বিক্রমপুরের আলোকিত মানুষ কিংবদন্তী অনন্য সঙ্গীতশিল্পী প্রতিমা বন্দোপাধ্যায়ের প্রয়াণ দিবস আজ

0
2
বিক্রমপুরের আলোকিত মানুষ কিংবদন্তী অনন্য সঙ্গীতশিল্পী প্রতিমা বন্দোপাধ্যায়ের প্রয়াণ দিবস আজ

প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৯ জুলাই, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ।। ১৪ই শ্রাবন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ (বর্ষাকাল)।। ৩ সফর, ১৪৪৭ হিজরী।

বিক্রমপুর খবর : অনলাইন ডেস্ক : প্রতিমা বন্দোপাধ্যায়ের বিক্রমপুরের বাহেরক গ্রামে জন্ম

বাবা মণিভূষণ চট্টোপধ্যায়ের যথেষ্ট খ্যাতি ছিল গাইয়ে হিসেবে। চমৎকার ঠুংরি, দাদরা গাইতেন। ওস্তাদ বাদল খানের শিষ্য ছিলেন। বেশ কিছু গানের রেকর্ডও বেরিয়েছিল তার। হিন্দুস্থান কোম্পানি থেকে তার গাওয়া বাংলা কাব্যগীতি বের হয় ১৯৪৩ সালে। অজয় ভট্টচার্যের কথায় ও শচীন দেব বর্মণের সুরে এর একখানি গান ছিল ‘যৌবনে হায় ফুল দলে পায়’। তবে মাত্র ২৭ বছর বয়সে মৃত্যু হয় তার। তখন প্রতিমার বয়স বছরখানেকের মতো। আর যিনি প্রতিমার গর্ভধারিণী, সেই কমলা দেবীরই বয়স ছিল মাত্র ১৮। সেই বয়সে মেয়েকে মানুষ করা, সংসার সামলানোর মতো দুই কঠিন দায়িত্ব এসে চাপে তার কাঁধে। তিনি চেয়েছিলেন, মণিভূষণ চট্টোপাধ্যায়ের কন্যাও যেন তার বাবার মতো গান গাইতে শেখে। প্রাথমিক তালিমটা দিয়েছিলেন তিনি নিজেই। প্রতিমার বয়স পাঁচ বছর হলে তার গান শেখানোর ভার তুলে দেন পণ্ডিত ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের শিষ্য প্রকাশকালী ঘোষালের হাতে।

