আজ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের ১৫০তম জন্মদিন

0
64
আজ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের ১৫০তম জন্মদিন

প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার,৫ নভেম্বর ২০২০ইং ।। ২০শে কার্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ (হেমন্তকাল)।। ১৮ই রবিউল আউয়াল,১৪৪২ হিজরী।
বিক্রমপুর খবর : অনলাইন ডেস্ক : দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ১৮৭০ সালের ৫ নভেম্বর ভারতের কলকাতায় জন্মগ্রহন করেন। তাঁর পিতা ভুবনমোহন দাশ একজন আইনজীবী ছিলেন এবং মা নিস্তারিণী দেবী গৃহিণী। চিত্তরঞ্জন দাশের পূর্বপুরুষের আদিনিবাস ছিলো বিক্রমপুরের টঙ্গিবাড়ি থানার বর্তমানে টঙ্গিবাড়ি উপজেলার তেলিরবাগ গ্রামে। শিক্ষিত পরিবার হিসেবে তাঁদের পরিবারের যথেষ্ঠ সুনাম ছিলো। চিত্তরঞ্জন দাশের পড়াশুনার হাতেখড়ি নিজ পরিবারে। প্রাথমিক পড়াশুনা শেষ হওয়ার পূর্বে চিত্তরঞ্জন দাশ শৈশবে তাঁর বাবার সাথে কলকাতার ভবানীপুরে চলে আসেন। কারণ তখন তাঁর বাবা কলকাতার ভবানীপুরে বসবাস শুরু করেন।

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ১৮৭৯ সালে ভবানীপুর লন্ডন মিশানারি স্কুলে ভর্তি হন। স্কুলের পাঠ্যবই পড়ার চেয়ে পাঠ্যতালিকার বাইরের বই পড়তে বেশি পছন্দ করতেন তিনি। যে কারণে তাঁর পরীক্ষার ফলাফল খুব ভালো হতো না। চিত্তরঞ্জন দাশ ১৮৮৬ সালে লন্ডন মিশানারি স্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করেন। এরপর ভর্তি হন প্রেসিডেন্সী কলেজে। এই কলেজে পড়ার সময় তিনি রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৮৯০ সালে তিনি প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে বি.এ পাশ করেন। এরপর উচ্চ শিক্ষার জন্য বিলেত যান।

চিত্তরঞ্জন দাশ ছিলেন একশোভাগ বাঙালি —আইনজীবী এবং রাজনীতিবিদ।তিনি স্বরাজ্য পার্টির প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর সময়ের অন্যতম বৃহৎ অঙ্কের উপার্জনশীল আইনজীবী হওয়া সত্তেও তিনি তাঁর ধন অকাতরে সাহায্যপ্রার্থীদের কাছে বিলিয়ে দিয়ে বাংলার ইতিহাসে দানবীর হিসাবে সুপরিচিত। প্রেসিডেন্সি কলেজের কৃতী ছাত্র,আইসিএস পরীক্ষায় দু’বার অকৃতকার্য,মিডল টেম্পল থেকে ব্যারিস্টারি পাশ চিত্তরঞ্জন সক্রিয় রাজনীতি করেছিলেন মাত্র নয় বছর—১৯১৭ থেকে ১৯২৫।

১৮৯৪ সালে কলকাতা হাইকোর্টে ব্যারিস্টার হিসেবে নিজের নাম তালিকাভুক্ত করেন। ১৯০৮ সালে অরবিন্দ ঘোষের বিচার তাকে পেশাগত মঞ্চের সম্মুখ সারিতে নিয়ে আসে। মামলাটিতে তিনি এমন সুনিপুন দক্ষতায় অরবিন্দ ঘোষের পক্ষসমর্থন করেন যে অরবিন্দকে শেষ পর্যন্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয় ইংরেজ সরকর। তিনি ঢাকা ষড়যন্ত্র মামলায় (১৯১০-১১) বিবাদী পক্ষের কৌশলী ছিলেন। ১৯১৭ সালের এপ্রিলে কলকাতার ভবানীপুরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক অধিবেশনে সভাপতি রূপে চিত্তরঞ্জনের সরাসরি রাজনৈতিক আত্মপ্রকাশ। সে বছর‘মডার্ন রিভিউ’-তে রবীন্দ্রনাথের নেশন-বিরোধী বক্তৃতার বয়ান পড়ে চিত্তরঞ্জন প্রথম দিকে বিচলিত হয়েছিলেন। পরে তিনি কবির নেশন-চিন্তার মর্ম উপলব্ধি করে খানিকটা গ্রহণ করেছিলেন। চিত্তরঞ্জন স্বীকার করেন যে ‘‘জাতীয়তাবাদকে চরমে নিয়ে গেলে যে বাড়াবাড়ি ঘটে, তারই পরিণাম’’ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ।

