বাঙালি বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের জন্মদিন আজ

0
1
বাঙালি বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের জন্মদিন আজ

প্রকাশিত: শনিবার, ২ আগস্ট, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ।। ১৮ই শ্রাবন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ (বর্ষাকাল)।। ৭ সফর, ১৪৪৭ হিজরী।

বিক্রমপুর খবর : লৌহজং প্রতিনিধি : শ্রীনগর প্রতিনিধি : অনলাইন ডেস্ক : আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায ছিলেন উপমহাদেশের এক প্রখ্যাত বাঙালি রসায়নবিদ, শিক্ষক, দার্শনিক এবং সমাজসংস্কারক। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠান “বেঙ্গল কেমিক্যালস” প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি ভারতের শিল্পায়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। তার অন্যতম বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার হলো মার্কারি (I) নাইট্রেট, যা তাকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়। তার অবদান কেবল রসায়নে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি শিক্ষা, শিল্পায়ন ও সমাজ উন্নয়নের ক্ষেত্রেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।

আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় ১৮৬১ সালের ২ আগস্ট অবিভক্ত বাংলার খুলনা জেলার রাড়ুলি গ্রামে (বর্তমান বাংলাদেশের পাইকগাছা উপজেলার অন্তর্গত) এক জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা হরিশচন্দ্র রায় ছিলেন একজন প্রভাবশালী জমিদার, তিনি নিজ গ্রামে একটি স্কুল ও একটি বিশাল লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই লাইব্রেরিতে সাহিত্য, বিজ্ঞান, রাজনীতি, ও ইতিহাস বিষয়ক বহু বইয়ের সংগ্রহ ছিল, যা প্রফুল্ল চন্দ্রের শৈশবকাল থেকেই জ্ঞানচর্চার প্রতি প্রবল আগ্রহ সৃষ্টি করে।
ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও প্রখর বুদ্ধিমত্তার অধিকারী। তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয় পিতার প্রতিষ্ঠিত নিজ গ্রামের স্কুল থেকে। পঞ্চম শ্রেণি পাশ করার পর তিনি কলকাতার বিখ্যাত হেয়ার স্কুলে ভর্তি হন। কিন্তু কিছুদিন পরেই তিনি রক্ত আমাশয়ে আক্রান্ত হয়ে গুরুতর অসুস্থ হন এবং বাধ্য হয়ে তাকে গ্রামে ফিরিয়ে আনা হয়। পরবর্তীতে প্রায় দেড় বছর চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে আবার কলকাতায় ফিরে যান এবং অ্যালবার্ট স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পাশ করেন।
প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি বিদ্যাসাগর কলেজে এফ এ (Intermediate) কোর্সে ভর্তি হন এবং পরবর্তীতে প্রেসিডেন্সি কলেজে রসায়ন বিভাগে বিএ পড়তে শুরু করেন। তবে এক বছরের মধ্যেই গিলক্রিস্ট বৃত্তি পেয়ে স্কটল্যান্ডের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ লাভ করেন প্রফুল্ল। সেখানে তিনি বিএসসি এবং পরে ডিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল কপার-ম্যাগনেসিয়াম শ্রেণির সম্মিলিত সংযুক্তি পর্যবেক্ষণ, যা তৎকালীন সময়ে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেষ্ঠ গবেষণাপত্র হিসেবে স্বীকৃতি পায় এবং তিনি ‘হোপ প্রাইজ’ অর্জন করেন।
১৮৮৮ সালে তিনি দেশে ফিরে এসে প্রেসিডেন্সি কলেজে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। তিনি নিজের ক্লাসে পাঠদান করতেন বাংলায়, যা সেই সময়ের শিক্ষাব্যবস্থায় বিরল ছিল। ছাত্রদের প্রতি তার ভালোবাসা ও উদ্ভাবনী শিক্ষাদানের পদ্ধতি তাকে একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে খ্যাতি এনে দেয়। তার উদ্যোগেই ১৯০৩ সালে “রে কে বি কে হরিশ্চন্দ্র স্কুল” এবং ১৯১৮ সালে বাগেরহাটে “পি সি কলেজ” প্রতিষ্ঠিত হয়, যা বাংলাদেশের শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।
