করোনায় বাবা-মাকে হারিয়ে: ‘আমি আর ডাক্তারি পেশায় থাকতে চাই না’-ডা. জাকি উদ্দিন

0
22
করোনায় বাবা-মাকে হারিয়ে: ‘আমি আর ডাক্তারি পেশায় থাকতে চাই না’-ডা. জাকি উদ্দিন

প্রকাশিত: শুক্রবার, ৯ জুলাই ২০২১ইং।। ২৫শে আষাঢ় ১৪২৮ বঙ্গাব্দ (বর্ষাকাল)।

বিক্রমপুর খবর : অনলাইন ডেস্ক : বাবা-মা চেয়েছিলেন ছেলে চিকিৎসক হবে। বহু সাধনায় বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণ করেছেন সন্তান। কিন্তু এই পেশাই কি না কাল হলো তার?

দায়িত্ব ছিল করোনা ওয়ার্ডে। কিন্তু কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা না থাকায় বাসা থেকে চলত হাসপাতালে আসা-যাওয়া। একপর্যায়ে বয়োবৃদ্ধ বাবা-মায়ের দেহে শনাক্ত হয় করোনা।

শত চেষ্টা করেও তাদের আর বাঁচানো যায়নি। তাই চিকিৎসক ছেলের আক্ষেপ, ‘আজ যদি ডাক্তার না হতাম, তাহলে হয়তো করোনা ওয়ার্ডে চিকিৎসা দিতে হতো না। আর করোনা ওয়ার্ডে চিকিৎসা না দিলে আমার মা-বাবাও করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যেতেন না।’

এই গল্প কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক মো. জাকি উদ্দিনের।

কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে দায়িত্ব পালন করতেন ডা. জাকি উদ্দিন। করোনা মহামারিতে তিনি অনেক মানুষকে চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। কিন্তু ছয় মাসের ব্যবধানে করোনায় নিজের মা-বাবাকে হারিয়ে ডাক্তারি পেশার ওপর ক্ষুব্ধ তিনি। এ অবস্থায় ‘ডাক্তারি পেশা ছেড়ে দেয়া উচিত’ বলে গত বুধবার রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ট্যাটাস দিয়েছেন এই চিকিৎসক।

ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি লিখেছেন, ‘আমার মরহুম বাবা ও মায়ের জন্য দোয়া করবেন। কোভিড রোস্টারে নাইট ডিউটিতে ছিলাম। আব্বুর অবস্থা খারাপ শুনে ডিউটি থেকে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে হাসপাতালে নিয়ে আসলাম। কিন্তু আটকাতে পারলাম না। জ্ঞান থাকা অবস্থায় বলতেছিল, বড় বাবু ব্যবস্থা করবে। আমি আব্বু-আম্মুর খুব সুন্দর ব্যবস্থা করে দিছি। একদম এতিম হয়ে গেছি ছয় মাসের ভেতর। কোভিড দিয়ে মেরে ফেলছি। নো প্যারেন্টস ডিজার্ভ অ্যা চাইল্ড লাইক মি, হু কিলস দেয়ার প্যারেন্টস উইদইন সিক্স মানথস (কোনো বাবা-মায়ের যেন আমার মতো সন্তান না থাকে, যে তার বাবা-মাকে ছয় মাসের মধ্যে মেরে ফেলেছে)। আই থিঙ্ক আই শেল নট কন্টিনিউ দিজ প্রফেশন এনিমোর (আমার আর এই পেশায় থাকা উচিত না বলে মনে করি)।’

গত বুধবার রাতে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। বোনের কাছে বাবার অসুস্থতার খবর শুনে দ্রুত বাসায় ছুঁটে যান ডা. জাকি। এরপর কুমিল্লার একটি হাসপাতালে ভর্তি করানোর পর তার মৃত্যু হয়। ডা. জাকির ডাক্তারি পেশা ছেড়ে দেওয়ার পর চিকিৎসকদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, হাসপাতালে ৩৯তম বিসিএসের ৪০ জন চিকিৎসক, কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজের ১২০ জন সহকারী অধ্যাপক ও হাসপাতালের সুপারভিশনে থাকা চিকিৎসকসহ ১৫০ জন কোভিড ইউনিটে সেবা প্রদান করছেন। পাশাপাশি রয়েছেন নার্স ও অন্যান্য স্টাফরা। সবমিলিয়ে প্রায় তিনশ জন কোভিড ইউনিটে সেবা দিচ্ছেন।

