প্রকাশিত : সোমবার ২১ অক্টোবর ২০২৪, খ্রিষ্টাব্দ।। ০৬ কার্তিক ১৪৩১ বঙ্গাব্দ(শরৎকাল)।। ১৭ রবিউস সানি ১৪৪৬ হিজরি।
বিক্রমপুর খবর : অনলাইন ডেস্ক : আলাউদ্দিন খিলজী ১২৯৬ সালে আজকের এই দিনে ২১ অক্টোবর ১২৯৬ সালে আলাউদ্দিন খিলজী দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করেন। বস্তুত ভারতব্যাপী সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রথম পথ প্রদর্শনই আলাউদ্দিন খিলজীর সর্বপ্রধান কীর্তি। তার সাম্রাজ্য বিস্তার নীতিকে উত্তর ভারত ও দাক্ষিণাত্য এই দুভাগে ভাগ করা যায়। ১২৯৭ সালে গুজরাট, ১৩০১ সালে রণথম্ভোর, ১৩০৩ সালে চিতোর এবং ১৩০৫ সালে মালব বিজয় করেন আলাউদ্দিন খিলজী। তার রাজ্য শাসন ও প্রতিরক্ষা নীতি প্রশংসনীয়। মঙ্গোলদের ভারত আক্রমণ প্রতিহত করে তিনি ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।
মঙ্গোলদের হাত থেকে ভারতবাসীকে রক্ষায় অবদানঃ-
***************************************
পৃথিবীর ইতিহাসে তিনিই একমাত্র বীর যিনি মোঙ্গলদের ৬ বার পরাজিত করেছিলেন এর ফলে ভারতের লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন রক্ষা পেয়েছিল।
১২৯৭ থেকে ১৩০৬ সালের মধ্যে দুর্ধর্ষ মোঙ্গলরা ভারতবর্ষে ৬ বার আক্রমণ চালায়। প্রতিবারই দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি তাদের আক্রমণ প্রতিহত করতে সক্ষম হন।
১৩০৬ সালে মোঙ্গলরা ৬ষ্ঠ ও শেষ বারের মত দিল্লি আক্রমণ করে। সালতানাত আক্রমণের জন্য ১০০০০০ সৈন্যের একটি বাহিনী নিয়ে মোঙ্গল সেনানায়ক কোবেক, ইকবালমান্দ এবং তাইবু ভারত আক্রমণ করেন।
বিশাল মঙ্গল বাহিনীকে প্রতিরোধ না করে শান্তি চুক্তির প্রস্তাব দেন খিলজির সভাসদরা। কিন্তু খিলজি এর বিরোধিতা করে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেন।
১৩০৬ সালে ইরাবতী/রাভি নদীর তীরে সংঘটিত এক তীব্র যুদ্ধে মোঙ্গলরা প্রথম দিকে
দিল্লির সৈন্যরা ছত্রভঙ্গ করে দেয়। কিন্তু মালিক কাফুর তাদের পুনরায় সংগঠিত করেন এবং মোঙ্গলদের পাল্টা আক্রমণ করেন।
এই আক্রমণ মোকাবেলা করতে না পেরে মোঙ্গলরা পশ্চাৎপসরণ করে। প্রথমবারের মতো দিল্লির সৈন্যরা পলায়নরত মোঙ্গলদের পশ্চাদ্ধাবন করে এবং বহুসংখ্যক মোঙ্গল সৈন্যকে হত্যা অথবা বন্দি করতে সক্ষম হয়। এই অভিযানে অংশগ্রহণকারী মোঙ্গলদের মধ্যে মাত্র ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ জন জীবন্ত অবস্থায় চাঘাতাই খানাতে প্রত্যাবর্তন করতে সক্ষম হয়েছিল।
এটি ছিল আলাউদ্দিনের শাসনকালে মোঙ্গলদের সর্বশেষ ভারত আক্রমণ।
ইতিহাসবিদদের মতে, ১৩০৬ সালে মোঙ্গলদের পরাজয়ের পর আলাউদ্দিনের নির্দেশে নিহত মোঙ্গল সৈন্যদের মাথার খুলি দিয়ে দিল্লির বাদায়ুন দরজার সামনে একটি ‘টাওয়ার’ নির্মাণ করা হয়েছিল, যাতে ভবিষ্যৎ আক্রমণকারীরা সতর্ক হয়!