তিনি বিশ্বাস করতেন যে জাতীয় স্বাতন্ত্র্যকে মর্যাদা দিতে হবে। তিনি দেওয়ানী ও ফৌজদারী উভয় আইনেই দক্ষ ছিলেন। কবি হিসেবেও দেশবন্ধু খ্যতি লাভ করেছিলেন।১৯২৪ সালে স্বরাজ দল কলকাতা কর্পোরেশনের নির্বাচনে জয়ী হল।দেশবন্ধু কলকাতার মেয়র পদে অধিষ্ঠিত হলেন। ডেপুটি মেয়র হিসেবে তিনি বেছে নিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে।শরৎচন্দ্র বসু অল্ডারম্যান হলেন,আর সুভাষচন্দ্রকে দেশবন্ধু চিফ এগজ়িকিউটিভ অফিসার নিয়োগ করলেন।চিত্তরঞ্জন দাশ বলেছিলেন,‘‘দেশকে ভালবাসা যদি অপরাধ হয়,তা হলে আমিও অপরাধী। সুভাষচন্দ্র বসু যদি অপরাধী হন,তবে আমিও অপরাধী।’’

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ছিলেন হিন্দু-মুসলিম মিলনের নিবেদিতপ্রাণ সমন্বয়কারী। দেশবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন বাঙলাকে অখণ্ড রেখে শান্তিপূর্ণভাবে জীবন-যাপন করতে হলে হিন্দু-মুসলমানের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমতার প্রয়োজন, প্রয়োজন একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের। তাই ১৯২৩ সালে সিরাজগঞ্জে প্রাদেশিক সম্মেলনে দেশবন্ধু তাঁর বিখ্যাত হিন্দু-মুসলিম চুক্তি (বেঙ্গল প্যাক্ট) সম্পাদন করেন। এই চুক্তিতে সবার অধিকার প্রতিষ্ঠার শর্ত নিবদ্ধ ছিলো।

এই চুক্তিতে ছিলো আইনসভাগুলোতে মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সদস্য সংখ্যা নির্ধারণ এবং চাকুরির সংখ্যানুপাতিক বিন্যাস, এ ক্ষেত্রে মুসলমানদের শতকরা ৫৫ ভাগ এবং হিন্দুদের শতকরা ৪৫ ভাগ নির্ধারণ হয়। এই চুক্তিতে স্পষ্ট করে বলা হয়, মসজিদের সামনে বাজনা বাজিয়ে শোভাযাত্রা করা চলবে না এবং মুসলমানদের ধর্মীয় অনুশাসনের জন্য গো-হত্যা হলে তাতে বাঁধা দেওয়া চলবে না। হিন্দুদের মনে আঘাত লাগে এমন স্থানে গো-হত্যা করা চলবে না।
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নির্দেশে বেঙ্গল প্যাক্ট চুক্তিটি তৈরি করেন নেতাজী সুভাষ বসু। এরই মধ্যে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ মতিলাল নেহেরুর সাথে ‘স্বরাজ্য দল’ নামের একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন, সুভাস বসুর সাংগঠনিক নেতৃত্বে যা ভারতবর্ষে একটি শক্তিশালী সংগঠন হিসেবে অবস্থান লাভ করে।
১৯২১ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত সুভাষ বসু তাঁর রাজনৈতিক গুরু দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের পাশে থেকে তাঁর সমস্ত সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সুভাষ ছিলেন দেশবন্ধুর যোগ্য উত্তরসূরি।

ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাসে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস এক অবিস্বরণীয় নাম। তাঁর রাজনৈতিক মেধা, দক্ষতা আর দেশের মানুষের প্রতি অপরিসীম দরদের কারণে তিনি জনসাধারণের কাছে ‘দেশবন্ধু’ নামে পরিচিত ছিলেন। দেশদরদী এই নেতা রাজনীতি করতে গিয়ে ব্রিটিশদের রোষাণলে পড়ে বহুবার জেল খাটেন। তিনি নানা ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যবদ্ধ রাজনীতির পক্ষে অবিচল থাকেন। তিনি সবসময় ব্রিটিশবিরোধী লড়াইকে জোরদার করতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পক্ষে নিজের মত প্রকাশ করেছেন। একসময় তিনি কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে স্বরাজ্য দল নামের একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এই স্বরাজ্য দলের প্রার্থী হিসেবেই ১৯২৪ সালে কলকাতা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে প্রথম মেয়র নির্বাচিত হন। এ সময়ে তিনি নারী শিক্ষা, বিধবা বিবাহ ইত্যাদির পক্ষে অনেক কাজ করেন।