গান ছিল প্রতিমার রক্তে। আর ছিল মায়াবী কণ্ঠ। প্রকাশকালী সবটুকু উজাড় করে দিয়ে গান শিখিয়েছিলেন প্রতিমাকে। গুরু ভীষ্মদেবের কাছে নিয়েও তিনি পরিচয় করিয়ে দেন প্রতিমাকে। ভীষ্মদেব মুগ্ধ হয়েছিলেন প্রতিমার গান শুনে।
প্রতিমার বয়স তখন সাত কি আট। বিক্রমপুর থেকে ঢাকা শহরে এসেছেন আত্মীয়বাড়ি বেড়াতে। আত্মীয়রা তো বটেই সে বাড়ির আশপাশের লোকজনও প্রতিমার গান শুনে তাজ্জব। তারাই উদ্যোগ নিয়ে ঢাকা রেডিওতে গান গাইবার ব্যবস্থা করে দেন তাকে। কলকাতা বেতারেও গান গাওয়ার সুযোগ এসে যায় সেই কিশোরী বয়সেই। খুব তাড়াতাড়ি চারদিকে নাম ছড়িয়ে পড়তে লাগল তার। ব্যাপারটা এমন দাঁড়াল যে, গানের জলসা মানেই প্রতিমা।
বিয়ের পর কলকাতায় এক ঘরোয়া আসরে প্রতিমার গান শুনে মুগ্ধ হন সে সময়ের নামকরা সুরস্রষ্টা সুধীর লাল চক্রবর্তী। তিনিই তাকে দিয়ে ১৯৫১ সালে ‘সুনন্দার বিয়ে’ ছবিতে গাওয়ালেন ‘উছল তটিনী আমি সুদূরের চাঁদ’। প্রতিমার সে গান বাজি মাত করল সহজেই। সে আমলে লোকের মুখে মুখে ফিরত সে গান। এরপর ১৯৫৪ সালে সঙ্গীত বহুল ছবি ‘ঢুলি’তে রাজেন সরকারের সুরে প্রতিমার সব গানই হিট। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, যুথিকা রায়, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের মতো ঝানু শিল্পীর পাশে সসম্মানে জায়গা করে নিলেন নবীনা প্রতিমা। এই ছবিতেই প্রতিমার গাওয়া রাগাশ্রিত ‘নিঙাড়িয়া নীল শাড়ি শ্রীমতী চলে’ তো রীতিমতো ইতিহাস সৃষ্টি করল। সহজ সাবলীল এই গায়কী বিপুল প্রশংসা কুড়ায় সে সময়। ১৯৫৫ সালে সূচিত্রা-উত্তম অভিনীত বিখ্যাত ছবি ‘শাপমোচনে’ চিন্ময় লাহিড়ীর সঙ্গে গাওয়া ‘ত্রিবেনী তীর্থ পথে কে গাহিল গান’ সম্পর্কেও একই কথা বলা চলে। আর একটি গান প্রসুন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংগে গেয়েছেন প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়। গানটি-চুপি চুপি এল কে ফুল বনে মোর”। ছবি রিলিজ হল। গানদুটি লোকের মুখে মুখে ফিরতো।
উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের যুগপুরুষ ওস্তাদ আমীর খানের সঙ্গে দ্বৈত কণ্ঠে গান গাওয়ার দুর্লভ সুযোগ এল ‘ক্ষুধিত পাশান’ ছবিতে। চলচ্চিত্রটির পরিচালক তপন সিংহ সঙ্গীত পরিচালক প্রবাদপ্রতীম সরোদবাদক ওস্তাদ আলি আকবর খানকে বললেন, রবীন্দ্রনাথের ‘যে রাতে মোর দুয়ার গুলি ভাঙল ঝড়ে’ এই গানের সুর নিয়ে কিছু একটা করা যায় কিনা! আলি আকবর তখনই তৈরি করলেন সেই বিখ্যাত গান ‘ক্যায়সে কাটে রজনী ইয়ে সজনী’। এই গানেই ওস্তাদ আমীর খানের সঙ্গে কণ্ঠ মেলালেন প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়। অত বড় ওস্তাদের সঙ্গে গলা মেলানো চাট্টিখানি কথা নয়। দুরুদুরু বুকে আমীর খানের পাশে মাইক্রোফোনের সামনে বসলেন প্রতিমা। তবে তার সহজ সাবলীল কণ্ঠ উৎরে গেল ভালভাবেই। এরপর ১৯৫৪ সালে পণ্ডিত জ্ঞান প্রকাশ ঘোষের সঙ্গীত পরিচালনায় ‘যদু ভট্ট’ ছবিতে গাইলেন ওয়াজিদ আলি শা’র সুর দেয়া ইতিহাস সৃষ্টিকারী সেই গান ‘বাবুল মোরা’। এই গানই প্রথম বিএফজে পুরস্কার এনে দেয় তাকে।
