গান নয় জীবনকাহিনি (পর্ব-২)

0
81
অধ্যাপক ঝর্না রহমান

গান-চুরি কান-ধরি (আজিমপুর)

অধ্যাপক ঝর্না রহমান

প্রকাশিত : বুধবার, ১০ জুন ২০২০ ইং ।। ২৭ই জ্যৈস্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ ।।  বিক্রমপুর খবর : অফিস ডেস্ক :

লালবাগ স্কুলে থাকতেই গানের জন্য, মাসুম বাচ্চা আমি জীবনে প্রথম বেঞ্চের ওপরে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকার শাস্তি পেলাম। সেই শাস্তির অপমান লজ্জা আর কষ্টের কথা মনে হলে এখনও আমার চোখ ভিজে ওঠে। ১৯৬৫ সালের কথা। তখন আমি থ্রিতে উঠে গেছি। আমাদের ক্লাসে এক বড়লোকের বেটি ছিল, লম্বা লম্বা চুল! শিপ্রা বা শিখা নামের সেই মেয়ে দুই বেণি দুলিয়ে কাঁধে স্কুল ব্যাগ নাচাতে নাচাতে ক্লাসে ঢুকতো। তখন বেশিরভাগ ছাত্রীই বুকে বইখাতা চেপে স্কুলে আসতো। তবে আমার একটা ছোট চামড়ার সুটকেস ছিল। সুটকেসটি ভালো রেজাল্ট করে টু থেকে থ্রিতে ওঠার জন্য ছোট মামা মাহফুজুর রহমান আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। যাই হোক, সেই বড়লোকের বিটি বোধ হয় বাসায় মাস্টার রেখে গান শিখতো। কারণ ও ক্লাসে বসে সহপাঠিদের সাথে গানের গল্প করতো। সাথে করে নিয়ে আসতো গানের খাতা। সেটা খুলে দেখাতো, গান করতো। আমার খুব ইচ্ছে করে, ওর গানের খাতাটা দেখি! কিন্তু আমি প্রচণ্ড মুখচোরা স্বভাবের। খাতা দেখবো দূরের কথা, এগিয়ে এসে ওর সাথে ভাবই জমাতে পারি না। তাই আড়াল থেকে শিপ্রাকে খুব লক্ষ করি। ওর কথা আর গান শোনার জন্য চুপ করে কান পেতে রাখি। ওর গাওয়া শুনে আমার খুব ভালো লেগে যায় ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা’ গানটি। কিন্তু শিপ্রার মুখে শুনে শুনে মনে মনে মাত্র দেড় কি দু লাইন শিখেছি!
একদিন খুব সাহস করে ওর কাছে খাতাটা চাইলাম, বললাম, পাশে বসে গানটি লিখে নেবো, দেবে একটু খাতাটা? উমহ! সেই বড়লোকের বিটি আমাকে বলে, কেন দেবো? এত ইচ্ছা থাকলে মাস্টার রেখে গান শিখে নাও! লজ্জায় কথা বন্ধ হয়ে যায় আমার। প্যাঁচা মুখ করে সরে যাই। কিন্তু মন পড়ে থাকে গানের খাতার ওপর। তক্কে তক্কে থাকি। কয়েকদিন পরে সুযোগ এসে যায়। টিফিন টাইমে সবাই ক্লাস থেকে বাইরে চলে গেলে আমি দুরু দুরু বুকে শিপ্রার ব্যাগ খুলে গানের খাতা বের করে দ্রæত হাতে লিখতে থাকি গানটি। কিন্তু কপাল খারাপ। একেবারে সিনেমার মত ঘণ্টা পড়ার আগেই কী কারণে যেন শিপ্রা একবার ক্লাসে এলো, আর আমি বমাল ধরা পড়ে গেলাম! চুরি করে সহপাঠির খাতা থেকে গান লেখার অপরাধ যত লঘুই হোক না কেন, ফাঁকা ক্লাসে অন্যের ব্যাগ থেকে জিনিস বের করা গর্হিত অপরাধ বটে। ফলে টিফিনের পরের ক্লাসের টিচারের কাছে শিপ্রা অনেকখানি রঙ চড়িয়ে আমার নামে অভিযোগ দাখিল করে। আমি ওর ব্যাগ থেকে পয়সা চুরি করতে যাচ্ছিলাম, তখনই ও ঢুকে পড়ে ইত্যাদি। লজ্জায় আমার মাথা নুয়ে পড়ে। মনে হয় মাটির সাথে মিশে যাবো। কিন্তু হঠাৎ আমি সবার চেয়ে বড় হয়ে