উল্লেখ্য দেশবন্ধু বিলেতে থাকার সময় রাজনৈতিক ব্যাপারে সক্রিয় ছিলেন এবং অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৮৯৩ সালে ব্যারিস্টারি পড়া শেষ করে দেশে ফিরে আসেন এবং আইন পেশা শুরু করেন। ১৮৯৪ সালে কলকাতা হাইকোর্টে ব্যারিস্টার হিসেবে তাঁর নাম তালিকাভুক্ত হয়। পেশা জীবনের শুরুতে তাঁর সামান্য আয় হতো। যা দিয়ে তাঁর দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় ব্যয় বহন করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। ট্রামভাড়ার সামান্য পয়সা বাঁচানোর জন্য তিনি হাইকোর্ট থেকে ভবানীপুর হেঁটে যেতেন।
আইন পেশার পাশাপাশি গোপনে বিপ্লবী রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন চিত্তরঞ্জন দাশ। ১৯০৩ সালে কলকাতায় প্রমথ মিত্র ও চিত্তরঞ্জন দাশ প্রথমে অনুশীলন সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত তিনি এই সমিতির সহ-সভাপতি ছিলেন। অরবিন্দ ঘোষের বন্দে মাতরম পত্রিকার সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততা ছিলো।
ওকালতি করে যে দেশপ্রেমের পরিচয় দেওয়া যায়, তা দেখা যায় আইনজীবী চিত্তরঞ্জনের জীবন থেকেই। রাজনৈতিক বন্দীদেরকে তাদের বিরুদ্ধে আনীত মারাত্বক অভিযোগের হাত থেকে তিনি মুক্ত করে আনতেন তাঁর অসাধারণ মামলা পরিচালনার গুনে।

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ১৯০৬ সালে কংগ্রেসে যোগদান করেন। নাগপুর কংগ্রেসে তিনি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করার জন্য আইন ব্যবসা সম্পূর্নরূপে বন্ধ করেন। আইনজীবী হিসেবে চিত্তরঞ্জন দাশের জন্য ১৯০৭ সাল ছিলো খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ সময় তিনি সিভিল ও ক্রিমিনাল উভয় কোর্টেই একজন সফল আইনজীবী হিসেবে নিজেকে প্রতিস্থাপন করেন। এ সময় কলকাতা কোর্টে দেশপ্রেমিক ও বিপ্লবী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের যতো মামলা এসেছে তিনি সেগুলোর বিরুদ্ধে অবিরাম লড়েছেন। শুধু আইনের জগতে নয় , সাহিত্যিক হিসেবেও তিনি প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি ছিলেন সাহিত্যচর্চায় মগ্ন। রাজনীতির মধ্যে থেকেও তিনি নিয়মিত সাহিত্যচর্চা করতেন। সে সময়ের বিখ্যাত মাসিক পত্রিকা নারায়ণ’র প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক ছিলেন তিনি। মালঞ্চ, সাগর সঙ্গীত ও অন্তর্যামী গ্রন্থের জন্য তিনি কবি ও লেখক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

১৯২০ সালে মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের সময় আইনসভা বর্জন সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন চিত্তরঞ্জন দাশ। কিন্তু কিছুদিন পর তিনি নিজেই অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তাব কংগ্রেস অধিবেশনে উত্থাপন করেন এবং গান্ধীজীর ডাকে ব্যারিস্টারি পেশা ত্যাগ করে দেশ সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। স্বয়ং ভারত সরকার প্রখ্যাত মিউনিশনস্ বোর্ড ঘটিত মামলায় প্রচলিত নজীর উপেক্ষা করে বিলাতি এডভোকেট জেনারেল অপেক্ষা অধিক পারিশ্রমিক দিয়ে তাঁকে সরকারি কৌসুলী নিযুক্ত করেন। অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার জন্য তিনি এ দায়িত্ব পরিত্যাগ করেন। এই অসামান্য ত্যাগের জন্য ভারতবর্ষের জনগণ কর্তৃক তিনি ‘দেশবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত হন। ১৯২৩ সালে কংগ্রেস ত্যাগ করে মতিলাল নেহেরুর সহযোগীতায় স্বরাজ্য দল গঠন করেন। হিন্দু ও মুসলমান এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি সাধনের জন্য তাঁর নেতৃত্বে স্বরাজ্য দল মুসলিম নেতাদের সঙ্গে উভয় সম্প্রদায়ের অধিকার বিষয়ে চুক্তি সম্পাদন করে।
১৯২৫ সালে কংগ্রেসের অধিবেশন শেষে দার্জিলিং যাবার পথে ১৬ জুন ৫৪ বছর বয়সে দেশবন্ধু মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর পৈতৃক বসতবাড়িটি জনসাধারণের জন্য দান করে যান। সেখানে চিত্তরঞ্জন সেবাসদন প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁর মৃত্যুতে বরীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ/মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান’। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুর পর জীবনানন্দ দাশ তাঁর স্মরণে ‘দেশবন্ধুর প্রয়াণে’ নামক একটি কবিতা রচনা করেন, যা বঙ্গবাণী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। কবিতাটি পরবর্তীতে ১৯২৭ সালে জীবনানন্দ দাশের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরা পালক’-এ প্রকাশিত হয়।