১৮৯৫ সালে তিনি প্রথম মার্কারি (I) নাইট্রেট [Hg²(NO²)²] আবিষ্কার করেন, যা বৈজ্ঞানিক মহলে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করে। জীবদ্দশায় তিনি মোট ১২টি যৌগিক লবণ এবং ৫টি থায়োএস্টার আবিষ্কার করেন। ফলে কেবল ভারতবর্ষ নয়, বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেন তিনি।
প্রফুল্ল চন্দ্র রায় একজন বিজ্ঞানী ছাড়াও ভারতের প্রথম দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানের স্থপতি। ১৮৯২ সালে মাত্র ৭০০ টাকা পুঁজি নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস লিমিটেড। এই প্রতিষ্ঠানটি ভারতের শিল্পায়ন ও ঔষধ শিল্পের উন্নয়নে একটি নতুন দিগন্তের সূচনা করে। পরবর্তীতে তিনি খুলনায় একটি টেক্সটাইল মিল এবং ১৯০৯ সালে একটি কো-অপারেটিভ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন, যা উপমহাদেশের সমবায় আন্দোলনের অন্যতম মাইলফলক।
প্রফুল্ল চন্দ্র বিপ্লবী কর্মকাণ্ডেও যুক্ত ছিলেন। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের সময় তিনি আন্দোলনকারীদের অর্থসহায়তা করেন। তৎকালীন ব্রিটিশ গোয়েন্দা দপ্তরে তার নাম লেখা ছিল ‘বিজ্ঞানী বেশে বিপ্লবী’। একবার লন্ডনের সাইমন কমিশন যখন কলকাতায় আসে, তখন আচার্য রায় গামছা পরে নিজের ঘরে ধুতি শুকাচ্ছিলেন, যা দেখে কমিশনের সদস্যরা বিস্মিত হন। এছাড়াও, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাকে বলেছিলেন, “সংসারে জ্ঞানী তপস্বী দুর্লভ নয়, কিন্তু মানুষের চরিত্রে প্রভাব রাখতে পারে এমন মনীষী সংসারে কদাচ দেখা যায়।”
আচার্য রায় তার জীবদ্দশায় বহু সম্মাননা এবং পুরস্কার লাভ করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নিম্নরূপঃ
• সি আই ইঃ ১৯১১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে তৃতীয়বারের মতো ইংল্যান্ড সফরে গেলে এই উপাধি প্রদান করা হয়।
• সম্মানসূচক ডক্টরেটঃ ১৯১১ সালে ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। পরবর্তীতে ১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মহীশুর এবং বেনারস বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন।
• নাইট উপাধিঃ ১৯১৯ সালে ব্রিটিশ সরকার তাকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করে।
আচার্য রায় বহু গবেষণাপত্র এবং গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার রচিত ১৪৫টি বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র ছাড়াও উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলঃ
• India Before and After the Sepoy Mutiny
• সরল প্রাণিবিজ্ঞান
• বাঙ্গালী মস্তিষ্ক ও তার অপব্যবহার
• হিন্দু রসায়নী বিদ্যা
• Life and Experience of a Bengali Chemist
আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় কেবল একজন বিজ্ঞানীই ছিলেন না; তিনি ছিলেন ভারতীয় শিল্পায়নের অগ্রদূত, শিক্ষাবিদ এবং সমাজসংস্কারক। তার অসামান্য জীবন ও কর্ম আমাদের জন্য এক বিরাট অনুপ্রেরণা। দেশপ্রেম, মানবপ্রেম এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার কারণে তিনি ইতিহাসের পাতায় এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

নিউজটি শেয়ার করুন .. ..           

‘‘আমাদের বিক্রমপুর– আমাদের খবর।
আমাদের
সাথেই থাকুন– বিক্রমপুর আপনার সাথেই থাকবে!’’

Login করুন : https://www.bikrampurkhobor.com
আমাদের পেইজ এ লাইক দিন শেয়ার করুন।
জাস্ট এখানে ক্লিক করুন। https://www.facebook.com/BikrampurKhobor
email – bikrampurkhobor@gmail.com

একটি উত্তর দিন

দয়া করে আপনার কমেন্টস লিখুন
দয়া করে আপনার নাম লিখুন