠ হয়ে থাকা মানুষদুটিকে ঘিরে বিধাতার নিষ্ঠুর পরিহাসের মতোই বেজে চলেছে কোনো এক বিয়ের সানাই।

ইন্দ্রনাথের সাধ্য ছিল না এতবড় শাস্তি তিনি দেন এলা আর অন্তুকে। এ শাস্তি দিয়েছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। ‘দেশভক্তি’র উদ্দাম জোয়ারে, নিরাপদে বসে থাকা নেতাদের ঠাণ্ডা মাথায় নেয়া সিদ্ধান্তের অনুসরণ করতে গিয়ে হাজার হাজার তাজা প্রাণের বলি দিয়ে যে রক্ত উৎসব চলছে সে সময়টায় দেশোদ্ধারের নামে, তার অসহায় সাক্ষী হয়ে থাকতে থাকতে সুতীব্র বিষণ্ণতায় আচ্ছন্ন রবীন্দ্রনাথ এ কাহিনীতে এলাকে চরমতম শাস্তি দিয়ে যেন বা বলে গেলেন, প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ করবার ফল মৃত্যু।

রবীন্দ্রনাথের স্বাধীনচেতা এবং আলোকপ্রাপ্তা মেয়েরা বিবিধ মিলনান্ত ও বিয়োগান্ত পরিণতিগুলোর মধ্যে দিয়ে বারে বারে চেষ্টা করে গেছে, জীবন নিয়ে নয়া দুনিয়ার অ্যাডভেঞ্চারিজম ও চিরায়ত স্থিতিশীলতার দুই বিপরীতমুখী ইনসটিংকটের মধ্যে একটা সেতুবন্ধ তৈরি করতে। প্রবৃত্তি (অথবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে, আদর্শ) ও সামাজিক নিরাপত্তা–এই দুটি বিপরীতগামী চাহিদার সামঞ্জস্য ঘটিয়ে নতুন জীবনবোধের রাস্তা গড়ে নিতে কেউ সফল হয়েছে, কেউ ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু তাদের জীবনকথার মধ্যে দিয়ে ঋষিপ্রতিম মানুষটি তাঁর নিজের একটি উপলব্ধিই দিয়ে গিয়েছেন উত্তরসূরী সমাজের মেয়েদের কাছে। তা হল, ঘরের ও বাইরের দুনিয়ার বিপরীতগামী জীবনবোধের মধ্যে এই ভারসাম্যটা সাফল্যের সঙ্গে তৈরি করতে পারবার মধ্যেই রয়েছে সুখের চাবিকাঠিটি।

পরবাস, ২২শে শ্রাবণ, ২০১৫; August 2015 // সুত্রঃ সংগৃহীত

একটি উত্তর দিন

দয়া করে আপনার কমেন্টস লিখুন
দয়া করে আপনার নাম লিখুন