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ রাজনীতির ক্ষেত্রে জীবনের খুব একটা দীর্ঘ সময় ব্যয় না করেও সকল স্তরের বাঙালির তিনি ছিলেন বন্ধু। উদার মতবাদ ও দেশের প্রতি দরদের কারণে তিনি হিন্দু মুসলমান সকলের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা অর্জন করেন এবং তার এই উদার মতবাদের জন্য জনগণ তাকে দেশবন্ধু খেতাবে ভূষিত করেন।

তাঁর অকালমৃত্যুতে বাংলা ও ভারতের সামপ্রদায়িক সমপ্রীতির উপর আঘাত হানে। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ মন্তব্য করেছেন যে, ‘তিনি (দেশবন্ধু) অকালে মারা না গেলে দেশে নতুন অবস্থা সৃষ্টি করতেন’। তিনি আরও বলেন,‘পরিতাপের বিষয় এ যে, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর কিছুসংখ্যক অনুসারী তাঁর অবস্থানকে জর্জরিত করে এবং তাঁর ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করে। এর ফলে বাংলার মুসলমানরা কংগ্রেস থেকে দূরে সরে যায় এবং (ভারত) বিভক্তির প্রথম বীজ বপন করা হয়’।

অসাম্প্রদায়িক বাঙলার প্রবাদপুরুষ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ উত্তরাধিকার সূত্রেই পেয়েছিলেন:

অসাম্প্রদায়িক বাঙলার প্রবাদপুরুষ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ বিষয়টি বলা যায় উত্তরাধিকার সূত্রেই পেয়েছিলেন। তাঁর পিতামহ জগদ্বন্ধু দাশ ও পিতা ভুবনমোহন দাশ উভয়েই আইন ব্যবসার পাশাপাশি কাব্যচর্চা করতেন। চিত্তরঞ্জনেরও সাহিত্যচর্চার সূত্রপাত কবিতা দিয়ে। নিতান্ত কিশোর বয়সেই তাঁর লেখালেখির শুরু। তাঁর স্কুল জীবনের সহপাঠী শরৎচন্দ্র রায় চৌধুরীর ভাষায় ‘চিত্ত ছোটোবেলা থেকেই কবিতা লিখত – পকেট ভরতি করে ছোটো ছোটো কাগজে সে কবিতা লিখে আনত।… টিফিনের ছুটির পর বাইরে এসে আমাদের সে লেখা দেখাত…।’ (অপর্ণা : ২১) তারপর প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্রাবস্থায়, বিলাতে অবস্থানকালে, এমনকি স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর সক্রিয় রাজনীতিতে পুরোপুরি জড়িয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত, তিনি যখন অত্যন্ত ব্যস্ত ও সফল ব্যবহারজীবী, তখনও তাঁর সাহিত্যচর্চা অব্যাহত ছিল। এই পর্বে সুরেশচন্দ্র সমাজপতি-সম্পাদিত সাহিত্য ছাড়াও নির্মাল্য, মানসী প্রভৃতি পত্রিকায় চিত্তরঞ্জনের লেখা প্রকাশিত হয়।
এ পর্যায়ে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির খামখেয়ালি ক্লাবের সভ্য ছিলেন চিত্তরঞ্জন। সেই সূত্রে রবীন্দ্রনাথ ছাড়াও অবনীন্দ্রনাথ, গগনেন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুলপ্রসাদ সেন, প্রমথ চৌধুরী, জগদিন্দ্রনাথ রায় প্রমুখের সঙ্গে তিনি সাহিত্যপাঠ ও সংগীতচর্চায় অংশ নেন। ১৯১১ সালে চিত্তরঞ্জন যখন দ্বিতীয়বার পরিবার-পরিজনসহ বিলেত যান তখন রবীন্দ্রনাথ একদিন ইয়েটস ও রদেনস্টাইনকে নিয়ে তাঁর বাড়িতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে এসেছিলেন। সেদিন রবীন্দ্রনাথ সেখানে ‘সোনার তরী’সহ তাঁর কয়েকটি কবিতা আবৃত্তি করে শোনান। রবীন্দ্রনাথের অনুরোধে চিত্তরঞ্জন দাশও তাঁর সাগর-সঙ্গীত-এর পাণ্ডুলিপি থেকে কয়েকটি কবিতা পড়ে শুনিয়েছিলেন। এমনকি সাগর-সঙ্গীত নিয়ে দুজনের মধ্যে কিছু আলোচনাও হয়। (অপর্ণা : ৫৯) কলকাতায় চিত্তরঞ্জনের রসা রোডের বাড়িতে অনুষ্ঠিত সাহিত্য ও সংগীত আসরে খোদ রবীন্দ্রনাথসহ ঠাকুরবাড়ির অনেকেরই, যেমন সরলা দেবী, ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী প্রমুখের আসা-যাওয়া ছিল। এই আসরেই মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ বসুর পাখোয়াজ সংগতের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ও অমলা দাশ (চিত্তরঞ্জনের চিরকুমারী বোন ও পরবর্তীকালের বিখ্যাত সংগীতশিল্পী) একসঙ্গে গানও গেয়েছেন। (অপর্ণা : ৬৭) চিত্তরঞ্জন-কন্যা অপর্ণার হিন্দুরীতিতে বিয়েদানের (১৯১৬) ঘটনায় ক্ষুব্ধ ব্রাহ্মসমাজের নেতারা সে-বিবাহ অনুষ্ঠান বর্জন ও চিত্তরঞ্জনকে একঘরে করার আহ্বান জানানোর পরও ব্রাহ্মসমাজের যাঁরা সেই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তাঁদের অন্যতম। (অপর্ণা : ১০৬) সুতরাং রবীন্দ্রনাথ-চিত্তরঞ্জনের পারস্পরিক বিরূপতার যে সংবাদটির সঙ্গে আমরা পরিচিত, নিঃসন্দেহে বলা যায়, তার সূত্রপাত আরও পরে।

