গান নয় জীবনকাহিনি: পর্ব ~ ৫

0
66
গান নয় জীবনকাহিনি: পর্ব ~ ৫

পুরুষ নায়িকা (বিক্রমপুর)

প্রকাশিত : শনিবার,২০ জুন ২০২০ ইং ।।  ৬ই আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ ।।  বিক্রমপুর খবর : অফিস ডেস্ক :

অধ্যাপক ঝর্না রহমান 

১৯৬৭ সনে আমাদের কমলাপুরের বাসও গুটোতে হয়। রেল স্টেশনের জন্য সরকার আশাপোশের বিস্তর জায়গা অধিগ্রহণ করে নিচ্ছিল। এই অধিগ্রহণের আওতায় পড়ে গেল হারুন মামার খালুশ্বশুরের জায়গাটি। সুতরাং এখান থেকে জলদি বসবাস তুলে ফেলতে হবে। আমার আব্বা আর মামা দুজনেই অকূল পাথারে পড়লেন। তবে মামার সংসার ছোট। তিনবছর আর ছ মাস বয়সী দুজন ছেলেমেয়ে আর মামামামী। মামা ঢাকাতেই আর একটা বাসা ভাড়া করার চেষ্টা চালাতে লাগলেন। তাড়াতাড়ি না পাওয়া গেলে তখনকার মত মতিঝিলে তাঁর শ্বশুরের কোয়ার্টারে সাবলেট থাকবেন কিছুদিন। আমাদের সংসার বড়। কমলাপুরে আসার পর আমার আর একটা ভাই হয়েছে। ওকে নিয়ে তখন আমরা চার বোন দুই ভাই। আব্বার একার চাকরি। গ্রামে আমার দাদাজান আছেন। তবে দাদি মারা গেছেন আব্বার ছাত্রবয়সে। দাদার জন্য আব্বাকে টাকা পাঠাতে হয়। চাচা ফুপুরাও মাঝে মাঝে নানান অর্থনৈতিক সমস্যা নিয়ে আসেন। আব্বা দাদাজানের বড় সন্তান বলে তাঁকে সেসবও দেখতে হয়। তবে আম্মা কমলাপুরের বাসা ছাড়তে হবে শুনে খুশিই হন। কারণ, গুজব ছড়িয়ে গেছে কমলাপুর রেল স্টেশন নির্মাণে পিলার স্থাপনের কাজ চলছে, ওখানে প্রতিটা পিলার গাঁথার আগে বাচ্চাদের মাথা দিতে হয়। ছেলেধরারা শিশুদের ধরে নিয়ে স্টেশনওয়ালাদের কাছে চড়া দামে বেচে দেয় আর ওদেরকে গর্তের ভেতর ফেলে দিয়ে সিমেন্ট বালু ঢেলে পিলার গেঁথে ফেলা হয়। এর মধ্যে একদিন বিকেলে আমার ছোট বোন মিনু হারিয়ে গেল। আড়াই কি তিন বছর বয়স। টুকটুক করে সে উঠোনে হেঁটে বেড়াচ্ছিল। আমার সেজ খালু সিরাজুল ইসলাম এসেছেন বেড়াতে। আম্মা খালুজানের সাথে গল্পে মগ্ন। আব্বা, মামা কেউই তখনও ফেরেননি। আম্মার একসময় খেয়াল হল মিনু নেই। বাসার ভেতরে কোথাও নেই। আম্মা পাগলের মত চিৎকার শুরু করলেন। খালুজান ছুটে বেরিয়ে গেলেন। ঘণ্টাখানেক পরে মিনুকে কাঁধে বসিয়ে খালুজান ফিরে এলেন। তাঁর ঝোড়ো কাকের মত চেহারা। কাঁধের কাছে কিসের সাথে খোঁচা খেয়ে কোট ছিঁড়ে ইঞ্চি দুয়েক কাপড় ঝুলছে। মিনুকে