আলাউদ্দিন খিলজি সম্পর্কে অপবাদঃ-
***********************************
আলাউদ্দিন খিলজি সম্পর্কে যে বিষয়টি নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হয় তাহল রাণী পদ্মাবতীকে পাওয়ার লালসায় তিনি চিতোর আক্রমণ করেন এবং রাজা রতন সিং কে হত্যাকরেন। রাণী পদ্মাবতী সম্মান বাঁচানোর জন্য ১৩ হাজার রমণী সহ চিতায় ঝাঁপিয়ে পড়ে জীবন বিসর্জন দেন। এবিষয়ে একটি মুভিও নির্মিত হয়েছে।
মূলত এটি একটি অপবাদ ছাড়া আর কিছুই নয়।
ইতিহাসে পদ্মাবতী নামের কোন রাণীকে খুঁজে পাওয়া যায় না।
রানী কর্নাবতীই মহাকাব্যের পদ্মাবতী নয়তো?
***************************************
রানী পদ্মাবতী নিয়ে কথা বলার আগে রানী কর্ণাবতী নিয়ে কথা বলা যাক। চিতোরের রাজা ‘মহারাজা সংগ্রাম সিং’ এর সাথে তার বিয়ে হয় এবং ফলে চিতোরের রানী হিসেবে গণ্য হন। দিল্লী দখলের লক্ষ্যে মহারাজা সংগ্রাম সিং এর নেতৃত্বে হিন্দুদের সম্মিলিত বাহিনীর সাথে সম্রাট বাবরের যুদ্ধ হয় ১৫২৭ সালে, যা খানুয়ার যুদ্ধ নামে পরিচিত। এই খানুয়ার যুদ্ধে হিন্দুদের সম্মিলিত বাহিনী পরাজয় বরণ করে এবং মহারাজা সংগ্রাম সিং ভীষণভাবে আহত হন। ১৫২৮ সালে আহত মহারাজা সংগ্রাম সিং মৃত্যু বরণ করেন।
পরবর্তীতে ১৫৩৫ সালে রানী কর্ণাবতী ও দূর্গের অন্যান্য নারীরা শত্রুর আক্রমণে ভীত হয়ে বিষ পানে আত্মহত্যা করেন।
রানী পদ্মাবতীর মিথ নাকি বাস্তব?
******************************
প্রায় সব বিখ্যাত ইতিহাসবিদ স্বীকার করেছেন যে, সর্বপ্রথম ১৫৪০ সালে মালিক মুহাম্মদ জায়াসির লিখিত পদ্মাবত নামক একটি মহাকাব্যে তাঁর উল্লেখ পাওয়া যায়। এর পূর্বে ইতিহাসে কোথায়ও তার উল্লেখ পাওয়া যায়নি । আমার ধারণা মালিক মুহাম্মদ জায়াসি রানী কর্ণাবতীর ঘটনায় প্রভাবিত হয়ে এই মহাকাব্যটি লিখেন। পদ্মাবত মহাকাব্যে বর্ণিত রানী পদ্মাবতীর সাথে রানী কর্ণাবতীর অনেক মিল রয়েছে। যেমন, তাদের দুইজনের স্বামীর রাজ্য ছিল চিতর।
দু’জনের স্বামী যুদ্ধে আহত হয়ে মৃত্যু বরণ করে। দু’জনই আগুনে (বা রানী কর্ণাবতী বিষ পাণে) আত্নহত্যা করেন।
জহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের অধ্যাপক আদিত্য মুখ্যপাধ্যায় বলেন যে, তৎকালীন ইতিহাসে রানী পদ্মাবতীর কোন অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। তিনি রানী পদ্মাবতীকে মালিক মুহাম্মদ জায়াসির কাল্পনিক সৃষ্টি হিসেবে গণ্য করেন । আলাউদ্দিন খিলজীর সমকালীন যুগে ২ টি বই প্রকাশিত হয় যার একটি লিখেছেন আমীর খসরু এবং অন্যটি নয়ন চন্দ্র সুরী।