১৯৮৬ সালে বাহান্ন বছর বয়সে স্বামীকে হারালেন। প্রতিমার মত সরল মানুষের মাথার উপর থেকে ছাতা সরে যাওয়া মানেই আত্মবিশ্বাসের টান। ধীরে ধীরে প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে মেয়েদের বা বা জামাই বা নাতির উপর আকর্ষণ কমে আসছিল। যুগ পালটে যাচ্ছিল, মানুষটা খুব একটা এনজয় করছিলেন না। আস্তে আস্তে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছিলেন। সমস্যা ও কিছু থেকে থাকবে। যারা দেখার তারা তাদের মত করে দেখছিলেন। চাপা স্বভাবের দুর্বল স্নায়ুতন্ত্র যুক্ত মানুষটির চলাফেরা বা রুটিন কাজেও অসুবিধে হতে আরম্ভ করল স্বামী গত হওয়ার এক দশকের মধ্যেই। এগুলি জটিল রোগ। কাউন্সিলিং ছাড়া আর কোন উপায় নেই। ধীরে ধীরে রোগ নিরুদ্যম
মানুষটিকে গ্রাস করছিল। তার সঙ্গে এক অপরূপ প্রেজেন্টেশন হারিয়ে গেছে। কি গানের ক্ষেত্রে কি জীবনের ক্ষেত্রে। এত কম আয়োজনে এত বেশি মুগ্ধতা বিধাতাই সৃষ্টি করতে পারেন। কাজলা দিদির জন্য মন খারাপ হবেই হবে।
অত্যন্ত নিঃসঙ্গ অবস্থায় কেটেছে তার জীবনের শেষ দিকটা। মানসিক অসুস্থতাও দেখা দিয়েছিল। মৃতু্র বছর কয়েক আগে এই অবস্থাতেই ১৯৯৬ সালে কলকাতার রবীন্দ্র সদনে আয়োজিত এক সঙ্গীত উৎসবে তাকে ধরে নিয়ে এলেন নির্মলা মিশ্র। নির্মলার হাত ধরে আটপৌরে শাড়ি পরা প্রবীণা এই শিল্পী ধীরে ধীরে মঞ্চে প্রবেশ করতেই করতালিতে ফেটে পড়ে গোটা আসর। একে একে গাইলেন ফেলে আসা দিনের অসাধারণ সেই সব গান। আশ্চর্য মাদকতা জড়ানো কণ্ঠে বয়সের ছাপ নেই বিন্দুমাত্র। দীর্ঘ দিন পর কলকাতার শ্রোতারা প্রতিমাকে এভাবে পেয়ে আপ্লুত হযে ওঠেন সেদিন। শিহরণ জাগানো অজানা এক অনুভূতিতে সেদিন থরথর করে কেঁপেছিল রবীন্দ্রসদন। পরদিন পত্রিকায় পত্রিকায় প্রতিমা বন্দনাতেই তার অসধারণ গায়কীর প্রমান মেলে।
২০০৪ সালের ২৯শে জুলাই শেষ বয়সের সব জ্বালা যন্ত্রণার অবসান ঘটিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন তিনি। প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় সশরীরে আর নেই একথা সত্যি তবে বাঙালির বুকের ভেতর ,”মেলা থেকে কিনে আনা তালপাতার বাঁশি” তিনি বাজাবেন যুগের পর যুগ।
“কাজলা দিদি”র প্রতিমা আছেন আমাদের বুকের গভীরে, সুখের স্মৃতি রোমন্থনের মধুর বেদনার মত। আছেন বাংলার সুরের আকাশে শুক্লা একাদশী চাঁদ হয়ে।
(গুগল সহায়তায় সম্পাদিত)
নিউজটি শেয়ার করুন .. ..           

‘‘আমাদের বিক্রমপুর– আমাদের খবর।
আমাদের
সাথেই থাকুন– বিক্রমপুর আপনার সাথেই থাকবে!’’

Login করুন : https://www.bikrampurkhobor.com
আমাদের পেইজ এ লাইক দিন শেয়ার করুন।
জাস্ট এখানে ক্লিক করুন। https://www.facebook.com/BikrampurKhobor
email – bikrampurkhobor@gmail.com

একটি উত্তর দিন

দয়া করে আপনার কমেন্টস লিখুন
দয়া করে আপনার নাম লিখুন