উঠি। কারণ টিচারের নির্দেশে আমাকে উঠে দাঁড়াতে হয়েছে বেঞ্চের ওপর। সে সময়ে স্কুলের একটা ঐতিহ্যবাহী শাস্তি ছিল কান ধরে বেঞ্চের ওপরে দাঁড়ানো। বেঞ্চের ওপরে ওঠার পর চোখ দিয়ে আমার এমনিতেই গল গল করে পানি পড়ছিল। কান ধরতে বলাতে আমার হিক্কা উঠে গেল। সারা ক্লাস আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার মনে হচ্ছিল, আমি কেন এখন দুম করে মরে যাচ্ছি না! যাই হোক, হিক্কা শুনে টিচারের দয়া হল, বললেন, কেন ওর ব্যাগে হাত দিয়েছ? আমি কোনোমতে চুরি করে অর্ধেক লেখা গানের কাগজটা হার হাইনেসের সামনে দাখিল করি। আপার মুখ তখন গোলালু। গান লিখেছ? আমি কোনোমতে মাথা নাড়াই। দয়াময়ীর দয়া হয়! বেঞ্চি থেকেও আমার অবতরণ ঘটে। আপামনি বলেন, ওর কাছে চাইলেই তো হত! আর না বলে কারো জিনিসে হাত দেবে না বুঝেছ? বুঝবো না আবার? জন্মের মত বুঝেছি! কুচুটে হিংসুটি শিপ্রার জন্য ‘কোথাও আমার’ গানের কথাগুলো আর ঠিকমত শেখা হল না আমার। পরে যখন আমি শেরে বাংলা হাই স্কুলে ফো‌রে পড়ি, স্কুলের অনুষ্ঠানের জন্য ঐ গানের সাথে একটা দলীয় নাচ করলাম, তখন রিহার্সালের সময় গাইতাম, সূর্য যখন আস্তে পড়ে ঢলে, মেঘে মেঘে আকাশ কুসুম তোলে……( সূর্য যখন অস্তে পড়ে ঢুলি/ মেঘে মেঘে আকাশ কুসুম তুলি)!
আজিমপুরে আমরা যে এলাকায় থাকতাম, সে জায়গায় ঢাকাইয়া আদিবাসীদের বাস ছিল বেশি। তাদেরকে বলা হত ঢাকাইয়া কুট্টি। উর্দু আর বাংলা মিশিয়ে কথা বলতেন। এই ঢাকাইয়া কুট্টিরা ছিলেন খুব আমুদে সম্প্রদায়। রঙচঙে কাপড় পড়তো। তরুণ যুবকেরা গলায রুমাল পেঁচিয়ে টেরি কেটে রাস্তায় বেরিয়ে গলা ছেড়ে উর্দু কিংবা হিন্দি কোন জনপ্রিয় গানের কলি গাইতে গাইতে হেঁটে যেত। একটা না একটা উৎসব আয়োজন লেগেই থাকতো। আমাদের বাসার কাছেই সেই ঢাকাইয়া মহল্লা ছিল। প্রায়ই ওদের কোনো না কোনো বাসা থেকে হারমোনিয়াম আর ঢোলের বাদ্য ভেসে আসতো। আমার মনে হতো, আহা ওখানে যদি আমি থাকতে পারতাম! অনেকগুলো পরিবার ছিল সেখানে। ফুলের ব্যবসা করতেন ওঁরা। কাঁচা ফুল কিনে এনে পরিবারের সবাই দল বেঁধে বসে মাজারের জন্য ফুলের ঝালর, গিলাফ, আকন্দ আর গাঁদা ফুলের সা‌থে রঙিন সিলোফেন পেপার শোলা চিকমিকে ট্রেসিং পেপার (তাঁরা বলতেন বাদলা কাগজ) ইত্যা‌দির মি‌শেল দি‌য়ে নানারকম ফুল সজ্জার আইটেম তৈরি করতেন। কাজ করতে করতে ওঁরা দল বেঁধে গান করতেন। ছোট্ট এক একটা বাড়িতে গিজগিজ করা কয়েকটা ঘরে অনেকগুলো পরিবার বাস করতো। এখানে লালুনি আর কালুনি নামে দুই বোনের পরিবার ছিল। লালুনি ফর্সা আর কালুনি কালো। বয়সে বড় হলেও আমার আম্মার সাথে একসময় এই দুই বোনের গলায় গলায় ভাব হয়ে গেল। আম্মা ওঁদেরকে ডাকেন লালুনি আপা আর কালুনি আপা, আমরা ডাকি লালুনি খালাম্মা আর কালুনি খালাম্মা। আম্মার সখ্যের সুবাদে গানের আওয়াজ শুনলে ওঁদের বাড়িতে যেতে আর বাধা রইলো না। লালুনি খালাম্মাদের দেখতাম, কোলের ওপর ঢোল নিয়ে দু হাতে অদ্ভুত সুন্দর চাটি মেরে