এই দু’জনের লিখা ২ টি বইয়ে রানী পদ্মাবতীর কোন উল্লেখ ছিল না।
অধ্যাপক রাম পুনিয়ানি বলেন যে, পদ্মাবত মহাকাব্য পরবর্তীতে ভারতে বহুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং লোককাহিনী হিসেবে মর্যাদা পায়। হাস্যকর ব্যাপার হচ্ছে শতাব্দী পরে মানুষ এই মহাকাব্যকে সত্য হিসেবে বিবেচনা করে এবং রানী পদ্মাবতীকে ‘ঐতিহাসিক চরিত্র’ হিসেবে মনে করতে শুরু করে।
মুভির ট্রেলার রিলিজের পরে বেশ কয়েক জন ইতিহাসবিদ যাদের মধ্য ইফরান হাবিব, হারবান মুখিয়া, দেবদত্ত উল্লেখযোগ্য পরিষ্কারভাবে মত প্রকাশ করেন যে, রানী পদ্মাবতী একটি কাল্পনিক চরিত্র এবং ছবিটিতে দেখানো ঘটনাবলি অধিকাংশই ফিকশনাল।

#শেষ কথা,
ঐতিহাসিকদের মতে একজন আলাউদ্দিন খিলজি ছিলেন বলেই ভারতীয় উপমহাদেশ মঙ্গোলদের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা পেয়েছিল। ইতিহাস স্বাক্ষী মঙ্গোলরা যেখানে গেছে সেখানেই রক্তের গঙ্গা বয়েছে। শুধু বাগদাদ আর পোলেণ্ডেই তারা ২৬ লক্ষ লোক হত্যা করেছিল। তাদের হাতে নিহতের সংখ্যা কোটির উপরে। আর সেই হত্যাযজ্ঞ থেকে রেহাই পেয়েছিল ভারতীয়রা খিলজির কল্যাণেই।
সে হিসেবে উচিত ছিল তাকে বিশেষ সম্মানে অধিষ্ঠিত করা।
অথচ আফসোস! কল্পকাহিনির উপর ভিত্তি করে মহান এই শাসকের চরিত্রকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা চলছে নিরন্তর!!
#তথ্যসূত্র:
১. ইতিহাসের ইতিহাস, গোলাম আহমদ মোর্তজা
২. চেপেরাখা ইতিহাস, গোলাম আহমদ মোর্তজা
৩. Medieval India: From Sultanat to the Mughals Part – II, Satish Chandra
৪. Encyclopedia of Indian Events & Dates, S. B. Bhattacherje
৫. Folk Tales of Rajasthan, DINA NATH DUBE
৬. https://goo.gl/rk9AZL
৭. https://goo.gl/XngCY3
৮. https://goo.gl/42pqZE
৯. https://goo.gl/62JdND
১০. https://goo.gl/3bnc7Y
১১. https://goo.gl/k8gkr4
(বিজ্ঞাপন) https://www.facebook.com/3square1
নিউজটি শেয়ার করুন .. ..
‘‘আমাদের বিক্রমপুর–আমাদের খবর।
আমাদের সাথেই থাকুন–বিক্রমপুর আপনার সাথেই থাকবে!’’
Login করুন : https://www.bikrampurkhobor.com
আমাদের পেইজ এ লাইক দিন শেয়ার করুন।
জাস্ট এখানে ক্লিক করুন। https://www.facebook.com/BikrampurKhobor
















