খালুজান কোথায় খুঁজে পেলেন বা কীভাবে উদ্ধার করলেন, তা আর এখন মনে নেই। আমার আম্মা, আব্বা, খালু এঁরাও এখন এমন এক জগতের বাসিন্দা, যেখান থেকে আর কোনো তথ্যই পাওয়া যাবে না। ঐ ঘটনার পরে আম্মা কমলাপুরকে বিষের চোখে দেখতে শুরু করেছিলেন। আম্মার স্থির বিশ্বাস হয়ে গিয়েছিল, মিনুকে ছেলেধরারাই নিয়ে যাচ্ছিল, সাথে সাথে খোঁজ পড়ে যাওয়াতে আর সরিয়ে নিতে পারেনি। এ ঘটনা ছাড়াও, কমলাপুরে থাকতে আমাকে নিয়েও ভয় ছিল আম্মার। কারণ আমার ঠ্যাং লম্বা হয়ে গেছে। গান গান করে মেয়েটা এখানে সেখানে চলে যায়। খোদা নাখাস্তা, কবে ওর মাথাটাও না রেলস্টেশনের পিলারের তলায় চলে যাবে! তবে আম্মা জানতেন না, আমি যে মাঝে মাঝেই পাড়ার সমবয়সীদের সাথে কমলাপুর স্টেশনের নির্মাণযজ্ঞ দেখার জন্য চলে যেতাম। সেখানে কত কলকব্জা, বড় বড় সব মেশিনপত্র! এলাহি কাণ্ড চলছে! স্টেশন বলতে তখন কয়েকটা বিশাল ছাতার মত পিলার কেবল উঠছে। ছাতার মাথার দিকে উঠে এক শ্রমিক কাজ করছে, তাকে দেখতে লাগছে লিলিপুটের মত। হা করে তাকিয়ে থাকি। সিমেন্ট দিয়ে তৈরি এই দৈত্যের ছাতার নিচে কারা দাঁড়াবে? আম্মা এ কথা জানলে নির্ঘাত আমার ঠ্যাঙ ভেঙে ঘরে বসিয়ে রাখতেন। যাই হোক, কমলাপুরের বাস তুলে পুনর্বাসিত হওয়ার সমাধান শেষে আম্মাই দিলেন। সমাধান হিসেবে আমরা সে বছর মার্চ কি এপ্রিলের দিকে চলে এলাম বিক্রমপুরে, আমার নানাবাড়িতে। বিক্রমপুরের টঙ্গিবাড়ি থানায় গনাইসার গ্রামে আমার নানাবাড়ি। নানানানী বহু আগে গত হয়েছেন। মামারা সবাই-ই শহরে থাকেন। বড় বড় ঘর এমনি পড়ে আছে। আম্মা নানাজানের সবচেয়ে ছোট কন্যা। আম্মা মামাদের বললেন, আমার বাপের বাড়ির আমজামআতাকূল বারো ভূতে লুটে খাচ্ছে। বাড়ির জমি খাচ্ছে কুমিরে, ঘরের ভূঁই খাচ্ছে উঁইয়ে। আমি চললাম বাপের ভিটি পাহারা দিতে। মামারা বললেন, সে তো ভালো কথা, ছেলেপুলে নিয়ে হাতপা ছড়িয়ে থাকো। তা হলে আমরাও মাঝেমধ্যে বাড়ি গিয়ে দুচারদিন থেকে আসতে পারি। বাড়ির কলাটা মুলোটা নিয়েও আসতে পারি!