চিত্তরঞ্জন দাশের কবিতা প্রথম প্রকাশ:

চিত্তরঞ্জন দাশের কবিতা প্রথম প্রকাশিত হয় সম্ভবত তাঁর ১৯ বছর বয়সে, নব্যভারত পত্রিকার ফাল্গুন ১২৯৫ সংখ্যায়। কবিতাটির নাম ছিল ‘বন্দী’। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ মালঞ্চ প্রকাশিত হয় ১৮৯৬ সালে। ৫০টি কবিতা নিয়ে এই কাব্য-সংকলনটির প্রকাশক ছিলেন সুরেশচন্দ্র সমাজপতি। মালঞ্চের অধিকাংশ কবিতারই বিষয়বস্তু প্রেম। মানবিক প্রেম। যেমন :
তোমার ও প্রেম,সখী! তোমারি মতন,
অনন্ত রহস্যময় সৌন্দর্যে মগন
অধর প্রশান্ত ধীর,
আঁখি কৃষ্ণ সুগভীর,
পুষ্পিত হৃদয় তীর,সৌরভ স্বপন।
এই কাছে এসে যাও,
ওই দূরে চলে যাও,
এ সকল ক্ষণিকের অর্ধ আলিঙ্গন।
এরই পাশাপাশি ‘ঈশ্বর,‘বারবিলাসিনী,‘সোহং’ও ‘অভিশাপে’র মতো কয়েকটি ভিন্নধর্মী কবিতাও রয়েছে তাঁর এ-বইটিতে। এর মধ্যে প্রথমোক্ত কবিতা দুটি সমকালে কিঞ্চিৎ বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল। চিত্তরঞ্জনের সঙ্গে বাসন্তী দেবীর বিয়ের সময় ব্রাহ্মসমাজের তরফ থেকে এ ব্যাপারে আপত্তি তোলা হয়। আপত্তির একটি প্রধান কারণ ছিল চিত্তরঞ্জনের সাহিত্যচর্চা,তাঁর রচনার বিশেষ প্রবণতা। প্রসঙ্গটির উল্লেখ করতে গিয়ে চিত্তরঞ্জন-কন্যা অপর্ণা দেবী লিখেছেন,‘বাবা ‘ঈশ্বর-বিদ্রোহী’ও ‘মাতাল’ আখ্যা এই সমাজ থেকে পেয়েছিলেন তাঁর মালঞ্চতে প্রকাশিত ‘ঈশ্বর’ও ‘বারবিলাসিনী’কবিতার জন্য।’ (অপর্ণা : ২৮) শুধু তাই নয়, চিত্তরঞ্জনকে এ-সময় এ মর্মে একটি লিখিত স্বীকারোক্তিও দিতে হয়েছিল যে, তিনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন। (অপর্ণা : ২৯) তো কী লিখেছিলেন চিত্তরঞ্জন তাঁর ‘ঈশ্বর’ কবিতায়? আমরা এখানে পুরো কবিতাটিই উদ্ধৃত করছি : ‘ঈশ্বর! ঈশ্বর! বলি অবোধ ক্রন্দন,/ প্রচণ্ড ঝটিকা বহি’ গগন ভরিয়া/ আমাদের সুখ-শান্তি নিতেছে হরিয়া,/ বাড়াইয়া আমাদের বিজন বেদন !/ জীবন-যাতনা তরে সজল নয়ন,/ জুড়াইতে চাই হৃদে ঈশ্বর সৃজিয়া :/ আপনার হৃদয়ের ধূমরাশি দিয়া,/ সত্য বলে’ পূজা করি অলীক স্বপন !/ হায়! হায়! মিথ্যা কথা; ঈশ্বর! ঈশ্বর!/ করুণ ক্রন্দন উঠে অনন্ত গগনে :/ ঠেলে’ ফেলি’ জীবনের বিনীত নির্ভর,/ ধরণীর আর্ত্তনাদ শুনি না শ্রবণে!/ ঊর্দ্ধ মুখে চেয়ে থাকি, ডাকি নিরন্তর/ শতবার প্রতারিত কাঁদি, মনে মনে।’