হাসপাতালটিতে করোনায় আক্রান্ত ও উপসর্গের রোগীদের চিকিৎসা সেবা শুরু হওয়ার পর চিকিৎসক ও নার্সদের জন্য আলাদাভাবে ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে রাখার জন্য কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগ অফিস, কুমিল্লা ক্লাব ও আবাসিক হোটেল গোল্ডেন টাওয়ারে ব্যবস্থা করা হয়। কিছুদিন পর ঠিকাদারদের দায়িত্বে অবহেলার কারণে চিকিৎসকদের কোয়ারেন্টাইনে ব্যবস্থা বাতিল করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এছাড়া প্রণোদনার কথা উল্লেখ থাকলেও কুমিল্লার কোনও চিকিৎসকই প্রণোদনা পাননি বলে অভিযোগ করেছেন।

বিএমএ কুমিল্লার সাধারণ সম্পাদক ডা. আতাউর রহমান জসিম বলেন, ‘কী বলবো ভাষা হারিয়ে ফেলেছি! ছয় মাসের ব্যবধানে তরুণ ডাক্তারটি মা-বাবাকে হারিয়ে এতিম হয়ে গেলো। তার বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা করোনা ডেডিকেটেড ইউনিটে দায়িত্বরতদের জন্য কোয়ারেন্টাইন বা আবাসিক ব্যবস্থা না থাকাকে দায়ী করছেন। কত টাকা এই দেশে অপচয় হয়! পুকুর কাটা, খিচুড়ি রান্না, কলাগাছ লাগানোসহ প্রশিক্ষণের নামে বিদেশ ভ্রমণ, কেনাকাটার লাগামহীন আকাশচুম্বী দাম, নাম জানা, নামসর্বস্ব প্রজেক্ট কত খাতেই তো অর্থ অপচয় হয়। এ ব্যাপারে তাদের জন্য কী উন্নত ব্যবস্থাপনা করা যায় না?’

ডা. আতিক নামে কোভিড ইউনিটের এক চিকিৎসক বলেন, ‘প্রণোদনা নেই, কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা নেই, জীবনের নিরাপত্তা নেই। আবার সরকারি চাকরি করি বলে কিছু বলতেও পারব না। এ কেমন কথা? আমরা কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থাসহ সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।’

এ ঘটনায় শোক বার্তা দিয়েছে ৩৯ তম বিসিএস সমিতি। ডা. জাকির পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি
চিকিৎসকদের সকল প্রকার নিরাপত্তার ব্যবস্থার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. রেজাউল করিম বলেন, ‘জাকিরের বাবা-মা হারানোর ঘটনা বেদনাদায়ক। এখানে কাজ করা সবাই বেশ ঝুঁকিতে আছেন। আমরা সরকারি চাকরিজীবী। মন্ত্রণালয় যেভাবে চাইছে সেভাবে কাজ করছি। কিছু পরিবর্তনের সামর্থ্য তো আমাদের নেই! আশা করি মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিয়ে ভাববে।’

করোনায় আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত সারা দেশে ১৬০ জন চিকিৎসকের মৃত্যু হয়েছে। তাদের বেশির ভাগই করোনার চিকিৎসা দিতে গিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন।

উল্লেখ্য যে দেশে গতবছর করোনা ভাইরাসে (কোভিড-১৯) আক্রান্ত হয়ে ১২৩ জন চিকিৎসকের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছিল দুই হাজার ৮৮৭ জন চিকিৎসক।  

নিউজটি শেয়ার করুন .. ..             

   ‘‘আমাদের বিক্রমপুর-আমাদের খবর।

আমাদের সাথেই থাকুন-বিক্রমপুর আপনার সাথেই থাকবে!’’

Login করুন : https://www.bikrampurkhobor.com

আমাদের পেইজ লাইক দিন শেয়ার করুন।       

জাস্ট এখানে ক্লিক করুন। https://www.facebook.com/BikrampurKhobor

আপনার আশেপাশে সাম্প্রতিক খবর পাঠিয়ে দিন email bikrampurkhobor@gmail.com

একটি উত্তর দিন

দয়া করে আপনার কমেন্টস লিখুন
দয়া করে আপনার নাম লিখুন