গনাইসারে আমার নানাবাড়ির নাম চোকদার বাড়ি। সে গ্রামের সবচেয়ে বিখ্যাত বাড়ি। কোমর সমান উঁচু উঁচু পাকা ভিতের ওপর এক একজনের চৌচালা ঘর। ঘরের চালার টুয়ায় টিনের পাত কেটে ডানামেলা কবুতর বসানো। চালার চারদিকে লেসের মত টিনের নকশাকাটা ঝালর। ঘরের ভেতর মাঝখানে নকশা তোলা সিংহদরজা! গনাইসার গ্রামে যাওয়ার পর এই চোকদার বাড়ি হলো আমার অনবদ্য শৈশবের মায়াপুরী। আমার সুরপিয়াসী ভাবুক মনটার লীলাভূমি। এখানে আমার গানের মায়াতরু তরতর করে চারদিকে ডালপালা ছড়াতে লাগলো। তবে তা মোটেও প্রথাগত সংগীত শিক্ষার মাধ্যমে নয়, শিক্ষক অবশ্য পেলাম একজন, তার নাম থ্রি ব্যান্ড রেডিও। রেডিও আমার গানপাগল মনটাকে কানায় কানায় পূর্ণ করে দিল। আর এক শিক্ষক আমার কান, আমার শ্রুতি। যখন রেডিও শুনি, ‘কানের ভিতর দিয়া মরমে’ প্রবেশ করিয়ে নিই গান, ব্যাস, তাতেই হয়ে যায়। গ্রামে থাকাকালীন আমি সংসারে কর্তৃত্বের ক্ষমতা পেলাম অনেকখানি। সবচে বড় লাভ আমার গানের ক্ষেত্রে। কারণ আব্বা থেকে গেছেন ঢাকায়। তাঁর চাকরি সেখানে। কাজেই রেডিওর পুরো কর্তৃত্ব আমার হাতে! আব্বা সপ্তাহে সপ্তাহে বাড়ি আসেন। সাপ্তাহিক ছুটি রবিবার। সোমবার সকালে আবার চলে যান। একদিনের অবস্থানে আব্বা সকাল বেলার খবর ছাড়া রেডিও শোনার আর তেমন কোনো সময় পান না। বাড়ি এসে আব্বা বাজার করেন, গাছ লাগান, মাছ ধরেন, বেড়া বাঁধেন, দড়ি পাকান, আমাদের অংক আর ইংরেজি বুঝিয়ে দেন। আব্বার অনুপস্থিতিতে আমি ভাইবোনদের অভিভাবক। ওদের শাসন করি। লেখাপড়া শিখাই। তবে নিজের লেখাপড়াটা প্রথম বছর শিকেয় তোলা থাকলো। ঢাকা থেকে গ্রামে আসার সময় আমি ক্লাস ফাইভের ছাত্রী। কমলাপুর শেরে বাংলা স্কুলে তিনচার মাস ফাইভের ক্লাসও করেছি। কিন্তু গ্রামে আসার পর ৬৭ সনটা এমনিই চলে গেল। স্কুল নেই, লেখাপড়া নেই, দিব্যি ফড়িংয়ের দোয়েলের জীবন! সংসারের কাজকর্ম বাদে বাকি সময় আমি গান নিয়েই পড়ে থাকি।
সে সময়টায় ভারতীয় গানের পাশাপাশি বাংলাদেশের গানেরও স্বর্ণযুগ চলছিল। আকাশবাণী কোলকাতা আর রেডিও বাংলাদেশ (স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত বলা হত রেডিও পাকিস্তান)-এর গানের অনুষ্ঠানগুলো সব মুখস্থ। আকাশবাণীতে শনিবার সাড়ে তিনটা থেকে চারটা আর রবিবার তিনটা থেকে চারটা ~ এই দুটো অনুরোধের আসরের জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকতাম। বাংলাদেশের অনুরোধের আসরে শ্রোতাদের কাছ থেকে পাওয়া চিঠিপত্রের উত্তর দেওয়া হত। একটা গানের জন্য দশ বারোজন শ্রোতার নাম পড়া হত। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে এরা গান শুনতে চেয়ে চিঠি লিখেছেন। যাদের নাম পড়া হতো, মনে হতো ওরা বিশ্বের সবচেয়ে ভাগ্যবান মানুষ। আমার নাম যদি কখনো বলতো! দু একবার পছন্দের গানের তালিকা লিখে চিঠিও লিখেছি। অনুষ্ঠানের সময় কান পেতে থাকতাম, এই বুঝি আমার নাম বলবে! আবার ভাবতাম, বলবে কেন, আমি তো অন্য গান শুনতে চেয়েছিলাম! আরও বড় হয়ে জেনেছি, এসব নাম ডামি। বানিয়ে বলা হয়। কী কাণ্ড! মিছে কথা বলার দরকার কী? মিথ্যে লোকের নাম না বললে কী হয়? ঐ সব গান তো শোনার জন্য সবাই এমনিই উন্মুখ হয়ে থাকে! অনুরোধের আসরগুলো বেশি সময় ধরে হত। সে অনুষ্ঠানের গানগুলো শোনার জন্য আমার খুব প্রস্তুতি থাকতো। খাতা কলম নিয়ে বসতাম। গানের গতির সাথে লেখার গতি মিলতো না। পুরো লাইন লিখতে পারতাম না। সে সব জায়গা ফাঁকা রয়ে যেত। আবার অপেক্ষা করতাম, কবে আবার সে গানটি বাজবে তার জন্য। কোনো কোনো দিন আকাশবাণীর অনুরোধের আসরে দশটা গানের মধ্যে হয়তো আটটাই বিখ্যাত বা প্রিয় গান বাজানো হত, আবার কখনো হয় তো অত পরিচিত নয় বা খুব পছন্দেরও নয় এমন গানও বাজানো হত। যেদিন প্রিয় গান বেশি শুনতে পেতাম সেদিন মনে হত, আমার যেন ভালো একটা অর্জন হলো। একটা সোনার কৌটোয় রেখে দিতাম সেই সব অর্জিত রত্ন। ঘুমের জন্য রাতের অনুরোধের আসরগুলো অনেক সময় শুনতে পারতাম না। তখন দুঃখে বুক ফেটে যেত আমার। ইশ, না জানি কত সুন্দর গান বেজেছে ঐ অনুষ্ঠানে!
সন্ধ্যার দিকে রেডিওকে নানাদিকে ঘুরিয়ে রেডিও সিলোন সেন্টারটা কখনো কখনো পাওয়া যেতো। একটা বাংলা গানের অনুষ্ঠান হতো সে সময়। কিন্তু শব্দ স্পষ্ট হতো না। এই একটু শোনা গেল আবার কোথায় হারিয়ে গেল। সঠিক সাউন্ড ওয়েভ ধরার জন্য রেডিয়োকে কানের কাছে নিয়ে নানাভাবে এ কাত ও কাত করে শোনার চেষ্টা করতাম। প্রায় পিঁপড়ের রেঞ্জে শব্দ শোনা গেলেও খুশি। গানের সুরটা তো ধরা গেল! সিলোনের বাংলা গানের অনুষ্ঠানে পণ্য বিজ্ঞাপন প্রচার হত। লিপটন চায়ের একটা জিঙ্গেল ছিল, দারুণ মন কাড়ানিয়া সুর। কিন্তু প্রথম লাইন ‘চায়ে নিয়ে নিন’ আর শেষ লাইন ‘লিপটন পান করুন’* ছাড়া মাঝখানের একটা বর্ণও বুঝতাম না। তাতে কী! নিনিনিনি করে সেসব জায়গা ভরাট করে গানের পাশাপাশি সারাদিন জিঙ্গেলও গাই! লতা মুঙ্গেশকর, আশা ভোঁশলে (মারাঠি ‘ভোঁশলে’ পদবীর সাথে