তাল বাজাতে বাজাতে গান করছেন। তালে তালে বাজিয়ে মেয়েদের মাথা থেকে কোমর পর্যন্ত ছন্দে ছন্দে দুপাশে ঢেউ তুলে দুলতে থাকতো। আমি হা করে দেখতাম। মেয়েরা ঢোল বাজিয়ে গান গায় সেই প্রথম দেখি। ওঁরা ছোট্ট একটা প্রায়ান্ধকার কুঠরিতে মেঝেতে পাটি বা চাদর বিছিয়ে পরিবারের কয়েকজন মিলে গান করতেন। তবে সে গানের ভাষা ছিল উর্দু। ভাষা না বুঝলেও ঢোলের উচ্চ রবের সাথে তালে তালে মাথা নাড়িয়ে ঝোঁক দিয়ে গাওয়া সেই গান আমাকে এক মায়ার রাজ্যে নিয়ে যেত।
আজিমপুরে থাকতেই আমি কীভাবে যেন আর এক মহল্লায় এক কাওয়ালি মাহফিলের খোঁজ পেয়ে গিয়েছিলাম। খুব সম্ভবত সেটা ছিল কাওয়ালি চর্চার একটা কেন্দ্র। একটা ঘরে রোজ বিকেলেই (কারণ আমি যেদিনই গেছি সেদিনই দেখেছি কাওয়ালি হচ্ছে) কয়েকজন মিলে কাওয়ালি গাইতেন। এদের সবাই পুরুষ। তরুণ যুবক থেকে বয়স্ক পুরুষ মিলিয়ে দশ বারো জন ছিলেন সেই দলে। কখনো একজন কখনো দুজন ওস্তাদের সামনে হারমোনিয়াম থাকতো আর থাকতো ঢোল আর তবলা। কিন্তু কাওয়ালির আসরে শ্রোতা হি‌সে‌বে থাকতো অনেক মানুষ। আমি বাসা থেকে চুপি চুপি বেরিয়ে রাস্তা পার হয়ে সেই কাওয়ালি কেন্দ্রে চলে যেতাম। দূর থেকেই দেখতাম দরজার বাইরে অনেক জুতো স্যান্ডেল। আর সমবেত কণ্ঠের জাদুকরি দোলা-লাগা ছন্দোময় গানের ঢেউ বেরিয়ে এসে বাইরের গাছপালা ঘরবাড়ি সব কিছুতে ঝাঁকুনি দিচ্ছে। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আরও ছোট ছোট বাচ্চাকাচ্চার সাথে আমি কান পেতে কাওয়ালি শুনতাম। যারা গাইছেন তাঁদের বেশিরভাগের মাথায় টুপি। সবাই দুহাতে ছন্দে ছন্দে তালিয়া বাজান। দারুণ লাগতো এই ছন্দিত করতালি। তালির শব্দে নেশা ধরে যেত। তবে কাওয়ালি গানের ভেতর থেকে ইয়া আল্লা, রাসুলুল্লাহ, হাবিবাল্লা, কলিমাল্লা এরকম কিছু শব্দ ছাড়া আর কিছু ধরতে পারতাম না। কিন্তু কাওয়ালির ছন্দ যেন আমার লোমকূপের ভেতরে ঢুকে যেত। বিকেল হলেই এক নিষিদ্ধ টান আমি টের পেতাম। আমার মনে আছে, আমি যেতাম আম্মাকে লুকিয়ে। মনে হত, বাসা থেকে অত দূরে কাওয়ালি শুনতে যাওয়ার কথা বললে আম্মা আমাকে কিছুতেই যেতে দেবেন না। জানতে পারলে বকাও দেবেন, তাই সন্ধ্যা হওয়ার আগে আবার দৌড়াতে দৌড়াতে ফিরে আসতাম। কাওয়ালির মজমা আর নিষিদ্ধ আনন্দ আমাকে আবিষ্ট করে রাখতো! তখন কোনো কোনো গানের মুখড়া,অর্থ না বুঝেও আমি শিখে ফেলেছিলাম। সে সব অংশ আমার শ্রুতির ভেতরে দিব্যি মাইফেল বসিয়ে বাজতে থাকতো। কল্পনার মেহফিলে তালিয়া বাজাতে বাজাতে আমি বাসায় ফিরে আসতাম। কখনো আম্মা বলতেন, কোথায় গেছিলি? অম্লান বদনে বলে দিতাম অমুকের সাথে খেলছিলাম, কিংবা জুম্মনদের* গুল্লি খেলা দেখছিলাম! (ও রে কাওয়ালি গানা, তুই আমারে করলি দেওয়ানা!)

ঝর্না রহমান
৯ জুন ২০২০
* লালুনি খালাম্মার ছেলে, মহল্লার বাচ্চা ছেলেদের সর্দার।

নিউজটি শেয়ার করুন .. ..

একটি উত্তর দিন

দয়া করে আপনার কমেন্টস লিখুন
দয়া করে আপনার নাম লিখুন