চিত্তরঞ্জনের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ মালা প্রকাশিত হয় ১৯০২,মতান্তরে ১৯০৪ সালে। এরও বেশির ভাগ কবিতার বিষয় মানবিক প্রেম। যদিও ঈশ্বরানুভূতির প্রকাশও ঘটেছে কয়েকটি কবিতায়। তাঁর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ সাগর সঙ্গীত প্রকাশিত হয় ১৯১১ সালে। দ্বিতীয়বার বিলাত যাত্রাকালে সমুদ্রবক্ষে এর কবিতাগুলো লেখার সূত্রপাত। এই পর্বে এসে তাঁর কবিতার ভাব বা বিষয়বস্তুতে লক্ষযোগ্য পরিবর্তন ঘটে। তিনি এখানে প্রকৃতির বিশালত্বে মুগ্ধ,সম্মোহিত। তার কাছে সমর্পিতচিত্ত হতে আকুল। সমুদ্র এখানে অসীমের প্রতীক হয়ে তাঁকে হাতছানি দেয়,যার মুখোমুখি হয়ে কবির উচ্চারণ : ‘আমি যে হয়েছি তব হাতের বিষাণ !/ আমি যন্ত্র তুমি যন্ত্রী!… ওগো যন্ত্রী! বাজাও আমারে’। কিংবা,‘হে মোর আজন্ম সখা! কাণ্ডারি আমার/ আজ মোরে লয়ে যাও অপারে তোমার।’চিত্তরঞ্জন নিজেই তাঁর এই কাব্যগ্রন্থটির একটি ইংরেজি গদ্যানুবাদ ও শ্রী অরবিন্দ পদ্যানুবাদ করেন। ঝড়হমং ড়ভ ঃযব ঝবধ নামে অরবিন্দের অনুবাদটি ১৯২৩/৪ সালে মাদ্রাজ থেকে প্রকাশিত হয়। চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ অন্তর্যামীতে (১৯১৪) এসে চিত্তরঞ্জনকে আমরা পাই বৈষ্ণব কবিদের উত্তর-সাধক হিসেবে,পরমাত্মার সঙ্গে জীবাত্মার মিলনের আকাক্সক্ষাই যার কাব্যসাধনার মূল প্রেরণা। জীবনের এই পর্ব থেকে বৈষ্ণবোচিত জীবনদর্শনই তাঁর সাহিত্যচর্চা,রাজনীতি সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাঁর পরবর্তী ও সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ কিশোর-কিশোরীতে (১৯১৫) যার একরকম পরিণতি আমরা দেখতে পাই। দেহাতীত, কাম-গন্ধহীন এক প্রেমের জন্য আকুতি ব্যক্ত হয়েছে এ-পর্বের কবিতায়, যেমন :
কাছে কাছে নাই-বা এলে,তফাত থেকে বাসব ভালো
দুটি প্রাণে আঁধার মাঝে প্রাণে প্রাণে পিদিম জ্বালো!
এপার থেকে গাইব গান, ওপার থেকে শুনবে বলে;
মাঝের যত গণ্ডগোল ডুবিয়ে দেব গানের রোলে।
এই শেষ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশের পর চিত্তরঞ্জন কাব্যচর্চা প্রায় ছেড়ে দেন এবং রাজনীতি বা দেশের কাজে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করেন। একপর্যায়ে তিনি যে তাঁর বিরাট পশারের ওকালতি পেশা ত্যাগ করেন (১৯২০) কিংবা পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যাপারে এতদিনের শৌখিনতা ছেড়ে সস্তা ও মোটা খদ্দরের ফতুয়া ও খাটো ধুতি পরতে শুরু করেন,শুধু তাই নয়। তাঁর কলকাতা রসা রোডের পৈতৃক বাড়িটিও এ-সময় তিনি লিখিতভাবে জাতির সেবায় দান করেন (পরে যেখানে মহাত্মা গান্ধীর উদ্যোগে চিত্তরঞ্জন সেবা সদন প্রতিষ্ঠিত হয়)। ইতিমধ্যে তাঁর উদ্যোগে ও সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় বাংলা সাহিত্যপত্র নারায়ণ। তাঁর শেষদিকের রচিত অনেক কবিতা,কিছু গান,দুটি গল্প (‘ডালিম’ও ‘প্রাণপ্রতিষ্ঠা’)এবং কয়েকটি প্রবন্ধ ও বাংলা অভিভাষণ এ-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। নারায়ণে প্রকাশিত এসব প্রবন্ধ ও অভিভাষণে চিত্তরঞ্জনের সাহিত্যদৃষ্টি ও দেশ ও সমাজ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য প্রকাশ পায়। এ রকম কিছু প্রবন্ধ নিয়ে তাঁর মৃত্যুর পর ইন্ডিয়ান বুক ক্লাব থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর দেশের কথা প্রবন্ধ পুস্তকটি। অবশ্য দেশমাতৃকার আহ্বানে তিনি যখন রাজনীতিতে পুরোপুরি আত্মনিবেদিত তখনও তাঁর সাহিত্যপ্রীতি অবসিত হয়নি। বরং এ-বিষয়ে আপন আক্ষেপ ব্যক্ত করে পাটনা সাহিত্য পরিষদ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন : ‘আপনারা রাজনীতি ক্ষেত্রে আসিতে পারেন নাই বলিয়া দুঃখ প্রকাশ করিতেছেন। কিন্তু ক্ষোভের কোন কারণ নাই। আমিও সাহিত্য সেবায় জীবনাতিবাহিত করিব বলিয়া ঠিক করিয়াছিলাম,ঘটনাচক্রে এক্ষেত্রে আসিয়া পড়িয়াছি। নতুবা সেই পথই অবলম্বিত হইত।’ (উদ্ধৃত : দেশবন্ধু রচনাসমগ্র,পৃ ৫)