পরিচিত নই বলে ঐ শব্দটা বুঝতে বহুদিন লেগেছে। কখনো মনে হতো আশাভ হোসলে, কখনো আশা হোশলে, কখনো আশা ভাষলে ইত্যাদি।) প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, এদের গান শুনে বুঁদ হয়ে থাকি। একটা গান একবার শুনে মন ভরে না। আবার কবে শুনতে পাবো তার কোনা নিশ্চয়তা নেই। শুধু মনে হয় ইশ, আমাদের যদি কলের গান থাকতো, এসব গানের রেকর্ড থাকতো, সারাদিন বাজিয়ে শুনতাম! তবে শ্রুতিই ছিল আমার রেকর্ড আর স্মৃতি ছিল খাতা। একবার শুনে একটা গানের প্রায় পুরো সুর ধরে ফেলতে পারতাম। দু তিনবার শুনলে মুখস্থ হয়ে যেত কথা। ভারতীয় বাংলা গানের পাশাপাশি বাংলাদেশের অজস্র গান মুখস্থ হয়ে যেতে থাকে আমার। যার ছায়া পড়েছে, গান হয়ে এলে, মনে যে লাগে এত রঙ, আমি রূপনগরের রাজকন্যা, আকাশের হাতে আছে একরাশ নীল, সাতটি রঙের মাঝে আমি মিল খুঁজে না পাই, ঝির ঝির হাওয়া তার একটু একটু ছোঁয়া ~ গানের লাইন লিখে শেষ করা যাবে না।
সে সময়ে আমাদের দেশে নির্মিত হচ্ছিল চমৎকার সব সিনেমা। রেডিওতে বাজতো সে সব সিনেমার গান। সিনেমার গানগুলো খুব ভালো লাগতো। অনেক জনপ্রিয় হিট গান শেখা হয়ে যায় আমার। আমার সেই বিশেষ দক্ষতার চুপচুপ গলায় আমি সারাক্ষণ আপন মনে গান করি, সুরগুলোকে ঝালিয়ে তুলি। সিনেমার গান শুনে শুনে সিনেমা দেখার ইচ্ছে তীব্র হয়ে উঠতে থাকে। একটা সিনেমা দেখতে পারা মানে বিশ্ব জয় করা এমনই মনে হয়। কিন্তু তখনও গ্রামেগঞ্জে বিনোদন হিসেবে সিনেমা প্রচলিত হয়নি। আছে যাত্রাপালা। তবে যাত্রা! যাত্রা!! যাত্রা!!! এমন নাটকীয় তর্জন গর্জনেও যাত্রা আসতো না তখন, আসতো লোকমুখে, গানে গানে! হয়তো এক গ্রামে প্রদর্শিত হয়েছে কোনো যাত্রাপালা, তার গানগুলোর পিঠ ফুঁড়ে বের হত ঝিলমিল ডানা। চললো উড়ে গান, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। হাটে মাঠে হালটে পালানে উঠোনে গানের কইতরেরা ঠোঁটে করে নিয়ে আসতো যাত্রাপালার সওগাত। গনাইসার গ্রামে আমাদের বসবাসকালীন যাত্রাপালা হলো কয়েকবারই। দু বার দেখার সুযোগ হলো। একবার ‘রূপবান; আর একবার ‘আলোমতি ও প্রেমকুমার’। ‘রূপবান’ দেখতে নিয়ে গেলেন আম্মা। আলোমতি দেখেছিলাম জ্ঞাতি ভাইবোনদের সাথে। যাত্রা দেখতে হয় সারা রাত জেগে। যাত্রাদল গ্রামে আসার পর উৎসবের সাড়া পড়ে যায়। বিশেষ করে নারীমহলে। গ্রামীণ নারীদের জীবনে বিনোদন বলতে কিছুই নেই। দিনমান কাজ করে শেষ বেলায় পুকুরে ডুব দিয়ে কোনো কোনো বউ-ঝি হয়তো এ ওর চুল বেঁধে দেয়া বা উকুন বেছে দেয়ার একটা অবসর বের করে নেন। তখন সুখ দুঃখের কথা হয়, সেটুকই বিনোদন। মঞ্চের তিনপাশ ঘিরে দর্শক। নারীদের জন্য আলাদা বসার জায়গা। ছেলেপুলেদের ঘুম পাড়িয়ে আপা-বুজি-ভাবী মা-খালা-চাচীরা গায়ে চাদর জড়িয়ে ঘোমটার আড়ালে নিজেকে মুড়িয়ে যাত্রা দেখতে বসেন।
রূপবান পালা দেখতে আমি আম্মার সাথে বসলাম বটে, তবে মঞ্চের অভিনয়ের চেয়ে মঞ্চের আড়ালের দৃশ্য দেখার জন্যই আমার মন অস্থির। গ্রামের চেয়ারম্যান আমজাদ হোসনের বহির্বাটিতে বাঁশের খুঁটি ঘিরে কানাত টেনে মঞ্চ। নামা ওঠার জায়গাটা কাপড় দিয়ে ঘেরা। সেখান দিয়ে আসমানি খিলান খুলে ধুমধাম করে রাজা আসে, রানী আসে। রূপবান, তাজেল, দাইমা, বিবেক আসে, ডায়লগ বলে, হাসে কাঁদে, আবার টুক করে জাদু-রাজ্যের খিলানের ওপারে মিলিয়ে যায়।
ওখানে কী হচ্ছে? আরে, ওখানেই তো যাত্রার মানুষগুলো সাজ করে! মুখে রঙ মাখে! মুকুট লাগায়, জরির পোশাক পরে! কোমরে তরোয়াল গোঁজে! থাকতে না পেরে আম্মাকে লুকিয়ে একবার সাজঘরে উঁকি দিয়ে এসেছি। দেখে এসেছি রূপবানের অভিনয় করছে যে অপরূপ সুন্দরী নারী, তাকে! মরি মরি! কী রূপ তার! কালো কুচকুচে চুল! টানা টানা চোখ আর পানপাতার মত টলটলে মুখ। জোরে জোরে চিৎকার করে সে ডায়লগ বলেছে আর গান গেয়েছে। ‘হায় প্রাণপতি গো আমি কোন বা প্রাণে তোমায় রেখে যাই!’ রহিম বাদশাকে বনের কুটিরে রেখে রূপবান যাচ্ছে তার জন্য দুধের জোগাড় করতে, ফল আনতে, জল আনতে। কিন্তু পতির জন্য উৎকণ্ঠায় তার প্রাণ আইঢাই। সেই গান। ‘তোমায় রেখে প্রাণের স্বামী, জল আনিতে যাই গো আমি, ফিরে এসে পাই ও কি না পাই, হায় প্রাণপতি গো…!’ জল নিয়ে এসে দেখে তার ‘প্রাণপতি’ বাঘের মুখে। রূপবান বাঘের পায়ে আছড়ে পড়ে, ‘খেয়ো না খেয়ো না বাঘারে ও বাঘা খেয়ে না মোর পতি রে!’ রূপবানের এই সুরেলা নিষেধ শুনতে বনের বাঘার বয়েই গেছে! সে হালুম করে রহিম বাদশাহরূপী পতুলটা মুখে নিয়ে রূপবানকে লেজে খেলাতে থাকে। রূপবান আবার আছড়ে পড়ে চেঁচিয়ে ওঠে, হাতে ধরি পায়ে পড়ি রে ও বাঘা খেয়ো না মোর পতিরে…..