চিত্তরঞ্জনের প্রিয় লেখক ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র:

চিত্তরঞ্জনের প্রিয় লেখক ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র। বিশেষ করে আনন্দমঠ ও কমলাকান্তের দপ্তর বই দুটি তাঁর খুব প্রিয় ছিল। তাঁর কন্যা অপর্ণা দেবীর লেখা জীবনী থেকে জানা যায়, পারিবারিক সান্ধ্য সাহিত্য বৈঠকে তিনি প্রায়ই এ দুটি বই থেকে সবাইকে পড়ে শোনাতেন। কমলাকান্তের দপ্তর পড়তে গিয়ে যেখানে বঙ্কিম কমলাকান্তের মুখ দিয়ে বলিয়েছেন,‘পিয়াদার শ্বশুরবাড়ী আছে তবু সপ্তদশ অশ্বারোহী মাত্র যে জাতিকে জয় করিয়াছিল,তাহাদের পলিটিকস নাই। ‘জয় রাধে কৃষ্ণ, ভিক্ষা দাও গো’ ইহাই আমাদের পলিটিক্স, তদ্ভিন্ন অন্য পলিটিক্স যে গাছে ফলে তাহার বীজ এদেশের মাটিতে লাগিবার সম্ভাবনা নাই।’সে অংশটুকু পড়ে চিত্তরঞ্জন মন্তব্য : ‘বাঙালি জাতির পরাধীনতার ব্যথা ও ধিক্কার এমনভাবে আর কেউ লেখেনি।’(অপর্ণা : ৬১-৬২) বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতি এই গভীর অনুরাগ বা শ্রদ্ধার প্রকাশ ঘটেছিল নারায়ণের একটি বিশেষ বঙ্কিম সংখ্যা বের করার মধ্য দিয়ে। বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতি তাঁর এই প্রীতি বা পক্ষপাত এবং উদ্ধৃত মন্তব্যটি থেকে চিত্তরঞ্জনের স্বাজাত্যবোধের স্বরূপ এবং রবীন্দ্রনাথের প্রতি তাঁর বিরূপতার কারণ অনুমান করা যায়।
বঙ্কিমচন্দ্র ছাড়া তাঁর প্রিয় অন্য লেখকদের মধ্যে ছিলেন হেমচন্দ্র,নবীনচন্দ্র প্রমুখ। কিন্তু সবচেয়ে বেশি তাঁকে যা মুগ্ধ করত তা হলো বৈষ্ণব সাহিত্য। কন্যা অপর্ণা দেবীর বক্তব্য অনুযায়ী,চিত্তরঞ্জন-পতœী বাসন্তী দেবীই প্রথম চিত্তরঞ্জনকে বৈষ্ণব পদাবলির ‘রস আস্বাদন করান’। (অপর্ণা : ৬৭) পরবর্তীকালে এই বৈষ্ণব সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ তাঁর মনে এতটাই দৃঢ়মূল