আহ! রূপবান বারো বছরের কন্যা হলে কী হবে! দারুণ জোরালো তার কণ্ঠ! গানগুলো আমার বুক এফোঁড় ওফোঁড় করে দেয়! বিরতির সময় অনেকেই রূপসী রূপবানকে দেখতে সাজঘরের দিকে দৌড় দেয়। সাজঘর হলো চেয়ারম্যান বাড়ির রান্নাঘর। রান্নাঘরে কয়েকটা জলচৌকি আর চাটাই পাতা। বেড়ার ফাঁক দিয়ে দেখি রূপবান এক হাতে তালপাখার হাওয়া করছে আর এক হাতে আস্ত একটা পেঁয়াজ নিয়ে কচকচ করে চিবিয়ে খাচ্ছে। ব্যাপার কী? না, গান গেয়ে বেচারির গলা ছিঁড়ে যাচ্ছে। কাঁচা পেয়াজ খেলে গলার একটু আরাম হয় তাই। আম্মার বকা খাওয়ার ভয়ে ঐটুকু দৃশ্য দেখেই দৌড়ে চলে এসেছি। নায়িকাকে পেঁয়াজ খেতে দেখে আসার আনন্দে আমি তখন আত্মহারা। আম্মাকে বলি, ইশ আম্মা, রূপবান মেয়েটা কী যে সুন্দর! ঠিক যেন পরী! শুনে হেসে ওঠেন আম্মা আর সঙ্গিনীরা। রূপবান মেয়েটা? ও তো মেয়েই নয়, ব্যাটা ছেলে! পুরুষ! বলে কী? পুরুষ নায়িকা? যাত্রায় যতগুলো মেয়ে আছে তার ক‌য়েকটাই নাকি পুরুষ? তারপর কিভাবে ওরা মেয়ে সাজে সেসব কারসাজির গল্প করতে করতে নারীরা এ ওর গায়ে হেসে লুটিয়ে পড়ে। আমিও হাসি। আনন্দে লজ্জায় বোকামিতে।
রূপবান আর আলোমতি ও প্রেমকুমার যাত্রাপালা শেষ হয়ে যাওয়ার পর বহুদিন পর্যন্ত গানগুলো লোকের মুখে মুখে ফেরে। গ্রামের লোকজন এ বাড়ি ও বাড়ির ওপর দিয়ে চলাচলের রাস্তা বানিয়ে নেয়। নানা বাড়ির যে ঘরটাতে আমরা থাকতাম তার সামনে উত্তর দক্ষিণে দুটি বাহিরবাড়ি আঙিনা ছিল। লোকজন খেতে খামারে বা হাটে বাজারে যাওয়ার জন্য ঐ উঠোন পেরিয়ে তারপর হালটে নামতো। তারপর আল ধরে কেউ ক্ষেতে কিংবা সড়কে উঠে হাটে বা দোকানে চলে যেত। এই যাতায়াত পথটিতে অনেকের মুখে ‘ও দাইমা কিসের বাদ্য বাজে গো’, অথবা ‘শোন তাজেল গো’, অথবা ‘আমি আলো একা ঘরে থাকি আমার মাতাপিতা চাকরি করে মহারাজের বাড়ি গো’ এসব গান গাইতে গাইতে চলে যেত। কখনো অনেক রাতে হাট-ফেরতা মানুষ গলা ছেড়ে রূপবান কিংবা আলোমতি বা নীনা হামিদ অথবা আব্দুল আলীমের গান গেয়ে বাড়ি ফিরতো। ওসব গান আমার মনকে কেমন অজানা আনন্দে আকুল করে তুলতো। আমার মনে হতো, আমিও ওদের মত ওদের সাথে হাতে একটা ঝোলা কিংবা মাথায় জিনিসপত্রের বোঝা নিয়ে মেঠোপথ ধরে বাড়ি ফিরে আসছি। আমার ঝোলা থেকে, টুকরি থেকে কিংবা ফতুয়ার জেব থেকে ঝিলমিল ডানা মেলে হিরামন পাখির মত আমার সাথে উড়তে উড়তে চলেছে ঐসব গানেরা। (চলবে)

ছবি: আমার দেশাত্মবোধক গানের অ্যালবাম শ্যামাঙ্গিনী বাংলা আমার-এর ভূমিকাপত্র।
*কারো যদি লিপটন চায়ের জিঙ্গেলটার কথাগুলো জানা থাকে, দিতে অনুরোধ রইলো।
১৭ জুন, ২০২০
ঝর্না রহমান

================ অধ্যাপক ঝর্না রহমান ==============

বিক্রমপুরের কৃতী সন্তান অধ্যাপক ঝর্না রহমান-এর জন্ম ২৮ জুন ১৯৫৯ সালে। তাঁর গ্রামের বাড়ি মুন্সিগঞ্জ সদরের কেওয়ার গ্রামে। ঝর্না রহমান একজন কথাসাহিত্যিক,কবি ও সংগীত শিল্পী। চল্লিশ বছর যাবৎ তিনি লেখালিখির সাথে জড়িত।

গল্প উপন্যাস কবিতার পাশাপশি লেখেন প্রবন্ধনিবন্ধ, ভ্রমণসাহিত্য, শিশুসাহিত্য, নাটক। ১৯৮০ সনে বাংলাদেশ পরিষদ আয়োজিত একুশের সাহিত্য প্রতিযোগিতায় ছোটগল্পে জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে সাহিত্যক্ষেত্রে তাঁর আত্মপ্রকাশ। চারটি সম্পাদনা গ্রন্থসহ এ পর্যন্ত প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ৫০। তাঁর একাধিক গল্প ও কবিতা ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে এবং তা দেশে ও বিদেশের বিভিন্ন মর্যাদাসম্পন্ন সংকলনে প্রকাশিত হয়েছে। কানাডার ভ্যাংক্যুভার বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য Trevor Carolan সম্পাদিত দক্ষিণ এশিয়ার গল্প সংকলন The Lotus Singers গ্রন্থে তাঁর গল্প অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তিনি পদ্মশ্রী খেতাবপ্রাপ্ত পাঞ্জাবী সাহিত্যিক অজিত কৌর আয়োজিত সার্ক সাহিত্য সম্মেলনে একাধিকবার সাফল্যের সাথে অংশগ্রহণ করেছেন। তাঁর পড়াশোনার বিষয় বাংলা ভাষা ও সাহিত্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর।

পেশাগত ক্ষেত্রে তিনি বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, বিভাগীয় প্রধান, বাংলা। অবসরে তাঁর কর্মক্ষেত্র লেখালিখি। ঝর্না রহমান একাধারে একজন গীতিকার সুরকার এবং বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের নিয়মিত কণ্ঠশিল্পী।

এ ছাড়া ‌তি‌নি কথাসা‌হি‌ত্যের ছোট কাগজ পরণকথা এবং অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউ‌ন্ডেশ‌নের মুখপত্র ত্রৈমা‌সিক অগ্রসর বিক্রমপুর সম্পাদনা ক‌রেন ।

তাঁর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বই:গল্পগ্রন্থ: ঘুম-মাছ ও এক টুকরো নারী, স্বর্ণতরবারি, অগ্নিতা, কৃষ্ণপক্ষের ঊষা,নাগরিক পাখপাখালি ও অন্যান্য,পেরেক, জাদুবাস্তবতার দুই সখী,নিমিখের গল্পগুলো,বিপ্রতীপ মানুষের গল্প,বিষঁপিপড়ে, Dawn of the Waning Moon (অনূদিত গল্প) ,তপতীর লাল ব্লাউজ, উপন্যাস: ভাঙতে থাকা ভূগোল, পিতলের চাঁদ, কাকজোছনা। কাব্য: নষ্ট জোছনা নষ্ট রৌদ্র, নীলের ভেতর থেকে লাল, জল ও গোলাপের ছোবল, জলজ পঙক্তিমালা, ঝরে পড়ে গোলাপি গজল, চন্দ্রদহন, উড়ন্ত ভায়োলিন, হরিৎ রেহেলে হৃদয়। কিশোর উপন্যাস: আদৃতার পতাকা, হাতিমা ও টুনটুনি, নাটক: বৃদ্ধ ও রাজকুমারী, প্রবন্ধ: রবীন্দ্রনাথ: সেঁজুতি, রৌদ্রজলের গদ্য।

মা:রহিমা বেগম,বাবা:মোঃ মোফাজ্জল হোসেন,গ্রামের বাড়ি:কেওয়ার,মুন্সিগঞ্জ। জন্ম:২৮ জুন,১৯৫৯।

নিউজটি শেয়ার করুন .. ..

‘‘আমাদের বিক্রমপুর-আমাদের খবর

আমাদের সাথেই থাকুন-বিক্রমপুর আপনার সাথেই থাকবে!’’

Login করুন : https://www.bikrampurkhobor.com

আমাদের পেইজ লাইক দিন শেয়ার করুন

https://www.facebook.com/BikrampurKhobor

একটি উত্তর দিন

দয়া করে আপনার কমেন্টস লিখুন
দয়া করে আপনার নাম লিখুন