হয় যে তা শুধু তাঁর সাহিত্যদৃষ্টিকেই প্রভাবিত করেনি, অসহযোগ আন্দোলন চলাকালীন যখন তিনি ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরতেন,ঘরের সব বাতি নিভিয়ে তাঁকে ‘মাধব বহুত মিনতি করুঁ তোয়’এই বৈষ্ণব পদটি গেয়ে শোনাতে হতো। কন্যা অপর্ণা দেবীকে বলেছিলেন,মৃত্যুশয্যায় তাঁকে যেন এ-গানটি শোনানো হয়। (অপর্ণা : ২৩০) ‘বাংলার গীতিকবিতা’নামক তাঁর সুদীর্ঘ প্রবন্ধটিতে চিত্তরঞ্জন দাশ চণ্ডীদাসকেই বাংলার সর্বপ্রধান কবি আর চণ্ডীদাসের কবিতাকেই ‘বাংলার যথার্থ গীতিকাব্য’বলে অভিমত প্রকাশ করেন। কী অর্থে তিনি চণ্ডীদাসকে বাংলার যথার্থ গীতিকাব্য রচয়িতা মনে করতেন? তাঁর নিজের ভাষায়,‘এই কবিতাগুলির মধ্যে যে প্রাণের সাড়া পাওয়া যায় তাহাই বাঙ্গলার গীতিকবিতার প্রাণ।’এবং ‘যে দেশের কথা চণ্ডীদাস গাহিয়াছেন,সেই দেশের কাহিনী গানে না ফুটাইলে গানের সার্থকতা কই?’

তার সাধারন জীবনযাপন নিয়ে কৃষক নেতা জিতেন ঘোষের রচনা সমগ্রে তিনি লিখেছেন, “দেশবন্ধু (চিত্তরঞ্জন দাশ) ময়মনসিংহ যাবেন। কর্মীরা তাঁকে প্রথম শ্রেণীর কামরায় নিয়ে যেতে চাচ্ছেন শুনে তিনি হেসে বললেন, আমি তো ভাই আর পঞ্চাশ হাজারী ব্যারিস্টার সি আর দাশ নই। কোনো মামলাও পরিচালনা করতে যাচ্ছি না। যাচ্ছি দেশের জনগণের কাছে তাঁদের সেবা করার উদ্দেশ্য নিয়ে। তাঁরা তো তৃতীয় শ্রেণীতেই চড়েন।

তথ্যসূত্র
১. মণীন্দ্র দত্ত ও হারাধন দত্ত-সম্পাদিত দেশবন্ধু রচনাসমগ্র,কলকাতা,১৩৮৫।
২. অপর্ণা দেবী,মানুষ চিত্তরঞ্জন,কলকাতা,২০০৭।
৩. আদিত্য ওহদেদার,রবীন্দ্র বিদূষণ ইতিবৃত্ত,কলকাতা,২০০৮।

নিউজটি শেয়ার করুন .. ..

‘‘আমাদের বিক্রমপুর-আমাদের খবর।
আমাদের সাথেই থাকুন-বিক্রমপুর আপনার সাথেই থাকবে!’’
Login করুন : https://www.bikrampurkhobor.com

একটি উত্তর দিন

দয়া করে আপনার কমেন্টস লিখুন
দয়া করে আপনার নাম লিখুন